Published : 05 Aug 2025, 12:04 AM
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলা চালিয়ে ১৫ পুলিশ সদস্যকে হত্যার তদন্ত শেষ হয়নি এক বছরেও।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্ত রিপোর্ট দিতে দেরি হচ্ছে।
ঘটনার ২১ দিন পর গত বছরের ২৭ অগাস্ট এনায়েতপুর থানার এসআই আব্দুল মালেক বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ চার নেতার নাম উল্লেখ করে পাঁচ থেকে ছয় হাজার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয় সেখানে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ৪ অগাস্ট দুপুর ১২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা এনায়েতপুর থানার সামনে সমবেত হয়। এ সময় ওসি আব্দুর রাজ্জাক হ্যান্ড মাইকে সমবেত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
বক্তব্যে ওসি রাজ্জাক বলেন, “এই থানা আপনাদের সাধারণ জনগণের। আপনারা থানার কোনো ক্ষয়ক্ষতি করবেন না।”
এ কথায় ছাত্র-জনতা থানা এলাকা থেকে চলে যায়।
এরপর আওয়ামী লীগ নেতা আহমদ মোস্তফা খান বাচ্চুর নেতৃত্বে এজাহারনামীয় আসামিসহ পাঁচ থেকে ছয় হাজার ‘দুষ্কৃতকারী’ দেশীয় অস্ত্র হাতে থানায় হামলা চালায়। তখন আত্মরক্ষায় পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরে আসামিরা পুলিশের কোয়ার্টার ও ওসির বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আগুন দেখে পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় আসামিরা থানায় ঢুকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে প্রথমে সাত পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। এরপর তারা থানা ভবনে ঢুকে পুলিশের ব্যবহারের সরকারি অস্ত্র ও জনসাধারণের জমা দেওয়া বেসরকারি অস্ত্র ও গুলি লুট করে।
এরপর তারা সেসব আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে থানার ভেতর ও বাইরে থাকা অফিসার ও ফোর্সদের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি করে।
এজাহারে বলা হয়,সে সময় থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাকসহ পুলিশ সদস্যরা থানার পাশে বাবু মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেন। আসামিরা সেখানেও হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে।
হামলার সময় নারী কনস্টেবল রেহেনা পারভীনকে মারধর করে এবং টানা-হেঁচড়া করে তার শ্লীলতাহানি করা হয়।
ওই ঘটনায় পর বিকালে সেনাবাহিনীর একটি দল থানা এলাকায় পৌঁছে হতাহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে হাসপাতাল ও মর্গে পাঠায়।

৪ অগাস্ট উত্তাল সিরাজগঞ্জ
গত বছর জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের আগের দিন ৪ অগাস্ট উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো সিরাজগঞ্জ। সকাল ১০টার মধ্যে শহরের অধিকাংশ এলাকা ছাত্র-জনতার দখলে চলে যায়। অন্যদিকে এসএস রোডে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কাছে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এসএস রোড ও বড়পুল এলাকায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে প্রথম প্রাণ হারাণ যুবদল নেতা সোহানুর রহমান রঞ্জু খান।
কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রদলকর্মী সুমন সেখ ও বিএনপিকর্মী চা বিক্রেতা আব্দুল লতিফ নিহত হন। এ খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র জেলা আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকার পতনের আন্দোলন আরও দানা বাঁধে।
এরই মধ্যে এনায়েতপুরে গুলিতে শিহাব আহম্মেদ ও সিয়াম হোসেন নামে দুই শিক্ষার্থী এবং তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী প্রামাণিকের মৃত্যুর আসে। এরপরই এনায়েতপুর থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে।
প্রায় একই সময়ে রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা হয়। নেতাকর্মীরা পাশের রায়গঞ্জ প্রেসক্লাবে আশ্রয় নেন। সেখানে মারধরে এক সাংবাদিকসহ আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়।
বিকালে সিরাজগঞ্জ শহরের মুজিব সড়কে সিরাজগঞ্জ-২ আসনের অপসারিত সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরী ও স্টেশন রোডে একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবে মিল্লাত মুন্নার বাসায় আন্দোলনকারীরা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে।
এছাড়া হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটসহ জেলা ও উপজেলাজুড়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়, কয়েকটি পৌরসভা, দুইটি রেলওয়ে স্টেশন, বসতবাড়ি, সরকারি-বেসকারি বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান এবং বেশ কিছু বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

