Published : 09 Sep 2026, 05:13 PM
রাত নামলেই আতঙ্ক বাড়ে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, উঠান ও চলাচলের পথ। পানির মধ্যে রাত কাটাতে গিয়ে একদিকে সাপের ভয়, অন্যদিকে লাল পিঁপড়ার কামড়। ঘুম যেন এখন তাদের কাছে বিলাসিতা।
শেষ পর্যন্ত জীবন ও গবাদিপশু বাঁচাতে নৌকায় করে ঘর ছেড়ে পদ্মার ডগার ঘাটে আশ্রয় নিয়েছেন চর খিদিরপুর ও মিডল চরের ১৫ পরিবারের মানুষ।
টানা প্রায় এক সপ্তাহ পানিবন্দি থাকার পর বুধবার এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন।
এদিন বেলা ১২টার দিকে পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ডগার ঘাট এলাকায় পানিবন্দি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।
ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি তিনি পানিবন্দি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের জন্য দুপুরের খাবারে ব্যবস্থা করেন।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “চর খিদিরপুর ও মিডল চরে পানি ওঠায় প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে প্রায় ২৫ ধরনের পণ্য রয়েছে।
“এছাড়া বন্যাকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চর ও মাঝারচরসহ তিনটি স্থানে মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ক্যাম্পে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আপাতত ভ্রাম্যমাণভাবে একটি জায়গায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “সেখানে গবাদিপশু রাখারও ব্যবস্থা রয়েছে। তবে চর খিদিরপুরের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
“পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১০ ফুট উঁচু দুটি বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো য়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের পাশাপাশি কয়েক হাজার গবাদিপশু রাখার সুযোগ থাকবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে পদ্মার খিদিরপুর ও মিডল চরের প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার এবং ১০ হাজারের মতো গবাদিপশু পানিবন্দি হয়ে পড়ে। ঘরবাড়ি, উঠান ও চলাচলের পথ তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নৌকায় করে ডগার ঘাট এলাকায় চলে এসেছে।
চর খিদিরপুরের কৃষক জামু আলী বলেন, আট দিন ধরে চর খিদিরপুর মিডল চরের প্রায় ৩০০ পরিবার ও হাজার হাজার গবাদিপশু পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। জীবন বাঁচাতে অধিকাংশ মানুষ গরু নিয়ে পদ্মার এপারে চলে এসেছেন। তিনিও পরিবার-পরিজন, গরু ও আসবাবপত্র নিয়ে নৌকায় করে ডগার ঘাটে আশ্রয় নিয়েছেন।
চর খিদিরপুরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, “গত সাত-আট দিন ধরে পানির কারণে খুব কষ্টে আছি। ত্রাণ হাতে পেয়ে অনেক আনন্দ পেয়েছি।”
জেলা প্রশাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কৃষক বজলুর রশিদ বলেন, “এই দুর্যোগে ত্রাণ পাওয়া আমাদের জন্য বড় সহায়তা। দুর্যোগের সময় ডিসি স্যারের এই আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কথা আমরা অনেক দিন মনে রাখব।”
কৃষক রেজাউল করিমের বাড়িও চর খিদিরপুর মিডল চরে। এক সপ্তাহ ধরে পানিতে তার ঘরবাড়ি ডুবে আছে। সাপের ভয় আর লাল পিঁপড়ার কামড়ে রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী, ছেলে ও গরু নিয়ে নৌকায় করে ডগার ঘাটে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
রেজাউল করিম বলেন, “পানিতে আর থাকতে পারছিলাম না। তাই নৌকায় করে বউ, ছেলে আর গরু নিয়ে ডগার ঘাটে চলে এসেছি। পানি না নামা পর্যন্ত এখানেই থাকব।”
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, তার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে খাদ্যসহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধেও উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মেহেদী হাসান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।