Published : 07 Sep 2026, 09:23 AM
একসময় ১২ কাঠা ফসলের জমি ছিল নেত্রকোণার সদরের সুভাষ চন্দ্র সরকারের। কিন্তু কংসের ভাঙনে সেসব বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে।
নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে মধ্যবয়সি সুভাষ বলছিলেন, “খোরাকির লাইগ্যা যে ধান করবাম এইডারও কোনো বাউ নাই। নদী যারে খায় সব খাইয়া ফালায়। একবারে নিঃস্ব কইর্যা ফালায়।”
কালিয়ারা গাবরাগাতী ইউনিয়নের চন্দ্রকোণা গ্রামের এ বাসিন্দা কংস নদের আগের অবস্থান দেখিয়ে বললেন, “গত ৫/৬ বছরে হের (কংস নদ) পেটে গেছে ১২ কাঠা জমি। অহন আর আমার এক শতাংশও ফসলের জমি নাই। বেবাক জমি খাইয়ালছে কংসে।”
সব হারানো সুভাষ চন্দ্র সরকার পাশের মুক্তিযোদ্ধা বাজারে ফার্ণিচারের দোকান চালান। এর আয় দিয়ে বাজারটির পাশেই এক টুকরো জমির বসতভিটায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোনো রকমে দিন গুজরান করছেন।
একই গ্রামের মো. দিলদার মিয়া, আব্দুল মোমেন খানের বসতভিটাও নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। তারা অন্যত্র বাড়ি করে বসবাস করছেন। মোহাম্মদ আলী ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মিলিয়ে নদীতে চলে গেছে ৩০ কাঠা ফসলি জমি। কংসে বিলীন হয়েছে একই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বাজারে আবেদ আলীর কাঠের দোকান, শহর আলীর চায়ের দোকান, মুজিবুর মিয়ার ফার্নিচারের দোকান।
শুধু কংস পাড়ের চন্দ্রকোণা গ্রাম নয়; একইভাবে জেলার সোমেশ্বরী, উপদাখালি, আত্রাখালি, বাউলাই, নেতাই, গণেশ্বরী, মগড়া, ধনুসহ কয়েকটি নদ-নদীর ভাঙনে দিশেহারা নদী সংলগ্ন এলাকার মানুষরা।
যা উঠে এসেছে সম্প্রতি করা ‘নেত্রকোণা জেলার প্রধান নদ-নদীর সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়।
সমীক্ষায় জেলার ভাঙনপ্রবণ ৪৫টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় নদীর তীরবর্তী ঘরবাড়ি, স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও অন্যান্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে মোট ২২ হাজার ৫৭ মিটার বা প্রায় ২২ দশমিক ০৬ কিলোমিটার নদীতীর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদীতীর ভাঙনের প্রধান কারণ হিসেবে কোথাও নদীর তলদেশ ও তীরে স্রোতের ক্ষয় এবং কোথাও ঢেউয়ের আঘাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ৪৫টি স্থানের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিরক্ষা কাজের প্রস্তাব রয়েছে খালিয়াজুরী উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়নের পাত্রা হাইস্কুল এলাকায়। সেখানে বাউলাই নদীর বাম তীরে এক হাজার ২৫০ মিটার অংশ সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ তালিকায় কংস নদের তীরের একাধিক স্থান রয়েছে। পাঁচপাইয়ে ডান তীরে এক হাজার ১৯৫ মিটার, মুক্তির বাজারে বাম তীরের এক হাজার মিটার, সদরের বড়ওয়ারীতে এক হাজার ৬৫ মিটার, হাপানিয়ায় ৮১০ মিটার, মদনের কোয়েলাটিতে ৮০০ মিটার, দুর্গাপুরের কাকইরগড়ায় ৭৮৫ মিটার, দেউদুকুনে ৭৮০ মিটার, অতিতপুরে ৭১০ মিটার তীর সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া মোহনগঞ্জের আলোকদিয়ায় ৫৯৫ মিটার, দোনপুরে ৩৫০ মিটার, পূর্বধলার কুড়িকুনিতে ৩৩৫ মিটার, মদনের জাহাঙ্গীরপুরে ৩৮৫ মিটার, সদরের বনদে পাটলীতে ৩০০ মিটার, দেবকান্দায় ২০০ মিটার, কেওয়ারাশিতে ১৯৫ মিটার কংসের তীর সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া সোমেশ্বরী, পুরাতন সোমেশ্বরী, বাউলাই, নাইতাই, চিনাই, গুমাই, আত্রাখালি শাখা, বেদরি খাল, গণেশ্বরী ও উপদাখালি নদীর বিভিন্ন স্থানও প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে নেত্রকোণার পাশাপাশি ময়মনসিংহ জেলার নাইতাই নদীতেও ১৪টি স্থানে মোট ৭ হাজার ৭০৫ মিটার নদীতীর সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় ও ভুক্তভোগী মানুষদের দাবি অস্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগের বদলে ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী সমাধান নেয়ার।
চন্দ্রকোণা গ্রামের মোহাম্মদ আলী বলেন, “বালুর জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধে যে চেষ্টা পানি উন্নয়ন বোর্ড করছে তাতে আমাদের তেমন কোনো কাজে আসছে না। স্থায়ী সমাধান চাই। জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী সমাধান হলে এলাকার মানুষ বাঁচবে।”
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন নদীর ২৫টি অংশে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে নদী ভাঙন রোধের কাজ চলছে। এতে তিন কোটা টাকা ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে।
“নতুন করে আরও কয়েকটি অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেসব অংশে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে যে ৪৫টি অংশে স্থায়ী সমাধানের কথা বলা হয়েছে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান এ প্রকৌশলী।