পুলিশের ওপর হামলা: গ্রেপ্তার ব্রিটিশ নাগরিককে ফাঁসানোর অভিযোগ

কুমিল্লায় জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।

কুমিল্লা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Nov 2023, 05:28 PM
Updated : 5 Nov 2023, 05:28 PM

রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে কুমিল্লায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা মামলায় এক ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওই ব্যক্তির স্বজনদের দাবি, দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানো হয়েছে।

তবে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ওসি আহমেদ সঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, “ওই ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিক সেটা কে বলেছে? উনি তো দেশেই থাকেন এবং দেশে শিক্ষকতা করেন। আপনারা যেহেতু বিষয়টি জানিয়েছেন, আমাকে বিস্তারিত জানতে হবে। এরপর বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারব।”

২৯ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর ডাকা হরতালের দিন কুমিল্লা নগরীর চকবাজারে বিএনপি নেতাদের মিছিলে ধাওয়া দেয় পুলিশ। এতে সংঘর্ষ শুরু হয়।

এ ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ৩০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ।

২৯ অক্টোবর রাতেই কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই জীবন কৃষ্ণ মজুমদার বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

ওই মামলায় বিএনপি নেতাদের নামের সঙ্গে ৩০ নম্বর আসামি হিসেবে জন্মসূত্রে ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদ ইলিয়াস মুকিতের (৪২) নামও যুক্ত হয়। গ্রেপ্তারের পর তাকে ৩১ অক্টোবর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

ইলিয়াসকে আসামি করা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে এলাকায় বেশ আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

স্বজনরা জানান, ইলিয়াস মুকিত জন্মসূত্রে ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি লন্ডনের ম্যানচেস্টার শহরের বাসিন্দা।

তার বাবা কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার মনোহরপুর এলাকার মো. আব্দুল মুকিত ১৯৬৫ সালে লন্ডনে চলে যান। পরে স্ত্রীকেও নিয়ে যান তিনি। সেখানেই ইলিয়াস মুকিতের জন্ম হয়। তিনি বর্তমানে অনলাইনে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের ট্যাক্স ল’ পড়ান।   

মুকিতের শ্যালক আবদুল গাফফার রুবায়েত বলেন, “আমরা সম্পর্কে খালাতো ভাই। ২০১৮ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশে এসে আমার বোনকে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাগজপত্র রেডি করছিলেন। তাই ওনার যেতে দেরি হচ্ছে।

“কিছুদিন পরই আপাকে নিয়ে ব্রিটেনে চলে যাওয়ার কথা। যদিও ২০২৭ সাল পর্যন্ত ওনার ভিসার মেয়াদ আছে।”

স্বজনদের দাবি, মুকিত বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানো হয়েছে।

রুবায়েত বলেন, মূলত কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জের হাজী হারুন টাওয়ারের একাংশের মালিক তিনি। ওই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে তার বিরোধ আছে। এর জেরে তাকে পুলিশের ওপর হামলা মামলার আসামি করা হতে পারে।

ওই মামলার নথিতে স্বাক্ষর করেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম ও ওসি আহমেদ সঞ্জুর মোর্শেদ।

জানতে চাইলে মামলার বাদী এসআই জীবন কৃষ্ণ মজুমদার বলেন, “আমাদের বেশ কয়েকজন সিনিয়র অফিসারের উপস্থিতিতে মামলাটি করা হয়েছে। ইলিয়াস ঘটনাস্থলে ছিলেন বলেই তার নাম মামলায় এসেছে। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক হলে আদালতে সেই জবাব দেবেন। বাকিটা আমরা তদন্ত করে দেখব।”

একই মামলার ৭ নম্বর আসামি কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সারের দাবি, পুলিশের দায়ের করা সাজানো ওই মামলায় এজাহারভুক্ত ৩০ আসামির মধ্যে ২৯ জনই বিএনপির নেতাকর্মী।

তবে মামলার ৩০ নম্বর আসামি মোহাম্মদ ইলিয়াস মুকিত বিএনপির কেউ নন।

“আমি দীর্ঘদিন ধরে মাঠে রাজনীতি করি। আমরা তাকে চিনি না এবং তিনি কখনো দলীয় অনুষ্ঠানেও আসেননি। তাকে গায়েবিভাবে আসামি করেছে পুলিশ।”  

মুকিতের শ্যালক রুবায়েত আরও বলেন, “ইলিয়াস ভাই ঠিকমতো বাংলায় কথাও বলতে পারেন না। বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। নিজের চুল কাটানোর দরকার হলে নাপিতও তিনি বাসায় নিয়ে আসেন। কোনোদিন শপিং করতেও যান না। কখনও বাইরে গেলে কাউকে সঙ্গে যেতে হয়। ঘটনার দিন তিনি বাসায় ছিলেন। অথচ ওনাকে বিএনপি হরতালে পুলিশের ওপর হামলার মামলায় আসামি করা হয়েছে।  

“এ বিষয়ে আমরা থানায় যোগাযোগ করেছি, পুলিশ দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, অভিযোগপত্র থেকে নাম বাদ দেবে।”

ইলিয়াসের আইনজীবী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, “২৯ অক্টোবরের ঘটনার পরদিন আমার মক্কেল ইলিয়াসকে পুলিশ তার বর্তমান বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছে কোনো হামলার প্রমাণ বা ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রমাণ পায়নি পুলিশ। এমনকি ঘটনাস্থলে তিনি ছিলেনও না। ৩১ অক্টোবর তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ওইদিন অন্য আসামির বিরুদ্ধে রিমান্ড চাওয়া হলেও তার রিমান্ড চাওয়া হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে। পুলিশ হয়ত জানে, আমার মক্কেল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।”

আইনজীবী বলেন, “আমরা বিচারকের কাছে তার অন্তর্বর্তীকালীন জামিন আবেদন করেছি এবং সব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। জেলা জজ হেলাল উদ্দিন ৬ নভেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

“ব্রিটিশ হাই কমিশন থেকে আমার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি তাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তাদের নাগরিকের যত সহযোগিতা দরকার, তারা করতে প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছে।”