০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কুড়িগ্রামে ৩ মাস বন্ধ হরিজন শিশুদের পাঠদানকেন্দ্র, চাঁদা দাবির অভিযোগ

এনসিপির এক নেতার চাঁদা দাবির পর থেকে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের।

কুড়িগ্রামে ৩ মাস বন্ধ হরিজন শিশুদের পাঠদানকেন্দ্র, চাঁদা দাবির অভিযোগ
কুড়িগ্রাম পৌর শহরের হরিজন পল্লীতে ‘নিরন্তর ভালোবাসা’ নামে পাঠদানকেন্দ্র।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Sep 2026, 09:54 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:53 AM

কুড়িগ্রামে প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি পাঠদানকেন্দ্র। এতে বন্ধ হয়ে গেছে ৩৬ শিশুর পড়ালেখা। 

দরিদ্র পরিবারের এসব শিশু অর্থের অভাবে অন্য কোথাও পড়তে না পারায় তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির এক নেতার চাঁদা দাবির পর থেকে সেখানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মা।

তবে চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এনসিপির শ্রমিক শক্তির নেতা মজনু মিয়া।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, কুড়িগ্রাম পৌর শহরের হরিজন পল্লীতে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস। এলাকায় সরকারি কোনও প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করতে ব্যক্তি উদ্যোগে ‘নিরন্তর ভালোবাসা’ নামে পাঠদান কেন্দ্রটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। 

এর মধ্যে কেয়ার বাংলাদেশের সৌহার্দ্য-২ প্রকল্পের সময় নির্মিত কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারের একটি কক্ষে পাঠকেন্দ্রটির কার্যক্রম চলত।

পাঠদান কেন্দ্রটির পরিচালক শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মা বলেন, ২০২৪ সাল থেকে তিনি ব্যক্তি উদ্যোগে হরিজন শিশুদের সেখানে পড়িয়ে আসছেন। শিক্ষকের বেতনও নিজেই বহন করেন। 

তার দাবি, “চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে কেন্দ্রটির জন্য অতীতের ভাড়া চেয়ে চাঁদা দাবি করেন এনসিপি নেতা মজনু মিয়া। টাকা না দেওয়ায় স্কুলঘরে তালা লাগায় দেয়। এরপর থেকে স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।” 

পাঠকেন্দ্রের শিশু শিক্ষার্থী রাম রায় বলেন, “স্যার, আমাদের স্কুল কবে খুলবে? আমাদের স্কুলটা তাড়াতাড়ি খুলে দেন।”

হরিজন সম্প্রদায়ের জোসনা রানী বলেন, “আমরা অনেক গরিব মানুষ। টাকার অভাবে সন্তানদের বাইরে পড়াতে পারি না। এখানে বিনা পয়সায় পড়তে পারত। তিন মাস ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় সন্তানদের পড়ালেখার ক্ষতি হচ্ছে।”

বিদ্যালয়টিতে পড়া অধিকাংশ শিশুই দরিদ্র পরিবারের বলে জানিয়েছেন হরিজন সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক মতিলাল বাশফোর। 

তিনি বলেন, “খাস জমিতে এনজিও কেয়ারের ঘর। পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় আমরা সবাই মিটিং করে শুভ্রজ্যাতি সেন শর্মা দাদাকে বাচ্চাদের পড়াতে বলি। চাঁদাবাজির ঘটনায় স্কুলে তালা। বাচ্চাদের লেখাপড়া বন্ধ। দ্রুত সমস্যার সমাধান করে পাঠকেন্দ্রটি খুলে দেওয়া প্রয়োজন।” 

পাঠকেন্দ্র বন্ধের অভিযোগ অস্বীকার করে মজনু মিয়া বলেন, “কেয়ার প্রকল্পের পর স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ঘরটি পরিচালিত হচ্ছে। আমরা এই ঘরে স্কুল চালানোর শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেই।”

শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মার কাছে তিনি কোনো চাঁদা করেননি। মজনুর দাবি, “২৯ মাসের মধ্যে প্রথম তিন মাসের তিন হাজার টাকা দেওয়া হলেও পরবর্তী ২৬ মাসের কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। এ কারণে ২৬ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। টাকা চাওয়ার পর পাঠকেন্দ্রে তালা দেওয়া হয়।”

কেয়ার বাংলাদেশের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারের ঘর স্থানীয়দের সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেনের সুযোগ থাকার কথা নয়।

কুড়িগ্রাম পৌরসভা ও গণপূর্ত অধিদপ্তর জানায়, ওই জায়গা সরকারি সম্পত্তি এবং কাউকে লিজ দেওয়া হয়নি। শিক্ষা কার্যক্রমে বাধা দেওয়া অনুচিত।

হরিজন সম্প্রদায়ের সভাপতি নন্দলাল বাশফোর বলেন, “আমাদের সন্তানদের পড়ালেখার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত পাঠকেন্দ্রটি খুলে না দিলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”

হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও জাতীয় জনজাতি জোটের আহ্বায়ক ভিমপাল্লী ডেভিড রাজু। 

তিনি বলেন, “পাঠকেন্দ্র বন্ধের বিষয়টি দুঃখজনক। এর পেছনে দায়ী যে-ই হোক, ঘটনাটি সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”