Published : 07 Jun 2026, 01:46 PM
এক পাশে ভারতীয় সীমান্ত, আরেক পাশে খরস্রোতা কালজানি- সেই নদীতে বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা মোমেনা বেগমের প্রশ্ন এখন কোথায় যাবেন, কীভাবে বেঁচে থাকবেন।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুরি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের এই নারী বলছিলেন, ‘চোখের সামনে ঘরটা নদীতে চলে গেল। কই যাব, কীভাবে বাঁচব-কিছুই জানি না।’
শুধু তিনি নন, ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা উত্তর ধলডাঙ্গা ও দক্ষিণ ধলডাঙ্গা গ্রামের শত শত মানুষ এখন এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।
স্থানীয়দের দাবি, গত তিন দিনে দুই গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ধলডাঙ্গায় প্রায় ৭০টি এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঘর হারিয়ে কেউ খোলা আকাশের নিচে, কেউবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। যাদের বাড়ি-ঘর টিকে আছে তারাও এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাত নামলেই বাড়ে উদ্বেগ। নদীর গর্জন শুনলেই ছুটে যান তীরে। কেউ ঘরের আসবাব সরিয়ে রাখছেন, কেউ আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন গবাদিপশু।
শিলখুরি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন বলেন, গত এক বছরে কালজানি নদী বাম তীর থেকে গড়ে প্রায় ১০০ মিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এতে গত এক বছরে প্রায় এক হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েকদিন ধরে উত্তর ধলডাঙ্গা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ১ হাজার ৬০ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা বিলীন হচ্ছে।

বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী উত্তর ধলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় ও এলাকার বউবাজারও নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে বলে জানান সাবেক জনপ্রতিনিধি।
ভাঙনকবলিত ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনসার আলী বলেন, প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন তাঁর বাড়িতে এসে ভিড় করছেন। কেউ সহায়তা চাইছেন, কেউ ভাঙন ঠেকানোর আকুতি জানাচ্ছেন। মানুষের অসহায়ত্ব দেখে তিনিও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
এদিকে শনিবার বিকেলে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কুদরত-এ-খুদা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাকির হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজীর রহমান এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ সময় নারী-পুরুষেরা তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন প্রশাসনের কাছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি দেখে জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “যতটুকু ভাঙন হয়েছে, হয়েছে। এখন আর যাতে কালজানি নদী মানুষের বসতভিটা কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রোববার থেকে ভাঙন প্রতিরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।”
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ২ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। প্রয়োজনে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “প্রথম ধাপে ২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে আরও ব্যাগ সরবরাহ করা হবে।”

চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বাংলাদেশের একটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। কিন্তু ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না।
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসসহ নদীবিধৌত দেশগুলোতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করে নদীভাঙনকবলিত মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।”