১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিমান দুর্ঘটনা: স্কুলে মেয়েকে আনতে গিয়ে লাশ হলেন রজনী

দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী রজনী রাজধানীর উত্তরায় সপরিবারে বসবাস করতেন।

বিমান দুর্ঘটনা: স্কুলে মেয়েকে আনতে গিয়ে লাশ হলেন রজনী
কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে রজনী খাতুনের মরদেহ পৌঁছালে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Jul 2025, 08:18 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:25 PM

উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে নিহত রজনী ইসলামের দাফন কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে সম্পন্ন হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সাদিপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে সকাল ৯টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হাই সিদ্দিকী, হোগলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম চৌধুরীসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাসহ শত শত এলাকাবাসী জানাযায় অংশ নেন।

রজনী খাতুন (৪৫) সাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা জহুরুল ইসলামের স্ত্রী। দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী রজনী রাজধানীর উত্তরায় সপরিবারে বসবাস করতেন।

সোমবার সকালে মেয়ে ঝুমঝুমকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে তিনি দুর্ঘটনায় আহত হন। ঝুমঝুম মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে প্রাণে বেঁচে গেছে।

রজনীর বড় ছেলে এস এম রুবাই এ বছর ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ছোট ছেলে এস এম রোহানও মাইলস্টোন কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে সেদিন অসুস্থ থাকায় স্কুলে যায়নি।

পরিবার জানায়, রজনীর স্বামী গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম দুর্ঘটনার সময় ব্যবসার কাজে চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি বিমানে করে ঢাকায় ফিরে আসেন। সোমবার রাতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে রজনীর মরদেহ শনাক্ত করা হয়। 

রাত সাড়ে ৯টায় নিহতের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে রাতেই মরদেহ নিয়ে স্বজনরা গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া দৌলতপুরের উদ্দেশে রওনা হন। পথের মধ্যে মঙ্গলবার ভোরে মেহেরপুরের গাংনি উপজেলার বাওট গ্রামে রজনীর বাবার বাড়িতে কিছুক্ষণ মরদেহ রাখা হয়। 

পরে সকাল ৭টায় উপজেলার হোগলবাড়ি ইউনিয়নের সাদিপুর গ্রামে রজনীর স্বামীর বাড়ি পৌঁছায়। সেখানে শত শত মানুষ তাকে একনজর দেখতে ভিড় করে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। 

রজনীর সন্তানদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ। পরিবারের শোকাহত সদস্যদের প্রতিবেশীদের সান্ত্বনা দিতে দেখা যায়। 

রজনীর স্বামী গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম বলেন, “মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে রজনী আর বাড়ি ফিরবে না এটা আমি ভাবতেও পারিনি। রজনীর মাথার পেছনে আঘাতজনিত ক্ষত ছিল, তবে শরীরের কোথাও অগ্নিদগ্ধ হওয়ার চিহ্ন ছিল না। সম্ভবত বিস্ফোরিত বিমানের কোনো অংশ ছুটে এসে মাথার পিছনে আঘাত করেছিল।” 

তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার সময় মেয়ে ঝুমঝুম স্কুলের ক্যান্টিনে থাকায় অক্ষত ছিল। পরে বাসার কেয়ারটেকার মেয়েকে নিরাপদে বাসায় নিয়ে আসেন।”

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল হাই সিদ্দিকী বলেন, “এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার জন্য আমরা কেউ প্রস্তত ছিলাম না। রজনীর মৃত্যু পরিবারের জন্য একটা অপূরনীয় ক্ষতি। মায়ের বিকল্প হয় না। আমরা নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং সন্তানদের মঙ্গল কামনা করছি।” 

সোমবার দুপুরে উত্তরার দিয়াবাড়ির এই স্কুলের ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই বিমান আছড়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, স্কুলে মাঠে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিমানটি ছেঁচড়ে গিয়ে ধাক্কা খায় দোতলা হায়দার আলী ভবনে। অগ্নিগোলকে পরিণত হওয়া সেই বিমানের শিখা স্কুল ভবনটিকেও গ্রাস করে নেয়।

তখন স্কুল ছুটির সময়, অনেক অভিভাবকও ভিড় করেছিলেন ভবনটির কাছে। দুর্ঘটনার পর ভবনের প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বের হতে পারছিলেন না কেউ।

উদ্ধার অভিযান শেষে জঙ্গি বিমানের পাইলটসহ ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৭১ জনকে ওই ভবন থেকে আবহ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, তাদের অধিকাংশই মারাত্মকভাবে দগ্ধ, আর বেশিরভাগই শিশু।

আহতদের মধ্যে আরো দশজন রাতে হাসপাতালে মারা গেলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৭ জন। এখনো ৭৮ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

নিহতদের মধ্যে ২০ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও ছয়জনের মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে সেগুলো আর চেনার উপায় নেই।