Published : 29 Mar 2026, 05:50 PM
শরীয়তপুরের ছয় উপজেলায় ডিজেলের চরম সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষি ও মৎস্য খাত স্থবির হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি না পেয়ে একদিকে যেমন জেলেরা মাঝনদীতে নৌকা নিয়ে যেতে পারছেন না, অন্যদিকে সেচ দিতে না পেরে কৃষকের ইরি-বোরো ক্ষেতে সেচ ব্যাহত হচ্ছে।
জেলার নদীতীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যবসায়ীরা জেলেদের কাছে ডিজেল বিক্রি করলেও কয়েক দিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছেন না।
এ সুযোগে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। তেল না পেয়ে কৃষকেরা পাম্প ঘেরাও করে বিক্ষোভ মিছিলও করেছেন।
শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, শরীয়তপুরের ওপর দিয়ে পদ্মা ও মেঘনা নদী প্রবাহিত হয়েছে। জাজিরার নাওডোবা থেকে গোসাইরহাট উপজেলার নলমুরি পর্যন্ত প্রায় ৭১ কিলোমিটার নদীপথে প্রায় ৩৩ হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
আগে বৈঠাচালিত নৌকা ব্যবহার হলেও বর্তমানে অধিকাংশ নৌকায় ইঞ্জিন বসানো হয়েছে। জেলায় অন্তত ১২ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে; যা চালাতে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন।

নড়িয়া উপজেলা শুরেশ্বর এলাকার জেলে আসমত আলী বলেন, “নদী তীরবর্তী হাট বাজারগুলোতে ডিজেলের সংকটের কারণে আমাদের নৌকা চলছে না। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে তেল কিনে নদীতে যাচ্ছেন। তাদের লিটার প্রতি ডিজেলে ৬০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।”
মিজানুর রহমান সামের আরেক জেলে বলেন, “অভাবের সংসারে দশ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে নদীতে নামি। এত বছরেও ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। শুধু নৌকায় ইঞ্জিন বসেছে। এখন সেই ইঞ্জিনই বিপদের কারণ হয়েছে।
“বাজারে তেল পাচ্ছি না, তাই সাত দিন ধরে নৌকা বন্ধ। পরিবার ও শ্রমিকদের নিয়ে বিপাকে আছি। জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়িনি।”
এদিকে ডিজেল সংকটের কারণে শরীয়তপুরে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষ ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার ৫০০ হেক্টর। জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫০২টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র রয়েছে। কিন্তু তেলের অভাবে ক্ষেতে প্রয়োজনীয় সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, যা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
শনিবার রাতে তেল না পেয়ে শরীয়তপুর শহরের মনোহর বাজার এলাকার হাজী আব্দুল জলিল ফিলিং স্টেশনের সামনে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় কৃষকেরা। পরে তারা পাম্প ঘেরাও করেন। সদর উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কিছু তেল সরবরাহ করা হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
গোসাইরহাট উপজেলার গরিবেরচর এলাকার কৃষক আমির হোসেন, জয়নাল বেপারী ও মিয়া চান বলেন, কয়েক দিন ধরে তেল না পেয়ে তারা জেলা শহরে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল পাননি। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সামান্য তেল পেয়ে ফিরে যান। ইরি-বোরো ফসল নিয়ে তারা চরম শঙ্কায় রয়েছেন।
জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের ফকিরকান্দি এলাকার হারেজ মাদবর বলেন, “সুরেশ্বর বাজারে সীমিত পরিমাণে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে, তাও প্রতি লিটার প্রায় ১৭০ টাকা দামে। এতে মাছ ধরা অলাভজনক হয়ে পড়েছে।
“এই তেল দিয়ে দুই-তিন ঘণ্টা মাছ ধরা যায়। কোনো দিন মাছ পাই, কোনো দিন পাই না। বাধ্য হয়েই আমাদের অন্য পেশায় যেতে হবে।”
চাঁদপুরের মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপো থেকে তেল এনে বিক্রি করেন সুরেশ্বর বাজারের ব্যবসায়ী সোলায়মান হোসেন। তিনি বলছিলেন, প্রতিদিন দোকানে তিন-চার হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। এ কারণে নৌযান ও জেলেদেরও ডিজেল দিতে পারছেন না।
তবে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগটি সঠিক নয় বলে দাবি তার।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাফিজ এলাহী বলেন, “শনিবার মনোহর বাজার এলাকায় একটি পাম্পে কৃষকরা বিক্ষোভ করেছে। পরে প্রত্যেককে পাঁচ লিটার করে ডিজেল দেওয়ায় কৃষকরা শান্ত হয়েছেন।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে বেশি ইরি-বোরো ধান চাষ হয়েছে। তেল সংকটের কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র অর্জন ব্যহত হতে পারে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, “ঈদের আগ পর্যন্ত নৌযান ও জেলেদের জ্বালানি তেল পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের পর নদী তীরবর্তী বিভিন্ন হাটবাজারে তেলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে জেলেরা কিছু কিছু স্থানে জ্বালানি তৈল পাচ্ছেন না, এমন তথ্য পেয়েছি।
“বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অচিরেই সংকট কেটে যাবে।”