Published : 27 May 2025, 08:40 PM
‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ কুষ্টিয়া শহরের যে বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেটি স্থানীয় এক ব্যক্তি ব্যবসা ও আত্মীয়দের থাকার কথা বলে ভাড়া নেন বলে জানিয়েছেন ভবনের অন্য বাসিন্দারা।
মঙ্গলবার ভোরবেলা কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর এলাকায় সোনাতলা মসজিদের পাশের তিনতলা ওই ভবনে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে দুই ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’কে গ্রেপ্তার করে।
বিকালে আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তাদের তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সুব্রত বাইনের দুই সহযোগী শ্যুটার আরাফাত ও শরীফকে।
কুষ্টিয়া শহরের তিনতলা ওই ভবনটির দোতলা ও তিনতলায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাড়া নিয়ে মেস করে থাকেন। বাসার নিচতলায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করা হয় বলে মেসের দুজন শিক্ষার্থী বলেছেন।

তারা জানান, বাসাটির মালিক আলমডাঙ্গার সাবেক পৌর মেয়র। তিনি মারা গেছেন। উনার মেয়ে এখন এই ভবনটা দেখাশোনা করে। কাপড়ের বিজনেস এবং আত্মীয়দের থাকার কথা বলে পাশের বাসার একজন ব্যক্তি রোজার ঈদের পর এই বাসাটি ভাড়া নেন। আগে প্রায় এক বছর খালি ছিল। বাসায় কিছু সংস্কার কাজ করা হয়েছে।
ভেতরের দরজাটি সবসময় বন্ধ থাকে। বাইরে দরজা দিয়েই সবাই যাতায়াত করে। সামনে একটা সিসি ক্যামেরাও লাগানো হয়। সেই ক্যামেরাটি মনিটর ছিল পাশের একটি বাসায়, সেটিও একটি তিনতলা ভবন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি বাসাটি ভাড়া নিয়েছেন তাদের বাসায়।
মেসের একজন শিক্ষার্থী বলেন, “এটা আগে ফাঁকা ছিল। পিছনের বাসার এক নারী এসে এই বাড়িটি ভাড়া নেন। দেড়-দুই মাস আগে সেটি ভাড়া নেওয়া হয়। ভেতরে কয়জন থাকত তাও জানি না। হয়ত তিন-চারজন।
অভিযানের ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই শিক্ষার্থী বলেন, “ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল আসে। আমরা তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। উঠে দেখি তারা। আমাদের জিজ্ঞাস করে, এমন বড় দাঁড়িওয়ালা কাউকে দেখছি কিনা? আমরা দেখিনি। পরে শুনি, একজন বড় সন্ত্রাসী। পরে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখি সুব্রত বাইন। আমাদের বাইরে বের হতে দেয়নি। ব্যালকনি থেকে দাঁড়িয়ে দেখছি দুজনকে নিয়ে গেছে।”
নিচতলার বাসাটিতে তিনটি বেড রুম, একটি কিচেন ও ওয়াশরুম রয়েছে। সামনে একটা নীল গেইট। এর পরই একটু ছোট আঙ্গিনার মত রয়েছে। বাড়িটির পাশ দিয়ে ছোট একটি রাস্তা চলে গেছে ভেতের। পেছনের অংশের জায়গাটায় কিছুটা ঝোপঝাড়ের মত, কয়েকটা কলাগাছও রয়েছে।
মেসের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। সেনাবাহিনী এসে বলে, অভিযান পরিচালনা করব। তখন আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়ি। আমরা ২০ জন একসঙ্গে ছিলাম। সেনাবাহিনী পাহারা দিয়েছে, অভয় দিয়েছে।
“পরে শুনি, দরজা ভাঙছে। একটু পরে শুনি, হ্যান্ডস-আপ। বুঝতে পারি কাউকে ধরেছে। পরে বাইরে এলে দেখি, একটা কালো গাড়িতে দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে। ঘর থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের গাড়িতে তোলা হয়।”
ওই শিক্ষার্থী বলেন, “এখানে যারা থাকতেন তারা খুব একটা বের হতে না। কয়েকদিন আগে খুব ভাল স্বাস্থ্যের ও মুখে দাঁড়িওয়ালা একজনকে গামছা রোদে দিতে দেখি। তিনি খুব অল্প সময় বাইরে ছিলেন। তারপর আমাদের দেখে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
“এরপর আমি একদিন টিউশনি থেকে বাসায় ফেরছি তখন দেখি, ২০ দিন আগে হবে, একদিন এক সুন্দরী নারী বাইরে কাপড় নাড়ছেন। তিনিও সেখানে ছিলেন। পরে আর দেখিনি। সবারই চলাফেরা ছিল সীমিত। তারা থাকার সময় আমরা আগে যেভাবে ছিলাম সেভাবেই চলছিল। কোনো পরিবর্তন ছিল না।”
ভোরে যখন সেনাবাহিনী এই অভিযান শুরু করে তখনও এলাকার মানুষ ঘুমে। কিছু লোক ভোরে হাঁটার জন্য বা নামাজ পড়ার জন্য উঠেছিলেন; মূলত তারাই বাইরে ছিলেন। তখনি অভিযানের বিষয়টি মানুষ জানতে পারেন। সাংবাদিকরাও খবর পেয়ে সেখানে যান। তখন তারা জানতে পারেন, সেখান থেকে একজন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’কে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করেছে।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে প্রথমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সেনাবাহিনীর কেউ কোনো কথা বলতে চাননি। ফলে কেউ জানত না আসলে কাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে সংবাদ মাধ্যমে সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আসে।
অভিযানের ব্যাপারে পুলিশ জানত কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে দুপুরে সদর মডেল থানার ওসি মোশাররফ হোসেন বলছিলেন, “আমাদের কাছে কোনো ইনফরমেশন দেয়নি। আমাদের এসপি স্যারও কথা বলতেছেন কিন্তু অফিসিয়ালি তারা বলছেন না। অফিসিয়ালি না বললে আদৌ কে কী এটা তো আমরা বুঝতে পারছি না।
“না আমরা ছিলাম না, আমাদের জানায়নি। আগে পরে কিছুই জানায়নি।”
পরে বিকাল ৫টায় ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে সংবাদ সম্মেলন করে চারজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হয়।
এদিকে সুব্রত বাইনকে যে বাসা থেকে আটক করা হয়েছে, ঠিক সেই ভবনের পেছনেই রয়েছে আরেকটি তিনতলা ভবন। সেই ভবনের মালিকই মূলত নিচতলার বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসাটির মালিক হেলাল উদ্দিন। তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসী ছিলেন। তার স্ত্রী মিনারা খাতুনও সেই বাসায় থাকেন। মিনারা পোশাকের ব্যবসা করেন।
সেই বাসার সামনে একটি বড় লোহার গেইট রয়েছে। গেইটটি ভেতর থেকে বন্ধ। বাসায় কারো কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। গেইটে ধাক্কাধাক্কি করে ডাকাডাকি করলেও কেউ সাড়া দেননি। ফলে তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি।