Published : 15 May 2026, 09:57 AM
কুমিল্লা অঞ্চলের সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসালয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যের ওষুধ ও সরঞ্জামের চরম সংকট চলছে। সিরিঞ্জ থেকে শুরু করে এমআরআই পরীক্ষার ফিল্মের মজুতও শেষ হাসপাতালটিতে।
এসব ওষুধ ও সরঞ্জাম হাসপাতালকে বিনামূল্যে কিংবা ভর্তুকি মূল্যে দিচ্ছে সরকার। কিন্তু সংকটের কারণে রোগীদের সেসবের জন্য দৌড়ে যেতে হচ্ছে ফার্মেসি, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে। তাতে ব্যয় বৃদ্ধি বা ভোগান্তির পাশাপাশি জীবন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
সাধারণত প্রতি অর্থবছরের জুন মাসে টেন্ডার হওয়ার কথা থাকলেও হাসপাতালটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার টেন্ডারের দুই মাস আগে থেকেই ওষুধ সংকটে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
নতুন বরাদ্দপত্র দিয়ে টেন্ডার করে ঠিকাদার ঠিক হওয়ার পর যতদিন না এসব ওষুধ আসছে ততদিনে কোটি কোটি টাকার ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে হবে রোগীদের।
সম্প্রতি হাসপাতালে ওষুধ কেনাকাটা নিয়ে সাবেক পরিচালকের দুর্নীতির অভিযোগ ও তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শয্যা সংকটকে পুঁজি করে হাসপাতালটির চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই ওষুধ-সরঞ্জামের এ অভাব দেখা দিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনিয়ম অবহেলার ভুক্তভোগী হচ্ছেন নিম্ন আয়ের সেবাপ্রার্থীরা।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় বুড়িচংয়ের কোরপাই এলাকার শ্রমিক ফারুকের সঙ্গে। বুকের হাড় ভেঙে নিমসার সবজি বাজারের শ্রমিক ফারুক ২২ দিন ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে।
চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “প্রাইভেটে গেলে অনেক বেশি খরচ হতো তাই সরকারি হাসপাতালে আসলাম কিন্তু তার কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। বাইরে যেটা ৭০ হাজার টাকা লাগতো সেটি এখানে করতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। তো লাভ কী হলো? শুধু একটি প্যারাসিটামল ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ পাচ্ছি।
“২২ দিন এখানে ছিলাম আমার সবকিছুই বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে। অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে যে দুটি সুতা রেখে এসেছিলাম, পর দিন সেটিও আর পাইনি। আমরা যে সুবিধার জন্য সরকারি হাসপাতালে আসছি তার কিছুই পাচ্ছি না।”
ফারুক বলেন, “ওষুধ, বড়ি যা কিছু আছে- সবই হাসপাতালে পর্যাপ্ত আছে বলে জানি, তাও কেন আমরা পাচ্ছি না। এই ওষুধগুলো কারো না কারো মাধ্যমে হয়তো পাচার হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়ার পর ওষুধ কোম্পানির লোকজন সেগুলো আবার ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তারা সেখানে দেখছে তাদের কোম্পানির ওষুধগুলো লিখছে কিনা।”
একই সময় কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে আসা মাসুদ ভুইয়ার সঙ্গে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মা মাজেদা খাতুনকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। পাঁচ দিন ধরে ভর্তি আছেন সার্জারি বিভাগে।
তিনি বলেন, “দুইটা এক্সরে করিয়েছি ৪০০ টাকা নিয়েছে- এটা ঠিক আছে। কিন্তু বাকি সব আমাকে বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। প্লাস্টার করানোর জন্য দেড় হাজার টাকা বিল ধরেছে। আমি সরকারের কাছে জানতে চাই, ওষুধ থেকে ব্যান্ডেজের গজ পর্যন্ত- সবকিছু যদি বাইরে থেকে কেনা লাগে, তাহলে সরকারি হাসপাতালে এসে আমাদের লাভ কী?”
নেই অতিজরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ
একই দিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিনটি স্টোররুম ঘুরে দেখা যায়, সেগুলো সিলগালা করে তালাবদ্ধ।
হাসপাতালের স্টোর কিপার শ্যামল কান্ত রায় জানান, আন্তঃবিভাগে রোগীদের জন্য বিনামূল্যে দেওয়া ১৩টি ওষুধ শেষ। সাতটি ওষুধের পরিমাণও একেবারে তলানিতে। তবে বেশির ভাগই অপারেশন সংশ্লিষ্ট ওষুধও সরঞ্জাম দেওয়া যাচ্ছে না রোগীদের।
তিনি জানান, inj. vacuronium bromid 10mg(nor Q), Hydrocortisone 100mg, Anoxaprine 60mg, Flucloxacillin 500mg, Ultracain 0.5%, Suxamethanium 2ee, Neustigmet 0.5 mg, Efdrine Hydroclorode 2ml, Tenomaxic Acid, ketamin 10ml, Imipenaum+Cilastatil 500mg, adronalin, Tab. Neuro-B(sulbium) ওষুধগুলো একেবারেই মজুদ নেই।
প্যাথলজিতে সঙ্কট সিরিঞ্জের, ফিল্ম নেই রেডিওলজিতে
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে সরকারি মূল্যে অন্তত ৫০টি স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার মান ভালো হওয়ায় প্যাথলজি সেবার চাহিদাও বেশি। এসব পরীক্ষার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে গেলে তিন থেকে সাতগুণ পর্যন্ত খরচ বেড়ে যায় রোগীদের।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সিরিঞ্জ এবং কিট সঙ্কটে এসব পরীক্ষা নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে। আন্তঃবিভাগে ভর্তি থাকা অস্ত্রোপচারের রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়মিত থাকলেও বহির্বিভাগ থেকে আসা রোগীদের পরীক্ষা অনেকটাই কমে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে Ferritin, T4, T3, TSH এর মত পরীক্ষাগুলো।
সেখানকার এক কর্মকর্তা বলেন, “কিট আর হরমোন রি-এজেন্টের চরম সঙ্কট আছে। স্টোর থেকে যা সিরিঞ্জ পাই তাতেই কাজ চালাতে হয়। তাই অনেক সময় রোগীদের ফিরিয়ে দিতে হয়।”
এমআরআই বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আল মামুন বলেন, “এমআরআই ফিল্ম প্রায় শেষ। কোনো রকমে চলছে। প্রতিদিন মাত্র ১০টি এমআরআই করা যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এমআরআই পরীক্ষার জন্য খরচ হয় অন্তত ছয় হাজার টাকা আর হাসপাতালে করা যায় মাত্র তিন হাজার টাকায়। লোকবল না থাকায় তিন বেলার মধ্যে একবেলা ব্যবহার হচ্ছে মেশিনটি।”
এদিকে দুটি এক্সরে মেশিনের মধ্যে ফিল্মের অভাবে একটি প্রায় অচল বলে জানান এক্সরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শ্যামল চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৫০টি এক্সরে করার চাহিদা থাকলেও এখন হচ্ছে ৫০টি। এখানে করালে ২০০ টাকা ও ২৫০ টাকায় রোগীরা সেবা পান, বাইরে করালে এই ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শাহ আলম বলেন, “থানা থেকে আসা কেইসগুলোর এক্সরে করা যায়। বাইরের আর কোনো এক্সরে করা সম্ভব হচ্ছে না। দুই এক্সরে বিভাগে প্রতিদিন অন্তত ৬০০ এক্সরে পরীক্ষার চাহিদা থাকে।”
হাম আইসোলেশনে নাই বেড, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর সংকট
হাসপাতালটির যে পরিমাণ শয্যা আছে তার বিপরীতে প্রতিদিনই অন্তত দ্বিগুণ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। আন্তঃবিভাগে শয্যা সংকট কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিত্য সমস্যা।
বিশেষ করে শিশু বিভাগে এই সংকট প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর। বর্তমানে হামের আইসোলেশন ইউনিটে ৩০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন অন্তত ৯০ জন রোগী ভর্তি থাকে।
বিছানা না থাকায় ইউনিটের করিডোরে, বারান্দায় এবং সিঁড়ি ঘরে স্থান হয়েছে শিশুদের। চাটাই বিছিয়ে শক্ত মেঝেতেই চিকিৎসা চলছে শিশুদের। যেসব শয্যা দেওয়া হয়েছে সেগুলোতেও স্যালাইন ব্যাগ ঝুলানোর হ্যাঙ্গার নেই।
শিশুদের এ আইসোলেশন ইউনিটে সবচেয়ে বেশি সংকট অতি জরুরি সরঞ্জাম অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের। হাম ও উপসর্গ নিয়ে আসা যেসব রোগী শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়াতে ভোগে তাদের জন্য অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও সাকশন মেশিন জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম। অথচ এখানে যে পরিমাণ অক্সিজেন কনসেনট্রেটর রয়েছে তা দিয়ে ৩০ শতাংশ রোগীর চাহিদা পূরণও সম্ভব হয় না।
একই সঙ্গে হাসপাতালটিতে শিশুদের আইসিইউ না থাকায় এসব সংকটের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
কী বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
ওষুধ-সরঞ্জামের এই সংকটের জন্য আন্তঃবিভাগে শয্যার তুলনায় দুই-তিনগুণ বেশি রোগী ভর্তিকেই মূল কারণ বলছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি এক তাৎক্ষণিক আদেশে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজকে বদলি করা হয়। এখন এই পদটি শূন্য।
দায়িত্বে থাকা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক নিশাত সুলতানা এবং তত্ত্বাবধায়ক মো. শাহ জাহান হাসপাতালটিতে ওষুধ ও সরঞ্জাম সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, সম্প্রতি এই হাসপাতালে কুমিল্লা ও তার আশপাশ থেকে বিপুল পরিমাণে সেবা প্রার্থী আসছে। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ সংকট দেখা দিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক মো. শাহজাহান বলেন, “এমআরআই ফিল্ম শেষ হয়ে গেছে, অপারেশনের জন্য অ্যানেস্থেশিয়া আইটেমও শেষ আর সার্জিকেলের জন্য অনেক সুতার টেন্ডারেও আনা যায়নি যেগুলো রোগীদেরকে কিনে আনতে হচ্ছে। সিরিঞ্জেরও প্রকট সংকট রয়েছে।”
তিনি বলেন, “সত্যি কথা বলতে আমরা এক জায়গা থেকে এনে আরেক জায়গায় দিয়ে, আবার সেই জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দিয়ে কোনো রকমে চলছি।”
তবে চলতি অর্থবছরে কেনাকাটায় অনিয়ম ও অপ্রচলিত ওষুধ কেনাকাটার বিষয়টি জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক নিশাত সুলতানা বলেন, “সে সময় একটি ভুল হয়েছে। পরবর্তীতে সেসব সমস্যা শুধরে নেওয়াও হয়েছে।”
নেপথ্যের কারণ ও দুদকের তদন্ত
হাসপাতালের অনেক কর্মকর্তার দাবি, বিগত বছর হাসপাতালের সাবেক পরিচালকের ওষুধ কেনাকাটায় অনিয়মই সংকটের জন্য মূল দায়ী। সে সময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বেশি কেনাকাটা এবং ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ কেনায় অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে এ ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালের তিনজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালে অতি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এবং সরঞ্জামের বাইরে কেনা হয়েছে কম প্রচলিত ওষুধ। একই সঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি টেন্ডার করা হয়েছে।
সে সময় দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, গত অর্থবছরে বাজারে ১০১ টাকা মূল্যের ইনজেকশন ‘থায়োপেনটাল সোডিয়াম’ কিনতে সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে এক হাজার ২৯৯ টাকা। শুধু এই একটি আইটেমে লোপাট হয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা।
এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ৯ লাখ এরোভাসটাটিন ২০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট কেনা হয়েছে। যা এই ট্যাবলেটের ২০ বছরের চাহিদা, পরে সমালোচনার মুখে এসব ট্যাবলেট বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সেসময় এক প্রতিবাদ সভায় বিএনপিপন্থি চিকিৎসক সংগঠন ড্যাবের কুমিল্লা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আরিফ হায়দার দাবি করেন, “২৪ কোটি টাকার অনিয়মের মধ্যে আড়াই কোটি টাকার ভাগাভাগি হয়েছে পরিচালক মাসুদ পারভেজ ও কয়েকজন চিকিৎসক নেতার মধ্যে।”
হাসপাতালের ওষুধ কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে- এমন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি দুদকের নজরে আসে। এরপরই দুদক সমন্বিত কুমিল্লা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নাজমুল হাসানের নেতৃত্বে দুদকের একটি দল হাসপাতালের মেডিসিন স্টোর রুম ও পরিচালকের কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালায়।
এ সময় তারা পরিচালকের কার্যালয়ের বিভিন্ন নথিপত্র, ওষুধের স্টোর রুমের মজুদ এবং কেনাকাটা সংক্রান্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
এ ছাড়া অনিয়মের বিষয়ে তারা হাসপাতালের পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজের কাছ থেকে অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সংশ্লিষ্ট নথিগুলো তলব করেন।
সে সময় দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নাজমুল হাসান বলেছিলেন, তিনটি ওষুধ কেনাকাটায় কার্যাদেশ ও ক্রয় সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এতে যে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে তা উল্লেখ করে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য দুদক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছে আবেদন করা হবে।
এ বিষয়ে দুদক কার্যালয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওষুধ কেনাকাটার অনিয়ম তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কার্যালয় থেকে জানানো হয়, বিষয়টি নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে এবং একজন নির্দিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাকেও এই তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে সরাসরি কোনো কিছুই বলতে চাননি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
সচেতন নাগরিকদের দাবি
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কুমিল্লা জেলা শাখার সদস্য বদরুল হুদা জেনু বলেন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওষুধ ও সরঞ্জাম নিয়ে যে দুর্নীতি হচ্ছে এটা একেবারেই নিশ্চিত। এটি ঠিক যে, এই হাসপাতালে বেডের তুলনায় দুই-তিন গুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নেন। কিন্তু যারা হাসপাতালটি পরিচালনায় রয়েছেন তারা এই বিষয়টি আগে থেকেই জানেন এবং তাদের সেভাবেই ব্যবস্থাপনা করা উচিত ছিল যেন কোনো অভিযোগ না আসে।
তিনি বলেন, “তারা যদি ওষুধ-সরঞ্জাম না দিতে পারে তাহলে রোগীদের ‘না’ করবে। কিন্তু যা বরাদ্দ পাওয়া যায় সেটির যদি ৪০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় এবং চিকিৎসকরা রোগীদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে কী কারণে ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না তাহলে এত জটিলতা তৈরি হত না। সুতরাং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই এখানে ধোঁয়াশা তৈরি করে রেখেছে।”
তিনি বলেন, “কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যারাই চিকিৎসা নিতে আসে তারা বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। কুমিল্লা ও আশপাশের জেলার কথা বিবেচনা করেই হাসপাতালটিতে বিনামূল্যে ও ন্যায্য মূল্যে ওষুধ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম দেওয়া হয়ে থাকে।
“কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে যদি এসব চাহিদা সম্পন্ন মানুষ বঞ্চিত হয় এবং উল্টো মৌলিক অধিকার সেবা নিতে গিয়ে বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে হয় তার পুরো দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।”
তিনি বলেন, “আমি নতুন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলব, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা সারিয়ে তোলার পাশাপাশি বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে হলেও এই হাসপাতালের ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা উচিত।”
বিশেষজ্ঞ মতামত
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন, যেসব ওষুধের তালিকা শূন্য দেখা যাচ্ছে, এগুলো অত্যাবশ্যকীয় জীবনরক্ষাকারী। এসব ইনজেকশন বা ওষুধ না থাকলে জরুরি অস্ত্রোপচার সম্ভব না।
তিনি বলেন, এসব জরুরি ওষুধ সময়মত না পেলেই সাধারণ রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। এগুলো শেষ হওয়ার আগেই মজুদ করা প্রয়োজন। আর হাসপাতালে সিরিঞ্জ, স্যালাইন, রক্তের ব্যাগ এসবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, রোগীদের অসুস্থতা অনুযায়ী চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে যা ওষুধ থাকে তার চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালে ওষুধ কেনা বা বরাদ্দ পাওয়ার কথা। সব আসবে এমনও নয়। তবে যে ওষুধ বা সরঞ্জামগুলোর সঙ্কট– তা সঙ্কট তৈরির আগেই সরবরাহ থাকা প্রয়োজন। না হয় যারাই সরকারি সেবা প্রত্যাশী তারা শুধু বঞ্চিতই হবেন না বরং প্রাণহানি কিংবা অঙ্গহানির মত ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।
মুজিবুর রহমান বলেন, “কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরও মূল সমস্যা শয্যা সঙ্কট। শয্যা অনুপাতে বরাদ্দ আসে। শয্যা অনুপাতে ওষুধও আসে। কিন্তু সেবাপ্রার্থীরা তো সেটা মানবে না।”
তিনি বলেন, “প্রতিদিন শয্যার তুলনায় রোগী থাকে তিনগুণেরও বেশি। আর যে কোনো সঙ্কটকে পুঁজি করেই অব্যবস্থাপনা শুরু হয়। সুতরাং সরকারকে অবশ্যই বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের এই প্রতিষ্ঠানে দ্রুত সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত।”