১৫ পুলিশ হত্যা, কী বলছেন তদন্ত কর্মকর্তা
৪ অগাস্ট বেলা ১২টার দিকে এনায়েতপুর থানায় হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অস্ত্র ও গুলি লুট এবং কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মারধর করা হয়। এতে ১৩ পুলিশ ঘটনাস্থলে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। এছাড়াও থানায় কর্মরত সকল পুলিশ সদস্যরা কমবেশি আহত হন।
এনায়েতপুর থানার নিহত ১৫ পুলিশ সদস্য হলেন- ওসি আব্দুর রাজ্জাক, এসআই রইস উদ্দিন খান, তহছেনুজ্জামান, প্রনবেশ কুমার বিশ্বাস, নাজমুল হোসাইন, আনিসুর রহমান মোল্লা, এএসআই ওবায়দুর রহমান, কনস্টেবল আব্দুস সালেক, হাফিজুর ইসলাম, রবিউল আলম শাহ, হুমায়ন কবির, আরিফুল ইসলাম, রিয়াজুল ইসলাম, শাহিন উদ্দিন ও হানিফ আলী।
২৭ অগাস্ট এনায়েতপুর থানার এসআই আব্দুল মালেক বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। পূর্ব ক্ষোভের কারণে আওয়ামী লীগ নেতারা এ হামলা চালিয়েছে বলে এজাহারে লেখা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এনায়েতপুর থানার এসআই ফরিদ উদ্দিন বলেন, “প্রায় দুই মাস হল এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছি। এর আগে পরিদর্শক কামাল হোসেন ও এসআই আনোয়ারুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করেছেন।
“সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহতদের ময়নাতদন্ত করা হয়। ওই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখনো হাতে পাইনি। বিস্ফোরকের আলামত উদ্ধারের পর সেগুলো পরীক্ষার জন্য ঢাকায় সিআইডিতে পাঠানো হলেও সেই প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। যে কারণে মামলার প্রতিবেদন তৈরিতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। উল্লেখিত প্রতিবেদনগুলো প্রাপ্তি সাপেক্ষে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।”

মামলা ও গ্রেপ্তার
থানা ও আদালত পুলিশ বলছে, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলায় মোট নয়টি মামলা হয়েছে।
এরমধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় চারটি, এনায়েতপুর থানায় আন্দোলনে নিহতের ঘটনায় তিনটি এবং ১৫ পুলিশ হত্যা ও থানায় হামলা এবং অস্ত্র লুটের ঘটনায় একটি এবং উল্লাপাড়া থানায় একটি মামলা হয়েছে।
এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ৬৭২ জন। অজ্ঞাতপরিচয় আসামির সংখ্যা ৫ থেকে ৬ হাজার।
এর বাইরে অতীতের ঘটনার জেরে এবং গত এক বছরে নানা সময়ের ঘটনা মিলে জেলায় মোট ২৯টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে।
রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ২৯টি মামলাগুলোর মধ্যে সিররাজগঞ্জ সদর থানায় ছয়টি, কাজিপুরে দুটি, উল্লাপাড়ায় তিনটি, তাড়াশে চারটি, কামারখন্দে একটি, রায়গঞ্জে তিনটি, এনায়েতপুর থানায় তিনটি, শাহজাদপুর থানায় তিনটি, সলঙ্গা থানায় তিনটি ও বেলকুচি থানায় একটি মামলা হয়েছে।
এসব মামলায় এ পর্যন্ত সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরী, তানভীর ইমাম, চয়ন ইসলাম, আব্দুল আজিজ, জেলা পরিষদের অপসারিত চেয়ারম্যান শামীম তালুকদার লাবু ও উল্লাপাড়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিনা মির্জা মুক্তি ও সিরাজগঞ্জ বারের সাবেক পিপি আব্দুর রহমানসহ ১৬৩ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।

