নৌ বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ১৩ বিয়ে, আরেকটি করতে গিয়ে গ্রেপ্তার

পুলিশের দাবি, ওই যুবক বিয়ে করেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেন প্রায় অর্ধকোটি টাকা।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Feb 2024, 02:15 PM
Updated : 10 Feb 2024, 02:15 PM

নৌ বাহিনীতে চাকরি করেন দাবি করে একে একে ১৩ বিয়ে করা এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে ময়মনসিংহের গোয়েন্দা পুলিশ।

গত শুক্রবার রাতে গাজীপুরের চন্দ্রা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে বলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মেদ ভূঞা।

এ ছাড়া ময়মনসিংহের তারাকান্দা থেকে তার সহযোগী ঘটককেও গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার যুবক মহিদুল ইসলাম মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর এলাকার এবং ঘটক কুদ্দুস আলী ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার নগুয়া গ্রামের বাসিন্দা।

পুলিশ সুপার জানান, ২০১৬ সালে শৃঙ্খলার ভঙ্গের দায়ে নৌ বাহিনীর অফিস সহায়ক পদের চাকরি হারান মহিদুল ইসলাম।

এরপর থেকে প্রতারণার মাধ্যমে একে একে ১৩টি বিয়ে করেন। বিয়ে করেই শ্বশুড়বাড়ির লোকজনকে প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেন প্রায় অর্ধকোটি টাকা।

তিনি বিগত কয়েক বছরে প্রতারণা করে ময়মনসিংহে ছয়টি, মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে তিনটি করে এবং কিশোরগঞ্জে একটি বিয়ে করেন।

১৪তম বিয়ে করতে গিয়ে ভুক্তভোগী এক নারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মইদুলের গ্রেপ্তারের খবরে শনিবার ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা কার্যালয়ে এসে হাজির হন প্রতারিত ছয় স্ত্রী ও তাদের স্বজনরা।

ভুক্তভোগীরা জানান, নৌ বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে প্রথমে বিয়ে, পরে বিভিন্ন প্রলোভনে পরিবারের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল মহিদুল ইসলাম ওরফে মইদুলের উদ্দেশ্য। 

তাদের দাবি, প্রত্যেক পরিবার থেকে ৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়েছেন তিনি।

অনার্স সম্পন্ন করা এক নারী বলেন, “বাড়ির পাশের এক ঘটকের মাধ্যমে মইদুল প্রথমে আমার পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। পরিবারের লোকজন প্রথমে রাজি না হলেও ঘটকের জুড়ালো সুপারিশে শেষে রাজি হই। কারণ ছিল, ছেলে নৌ বাহিনীতে চাকরি করেন।

ওই নারীর দাবি, “সে তখন নৌ-বাহিনীর পোশাক পরা ছবিও পাঠায়। মইদুল তখন জানান, নদী ভাঙনে তাদের বাড়িঘর ভেঙে গেছে। তার মা-বাবাও মারা গেছেন। সে তার চাচাতো ভাই পরিচয়ে একজনকে নিয়ে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিয়ে সম্পন্ন করেন।”

ভুক্তভোগী ওই নারীর ভাষ্য, “বিয়ের পরপরই মইদুল আশুলিয়ায় জমি কিনছে বলে আমার পরিবারের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা নিয়ে যায়।

“দুই থেকে আড়াই মাস পরপর বাড়িতে যাতায়াত ছিল তার। জমি কেনা ছাড়াও নিজের অসুস্থতা ও নতুন বাসায় ফার্নিচার কিনবে বলে আরও ২ লাখ টাকা নেয় আমার পরিবারের কাছ থেকে। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর থেকে সে খুবএকটা আসত না।”  

তিনি আরও বলেন, “হঠাৎ একদিন আমাদের পাশের ইউনিয়নে এমন পাত্রের কাছে এক মেয়ের বিয়ের খবর শুনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি, মইদুল সেখানেও বিয়ে করেছে। পরে খোঁজ-খবর নিতে মানিকগঞ্জে তার বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে তার মাকে পাই। সে চাকরি করে না, সেটা নিশ্চিত হই। আজকে ডিবি অফিসে এসে জানতে পারি, সে আমাকেসহ ১৩টি বিয়ে করেছে। এখন যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমাদের দাবি, তার কঠিন বিচার হোক। যেন আর কোনো মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট না হয়।”

আরেক ভুক্তভোগী নারী বলেন, “বাবা-মায়ের তিন মেয়ের মধ্যে আমি সবার ছোট। বাকি দুই বোনের সরকারি চাকরিজীবী ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। তাই বাবা-মা আমাকেও সরকারি চাকরি করেন, এমন ছেলের কাছে বিয়ে দেবেন। মা-বাবাকে ম্যানেজ করে তাড়াহুড়া করে মইদুল আমাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর জমি কিনছে বলে বাবার কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ধার নেয় সে। এরপর আমার এক আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আরও কয়েক লাখ টাকা নেয়। মোট ৮ লাখ টাকা সে নেয়। পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ডিবি অফিস থেকে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানালে আমরা এসে জানতে পারি, সে সব মিলিয়ে ১৩টি বিয়ে করেছে।”

মইদুলের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার ও তার কঠিন শাস্তির দাবি ওই নারীর।

ভুক্তভোগী আরেক মেয়ের বাবা বলেন, “মেয়ে বিয়ে দিয়ে যে প্রতারণার শিকার হব, তা ভাবতেও পারেনি। নিজেকে আজকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। আমার মেয়েটা অনেকটা প্রতিবন্ধী। সেই মেয়েটার কপালে এমন হবে, ভাবতেও পারেনি। লোভের মধ্যে পড়ে মেয়ের জীবনটা আমি শেষ করে দিলাম। মইদুল আমার কাছ থেকে কিছু টাকা নেওয়ার পর আর যোগাযোগ রাখেনি। অসহায় পিতা হিসেবে আমার একটাই দাবি, সে যেন কোনোভাবে পার না পায়।”

ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মেদ ভূঞা বলেন, এক ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযানে নামে।

প্রযুক্তির সহায়তায় গত শুক্রবার মহিদুল ইসলাম ও তার ঘটক সহযোগী কুদ্দুস আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মহিদুলের কাছ থেকে প্রতারণার কিছু ছবি ও পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করা হয়েছে।

বিয়ে করে মহিদুল নানা কারণ দেখিয়ে মেয়েদের পরিবারের কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “সার্বিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।”

নিজ সন্তানদের বিয়ের ব্যাপারে স্বজনদের আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন পুলিশ সুপার।