Published : 10 May 2026, 09:30 AM
খুলনার দাকোপ উপজেলা ও চালনা পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রের ঐতিহ্যবাহী ‘চালনা লেক’ দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কচুরিপানা ও আবর্জনায় ভরে গেছে।
লেকের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মিঠা পানির তীব্র সংকট হয়েছে। পাশপাশি দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রবে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, লেকটি আগে গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ও বিনোদনকেন্দ্র ছিল, কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলায় তা নষ্ট হয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, লেকটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দাকোপের চালনা সদরের বাসিন্দা স্থানীয় সংবাদকর্মী আজগর হোসেন ছাব্বির বলেন, “সমুদ্র উপকূলবর্তী তিনটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নিয়ে গঠিত উপজেলাটি ঘিরে রেখেছে ঢাকী, পশুর, শিবসা, ও কাজীবাছা নদী। নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলাটির তিনটি ইউনিয়নই সুন্দরবনের সীমানায় অবস্থিত।
“প্রকৃতিগতভাবে এখানে পানি আছে ঠিকই, কিন্তু তা নিরাপদ নয়। জলবায়ু বিপর্যয়ে পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। বছরজুড়েই বিশুদ্ধ খাবার পানির কষ্ট তো আছেই। পাশাপাশি রয়েছে গোসল ও গৃহস্থালির কাজের পানির সংকটও।”

ছাব্বির বলেন, “মিঠা পানির জন্য মূলত পুকুর ও টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে পৌরসভার ৫, ৬ এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা গোসল, রান্না, কাপড় ধোয়াসহ গৃহস্থালীর সব কাজে ‘চালনা লেকের’ পানিই ব্যবহার করে আসছিলেন। কিন্তু প্রায় দুই যুগ ধরে লেকটি সংস্কার না করায় তারা এ পানি ব্যবহার করতে পারছেন না।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, চালনা লেকের দুই পাড়ে রয়েছে উপজেলা সদর ও পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা। এর অধিকাংশ এলাকার পাড় ভেঙে চলাচলের তেমন সুযোগ নেই; ভরাটে অনেকটা সংকুচিত হয়ে শ্রী হারিয়েছে; কচুরিপানায় ঠাসা পুরো লেক। অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনার জঞ্জাল। উভয় পাড়ের বাসিন্দারা বসতবাড়ির নালার সংযোগ করায় ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, বছরজুড়ে উপকূলীয় এলাকায় মিঠা পানির সংকট থাকায় লেকটি সংস্কার করে কার্যকর মিঠা পানির জলাধার হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে লেকটিতে পানির ফোয়ারা এবং চারপাশে বসার বেঞ্চ তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন করা হলে এটি পৌরসভা এবং উপজেলাবাসীর জন্য একটি আদর্শ বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হবে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, বিগত বছরগুলোতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পরবর্তীতে উপজেলা চেয়ারম্যানরা লেকটি মোটা অংকের অর্থে ইজারা দিতেন। বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ওই দুই দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব ঘটনা তাদের আমলের নয়।
দাকোপ উপজেলা নাগরিক পরিষদের সভাপতি ও চালনা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহানন্দ সরকার বলেন, “ষাটের দশকে তৎকালীন চালনা বন্দরের পশুর নদীর শাখা খালের দক্ষিণ পাশে বাঁধ নির্মাণ করে লবণাক্ত পানির প্রবেশ বন্ধ করা হয়। তখন পশুর নদীর এ শাখা খালটির নামকরণ হয় ‘চালনা লেক’।
পরে ১৯৭৮ সালে মিঠা পানির আধার সৃষ্টির করার জন্য ৭৫০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৮৫ মিটার প্রস্থের লেকটি পুনঃখনন করা হয়। এরপর থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা এর পানি ব্যবহার শুরু করেন।”
মহানন্দ বলেন, “লেকটির পানি কয়েক বছর আগেই সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কচুরিপানা ও আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে এটি। পচা পানির দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এতে সাপ ও মশা-মাছির উপদ্রবও বেড়েছে। লেকটি পুনঃখননের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন দেওয়া হলেও এখনো কোনো প্রতিকার মেলেনি।”
চালনা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গৌতম সাহা বলছেন, “লেকটিতে কচুরিপানা পচে পানি দূষিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে পৌরসভার ৩টি ওয়ার্ডের প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। মিঠা পানির প্রয়োজনে লেকটির সংস্কার খুব জরুরি।”
দাকোপ উপজেলা সদরের বাসিন্দা সনৎ কুমার হুই বাচ্চু বলেন, “চৈত্র-বৈশাখ মাসে পৌরসভার অধিকাংশ পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে তখন এ লেকের পানিই পৌরসভার অন্তত তিনটি ওয়ার্ডের মানুষের ভরসা ছিল। দীর্ঘ সময় লেকটিতে কচুরিপনা আর ময়লা-আবর্জনার কারণে লেকের পানি এখন দূষিত, ব্যবহার অযোগ্য।”
বাচ্চু বলেন, “আগে লেকটিতে পুরুষ ও মহিলাদের নৌকাবাইচ, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে স্কুল, কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সাঁতার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। উপভোগ করতো হাজার হাজার লোক। ছোট ছেলে-মেয়েদের সাঁতারও শেখানো হতো। এসব ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা দরকার।”

লেকের দূষিত পানির ব্যবহারে চর্মরোগ থেকে শুরু করে ডায়রিয়া-টাইফয়েড, এমনকি ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদীপ বালা।
তিনি বলেন, “এসব রোগ প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো কাজেই এ পানি ব্যবহার না করাই ভাল।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ কমাতে লেকটি সংষ্কারের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি-না জানতে চাইলে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চালনা পৌরসভার প্রশাসক মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, “সমুদ্র উপকূলবর্তী মিঠা পানির এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী লেকটি সংস্কারে প্রচেষ্টা রয়েছে।
“তবে লেকটি মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্পত্তি। ইতিপূর্বে এর সংস্কারে পৌরসভা থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনি জটিলতায় সেটা সম্ভব হয়নি।”
সংস্কার কাজের ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহির মাজহার বলেন, “চিঠিটি আমরা পেয়েছি। আপাতত কচুরিপানা অপসারণের বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।”