১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

খাগড়াছড়ির রেঞ্জ কার্যালয়ে কেন শত শত টিয়া পাখির আশ্রয়?

বনকর্মীরা বলেন, পাহাড়ে এত বড় জঙ্গল থাকার পরও পাখিগুলো অফিস ক্যাম্পাসকে নিরাপদ মনে করে।

খাগড়াছড়ির রেঞ্জ কার্যালয়ে কেন শত শত টিয়া পাখির আশ্রয়?
খাগড়াছড়ি শহরের রেঞ্জ কার্যালয়ের গাছগুলোতে এক দশকের বেশি সময় ধরে রাতের আশ্রয় বানিয়েছে শত শত মদনা বা লাল বুক টিয়া। ছবি- সমির মল্লিক

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

সমির মল্লিক সমির মল্লিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Aug 2026, 06:06 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:01 PM

খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের আকাশমণি, মেহগনি, জাম, জারুল ও কাঁঠালসহ বড় গাছগুলোতে এক দশকের বেশি সময় ধরে রাতের আশ্রয় বানিয়েছে শত শত মদনা বা লাল বুক টিয়া।

সন্ধ্যা হলেই পাখিগুলো রেঞ্জ কার্যালয়ের গাছগুলোতে জড়ো হয়। সবুজ দেহ, লাল বুক ও পালকে হলুদ রঙের এসব পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ভোরে খাবারের খোঁজে আবার বিভিন্ন এলাকায় চলে যায় তারা।

নিরাপদ পরিবেশ, শিকারির উৎপাত না থাকা, বনবিভাগের নজরদারি এবং খাবারের ব্যবস্থা থাকায় টিয়াগুলো এ এলাকাকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে বনকর্মীরা জানিয়েছেন।

খাগড়াছড়ি শহরে ঢোকার মুখে বাস টার্মিনালের কাছে বনবিভাগের সদর রেঞ্জ কার্যালয়। এর পাশ দিয়ে গেছে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক। পাঁচিল ও কাঁটাতারে ঘেরা কার্যালয় প্রাঙ্গণে রয়েছে কয়েকশ ফলদ ও বনজ গাছ।

খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কার্যালয়ের বনকর্মী মো. নুরউদ্দিন হোসেন বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রচুর টিয়া পাখি রেঞ্জ ক্যাম্পাসে আসে। পাখিগুলো এখানে রাত কাটায়। ভোরে খাবারের খোঁজে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসে।

খাগড়াছড়ি শহরের বুকে শত শত লাল বুক টিয়া। শুক্রবার সকালে তোলা ছবি। ছবি- সমির মল্লিক

খাগড়াছড়ি শহরের বুকে শত শত লাল বুক টিয়া। শুক্রবার সকালে তোলা ছবি

তিনি বলেন, “প্রতিদিন অনেক পর্যটক এখানে আসেন। তারা পাখিগুলো দেখেন। পাখির কলকাকলিতে অফিস প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত থাকে।”

আরেক বনকর্মী মো. সালাউদ্দিন খান বলেন, কেউ পাখিগুলোকে বিরক্ত করলে বা গুলতি দিয়ে শিকারের চেষ্টা করলে বনকর্মীরা বাধা দেন। পাখি শিকার ঠেকাতে নিয়মিত পাহারাও দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “পাহাড়ে এত বড় জঙ্গল থাকার পরও পাখিগুলো আমাদের অফিস ক্যাম্পাসকে নিরাপদ মনে করে। আমরা দিনরাত পাহারা দিই, যাতে কোনো শিকারি এখানে ঢুকতে না পারে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভোর ৬টার দিকে টিয়ার দল গাছ ছেড়ে চলে যায়। সন্ধ্যার আগেই আবার ফিরে আসে। এ সময় পাখিগুলোর কলকাকলিতে পুরো এলাকা অন্য রকম হয়ে ওঠে।

খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করা বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটির সংগঠক সাথোয়াই মারমা বলেন, পাখি প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, টিয়া পাখির আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি তাদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করা দরকার। এজন্য বট, পাকুড়, উদাল, জাম ও ডুমুরসহ দেশীয় ফলদ ও বড় গাছ লাগানো প্রয়োজন।

সাথোয়াই মারমা বলেন, “এক জায়গায় এত টিয়ার আবাস গড়ে ওঠা আশা জাগানিয়া। পাখিগুলোর নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় আরও উদ্যোগ নেওয়া দরকার।”

পাখিগুলো ভোরে খাবারের খোঁজে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। ছবি- সমির মল্লিক

পাখিগুলো ভোরে খাবারের খোঁজে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়

এদিকে টিয়া পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে পাহারার পাশাপাশি খাদ্য উপযোগী গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ।

খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, বন বিভাগের ক্যাম্পাসে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। নিরাপদ পরিবেশ ও খাবারের ব্যবস্থা থাকায় পাখিগুলো এখানে অবস্থান করছে।

তিনি বলেন, “কেউ যাতে পাখিগুলোকে বিরক্ত বা শিকার করতে না পারে, সেজন্য আমাদের কর্মীরা সার্বক্ষণিক পাহারা দেন। বন বিভাগের বিশেষ টিমও কাজ করছে। পাখির খাবারের জন্য উপযোগী গাছও রোপণ করা হয়েছে।”

বন বিভাগ জানায়, টিয়া ছাড়াও শালিক, ফিঙে ও বাদুড় নিয়মিত এখানে আসে। ফলদ গাছ থাকায় এলাকাটি পাখিদের জন্য উপযোগী। লাল বুক টিয়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে সংরক্ষিত প্রজাতি। এ পাখি শিকার করলে আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে।