Published : 25 Jul 2026, 03:52 PM
তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তনে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ছে। একের পর এক বিলীন হচ্ছে চাষের জমি, বসতভিটা। ভাঙন থেকে বাঁচতে তিনদিনে বসতভিটা সরিয়ে নিতে হয়েছে শতাধিক পরিবারকে।
শুক্রবার সরেজমিনে উপজেলার ঝুনাগাছ চাঁপানী ও খালিশাচাঁপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর, ডালিয়া, ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া, ভেন্ডাবাড়ির নদীতীরবর্তী এলাকায় গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের আহাজারি শোনা যায়। 
বসতঘর সরিয়ে নেয়ার ফাঁকে ভেন্ডাবাড়ির রশিদুল বলেন, “আমি পথে বসে গেলাম। বসতভিটাতো গেলোই। ফসলের যেটুকু জমি আছে আমন ধান করবো বলে ঠিক করেছি সেই জমির উপর দিয়ে এখন তিস্তার স্রোত যাচ্ছে। আমাদের মরণ দশা হইছে।”
আরেক কৃষক জাহিদুল ইসলাম (৫৬) বলেন, “নদী যেন রাক্ষুসী হয়ে উঠেছে। আমার ১২ বিঘা জমি তিস্তা গিলে খেয়ে ফেলেছে। নদীভাঙন বন্ধ না হলে আমাদের বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না।”
তিস্তাপাড়ের বাসিন্দা মমিনুর রহমান (৬৫) বলেন, “প্রতি বছরই মতো এবারও বন্যা এলেই দেখি ঘরবাড়ি, জমিজমা সব নদীতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান কেউ করে না। কতবার নতুন করে ঘর করেছি, তার হিসাব নেই।”

তবে এই ভাঙন কবলিত মানুষদের অভিযোগ, তিনদিন ধরে নদীভাঙ্গন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলেও ডিমলার ডালিয়া ডিভিশনের পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যত এখনও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
ক্ষুদ্ধ হয়ে কেল্লাপাড়ার ছামাদ আলী বলেন, “প্রতিদিন বসতভিটা, ফসলিজমি তিস্তা নদীর বুকে বিলিন হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কষ্ট, আমাদের কান্না যেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তারা শুনতে পান না।”
তবে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে রোববার থেকে তিস্তার তীর সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হবে। এজন্য নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার ১৭ কিলোমিটার ডান তীরে ৯টি পয়েন্টের ভাঙ্গন প্রতিরোধে কাজ করা হবে।
ডালিয়া পাউবো সূত্র মতে, তিস্তা নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু পানি কমলেও তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ওই সকল গ্রামের কোনো প্রভাব পড়েনি; স্রোত গ্রামগুলোতে আঘাত করেই যাচ্ছে।

সম্প্রতি ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ডালিয়ায় অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজের ভাটির দিকে দুটি ইউনিয়নের উপজেলার খালিশা চাপানী ও ঝুনাগাছ চাপানী এলাকায় নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে ডানতীর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। ফলে ওই ইউনিয়ন দুটির ভাঙনের মুখে পড়ে।
ঝুনাগাছের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নূর হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত শতাধিক বসতবাড়ি এবং ৫০০ একর ফসলি জমি তিস্তায় বিলীন হয়েছে।
ভাঙনের মুখে বুধবার ও বৃহস্পতিবার ৬০টি পরিবার এবং শুক্রবার আরও ১৫ পরিবার বসতঘর ভেঙে সরিয়ে নিয়েছে। রাস্তাঘাটের উপর দিয়ে তিনদিন ধরে তিস্তার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় তলিয়ে আছে শতশত বসতভিটা।

বন্যা কবলিত পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। রান্না করে খাওয়ার মতো অবস্থা নেই তাই শুকনা খাবারই যেন ভরসা।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলা হলে তিনি বলেন, ওই এলাকায় তিস্তা নদী ডানতীরের ১৭ কিলোমিটারের ৯টি পয়েন্টে আঘাত হেনেছে। আমরা জরিপ করে সেখানে তীর সংরক্ষণের কাজের প্রস্তুতি নিয়েছি। জরুরী ভিত্তিতে ঠিকাদার নেওয়া হচ্ছে। রোববার হতে কাজ শুরু হবে।”
আরও পড়ুন
ত্রাণ নয়, বন্যা-নদী ভাঙন ঠেকানোর দাবি তিস্তা পাড়ে
তিস্তার ভাঙনে বাড়িঘর নিয়ে সরছে মানুষ, আশ্রয়কেন্দ্রও হুমকিতে
উজানের ঢল-বৃষ্টিতে তিস্তার পানি বৃদ্ধি, খুলে দেওয়া হয়েছে ৪৪ জলকপাট