জেলায় শহীদ তালিকাভুক্ত ১৩ জন
জেলায় জুলাই যোদ্ধা হিসেবে শহীদদের তালিকাভুক্ত হয়েছেন ১৩ জন। এদের মধ্যে ছয়জন ঢাকায় এবং সিরাজগঞ্জে সাতজন নিহত হয়েছেন।
আর জেলায় আহতদের মধ্যে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন ৫২৪ জন।
জেলায় ১৩ জন শহীদ জুলাই যোদ্ধা হলেন- সিরাজগঞ্জে নিহত যুবদল নেতা সোহানুর রহমান রঞ্জু খান, শিক্ষার্থী সুমন সেখ, চা বিক্রেতা আব্দুল লতিফ, ভ্যান চালক শিহাব উদ্দিন, শিক্ষার্থী শিহাব আহম্মেদ, সিয়াম হোসেন ও তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী প্রামানিক, ঢাকায় আন্দোলনে নিহত সিরাজগঞ্জের বাসিন্দ ব্যবসায়ী সুজন মাহমুদ, শিক্ষার্থী অন্তর ইসলাম, সেনেটারি মিস্ত্রি জাহাঙ্গীর হোসেন, রিকশা চালক মো. লেবু, নৌ বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান ও পোশাক কর্মী নজরুল ইসলাম।
সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ও জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪ হতাহতদের তালিকা যাচাই-বাচাই জেলা কমিটির সদস্য সচিব মো. নুরুল আমিন বলেন, “এ পর্যন্ত জেলায় বসবাসকারী ১৩ জন জুলাই শহীদ ও ৫২৪ জন জুলাই যোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জুলাই শহীদ ও ৪৪৮ জন জুলাই যোদ্ধার নাম ইতোমধ্যে সরকারিভাবে গ্রেজেটভুক্ত হয়েছে। বাকিদের নাম অপেক্ষমান রয়েছে।”
সিরাজগঞ্জের ডিসি মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, “জুলাই শহীদরা ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র পেয়েছেন। কিছু জুলাই যোদ্ধাকে ১ লাখ টাকা করে চেক দেওয়া হয়েছে। বাকিদের পরে দেওয়া হবে।
“এছাড়া জেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রতি শহীদ পরিবারকে ২ লাখ ও আহতদের ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ সুমনের বাবাকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি অটোরিকশা দেওয়া হয়েছে। শহরের বাজার স্টেশন মুক্তির সোপানে ১৩ শহীদের নামে একটি করে বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে।”

দুই থানার ১৪ অস্ত্রের হদিস নেই
এনায়েতপুর ও হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখনও ১৪টি উদ্ধার হয়নি। অস্ত্র লুটের ঘটনায় করা দুই মামলায় এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এনায়েতপুর থানার ওসি আনারুল ইসলাম বলেন, “গত বছরের ৪ অগাস্ট এনায়েতপুর থানায় হামলা, ভাঙচুর, অস্ত্র লুট ও ১৫ পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় এ পর্যন্ত সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।”
হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি আব্দুর রউফ বলেন, “গত বছরের ৪ অগাস্ট থানায় হামলা, ভাঙচুর ও ২৫টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়ান্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৭টি আগ্নেয়ান্ত্র উদ্ধার হলেও বাকিগুলো এখনও উদ্ধার হয়নি।”
রঞ্জু খানের স্মৃতিস্তম্ভ
এছাড়া সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রথম জুলাই শহীদ জেলা যুবদলের সহ সাধারণ সম্পাদক সোহানুর রহমান রঞ্জু খানের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে জেলা বিএনপি।
১ অগাস্ট দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যুবদল নেতা শহীদ রঞ্জু খানের বাড়ির পাশে শহরের মাছুমপুর সুরুজ মোড়ে এ স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন।