উদ্যোক্তা মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, “আমাদের আরও নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন। তরুণদের কাজে লাগাতে হবে।”
Published : 18 Jun 2024, 09:14 AM
পরিবেশবান্ধব হিসেবে বাগেরহাটে কাঠের তৈরি বাইসাইকেল যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে, অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।
শিশুদের জন্য বিশেষভাবে আম, গামারি কাঠ দিয়ে তৈরি এই সাইকেলে নেই কোনো প্যাডেল। শিশুরা যখন হাঁটতে শেখে তখন তাদের এই ‘বেবি ব্যালেন্স সাইকেল’ দেওয়া হয়।
ইউরোপের দেশ গ্রিসের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘কোকো-ম্যাট’ গত বছর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাচারাল ফাইবার’ এর কাছে ২০ হাজার কাঠের সাইকেলের জন্য ক্রয়াদেশ দেয়। যা এরই মধ্যে রপ্তানি করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে আরও ২০ হাজার সাইকেল গ্রিসে পাঠানো হবে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা মোস্তাফিজ আহমেদ।
তবে ব্যবসায় নানা ঘাত-প্রতিকার পেরিয়ে আর নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতায় নতুন এই পণ্যের সন্ধান পান বলে জানান মোস্তাফিজ। এর আগে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিবেশবান্ধব ডিসপোজেবল হোটেল স্লিপার, খেলনা পুতুলসহ নানা পণ্য রপ্তানি করেছেন।
কাঠের তৈরি শিশুদের বাইসাইকেল উৎপাদনের শুরু সম্পর্কে উদ্যোক্তা মোস্তাফিজ আহমেদ জানান, দুই দশক আগে নারকেল তেল উৎপাদনের ব্যবসা করতে গিয়ে তিনি দেখেন, নারকেলের বিপুল ছোবড়া ফেলে দিতে হচ্ছে অথবা পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে; না হয় নদী ও খালের পানিতে গিয়ে মিশছে।
এদিকে, দাম পড়ে যাওয়ায় হঠাৎ বাগেরহাটের এক সময়ের প্রসিদ্ধ নারকেল তেলের ব্যবসায় ভাটা পড়ে। তখনই নারকেলের ফেলনা ছোবড়া কাজে লাগানোর কৌশল খুঁজতে শুরু করেন মোস্তাফিজ।
২০০২ সালে বাগেরহাটের বিসিক শিল্প নগরীতে ফেলনা ছোবড়া দিয়ে তোশকের (ম্যাট্রেস) ভেতরের অংশ বা ‘কয়ার ফেল্ট’ উৎপাদনের উদ্যোগ নেন তিনি।
২০০৫ সালে প্রথম উৎপাদনে যায় তার কয়ার ফেল্ট কারখানা। শুরু হয় অপ্রচলিত এই পণ্য রপ্তানি।
উদ্যোক্তা জানান, এরপর তিনি লক্ষ্য করেন নতুন এক সমস্যা। ছোবড়া থেকে কয়ার ফেল্ট তৈরির জন্য আঁশ আলাদা করতে গিয়ে টনকে টন গুঁড়ো বের হচ্ছে। যা কোনো কাজেই আসছে না, এমন কী রাখার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। সেই সমস্যার সমাধানও আসে নতুন পণ্য কোকো-পিট তৈরির মধ্য দিয়ে।
২০১৭ সালে বাগেরহাট সদর উপজেলার রাখালগাছি ইউনিয়নের কররী গ্রামে ছোবড়া থেকে আঁশ তৈরির কারখানা স্থাপনের পর সেখানে তিনি নেন নতুন উদ্যোগ। শুরু হয় ফেলে দেওয়া ছোবড়ার গুঁড়ো দিয়ে কোকো-পিট ব্লক (মাটির বিকল্প হিসেবে টবে ব্যবহার করা হয়) তৈরির চেষ্টা।
২০১৮ সালে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির পর শুরু করেন কয়ার ফেল্ট উৎপাদন। দেশ থেকে আরেক নতুন রপ্তানি পণ্য হিসেবে যা গন্তব্য পায় দক্ষিণ কোরিয়ায়।
নতুন সব উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশকে চেনানো মোস্তাফিজ আহমেদের (৫৭) সঙ্গে তার ব্যবসার হাল ধরেন ছোট ভাই মোজাহিদ আহমেদও (৫৪)।
‘ন্যাচারাল ফাইবার’ নামের তাদের প্রতিষ্ঠান কোভিড মহামারির সময় জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, ক্রয়াদেশ বাতিলসহ নানা সংকটে বড় ধাক্কায় পড়ে। তবে তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগেনি। আবারও নতুন উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে হাজির হন তারা।
গেল বছর থেকে নারকেলের ছোবড়ার তৈরি আরেক নতুন পণ্য, একবার ব্যবহার উপযোগী ডিসপোজেবল হোটেল স্লিপার দিয়ে আবারও ইউরোপের বাজারে পাড়ি জমায় প্রতিষ্ঠানটি।
সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি এবার উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু করেছে শিশুদের জন্য কাঠের তৈরি বেবি ব্যালেন্স সাইকেল, খেলনাসহ নারকেলের ছোবড়ার তৈরি আরও কিছু নতুন ধরনের পণ্য।
বাগেরহাট শহরের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প নগরী-বিসিক কারখানায় প্রতিদিন অর্ধশত কর্মী তৈরি করছেন ৮০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত কাঠের সাইকেল। ছোটদের দিয়ে শুরু হলেও এখন তারা বড়দের জন্যও কাঠের বাইসাইকেল তৈরির কাজ শুরু করছেন। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে সান বেড, হোটেল বেড, কুকুর-বিড়ালের খেলনাসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্য।
সেখানকার সাইকেল তৈরির কারিগর শরিফুল তরফদার বলেন, “সাইকেল তৈরিতে কাঠের ১১টি আলাদা অংশের প্রয়োজন হয়। আলাদা আলাদাভাবে এগুলো তৈরি করে সংযোজন করেন তারা। এরপর রং করে কার্টুন ভর্তি হয়ে যায় বিদেশে।”
উদ্যোক্তারা জানান, কারখানাটিতে বর্তমানে চারটি প্রকল্পে শতাধিক শ্রমিক কাজ করছে। এসব শ্রমিকদের তারা নিজেরাই প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগরে পরিণত করেছেন। কাঠের তৈরি আরও নতুন ধরনের বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসছেন তারা। এজন্য কররী গ্রামে তারা কারখানার একটি নতুন ইউনিটও চালু করছেন। যাতে স্থানীয় আরও শতাধিক লোকের কর্মসংস্থানের আশা করছেন তারা।
এরই মধ্যে বাগেরহাটের এই কারখানা থেকে ২০ হাজার কাঠের তৈরি সাইকেল রপ্তানি করা হয়েছে জানিয়ে মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, “কোভিড শুরুর পর প্রায় ২ বছর ধরে আমাদের দুটি কারখানাই বন্ধ ছিল। তখন আমরা চেষ্টা শুরু করি নতুন পণ্য নিয়ে বাজারে আসার। এজন্য বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আমাদের নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন দিই।”
ওই বিজ্ঞাপন দেখে একদিন গ্রিসের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘কোকো-ম্যাট’ যোগাযোগ করে জানিয়ে মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, “তারা আমাদের কাছে নতুন ধরনের পণ্য, ডিসপোজেবল হোটেল স্লিপারের চাহিদা দেয়।
“ডিসপোজেবল হোটেল স্লিপার, খেলনা পুতুল নেওয়ার পর গত বছরই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের দেওয়া মডেল পছন্দ করে ২০ হাজার বাইসাইকেলের ক্রয়াদেশ দেয়। যা এরই মধ্যে রপ্তানি করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে যাবে আরও ২০ হাজার বাইসাইকেল।”
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি এখন তাদের কাছ থেকে চিড়িয়াখানায় হাতি বাঁধার খুঁটি, চেয়ারসহ আরও বেশ কিছু পণ্য নিতে আগ্রহী। কররীর কারখানাতে এগুলো তৈরি করবেন তারা।
কোকো-ম্যাটের প্রতিষ্ঠাতা পল এমোফেডিস বাংলাদেশে আসছিলেন উৎপাদিত পণ্যের কারখানা দেখতে। তিনি সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে আসেন।
ওই সময়ে তিনি বলেছিলেন, “আমি গ্রিক হলেও এখন অর্ধেক বাংলাদেশি। এখানের কর্মীরা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তারা নতুন নতুন আইডিয়া ও উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছেন। নানা নতুন পণ্য তৈরি করছেন।
“আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম প্লাস্টিকের স্পর্শে না আসুক। সেজন্য আমরা শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে আরও অনেক পণ্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। বাংলাদেশে তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্য আমরা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই।”
পলকে কাছে পেয়ে আরও উদ্যোমী কারখানার কর্মীরা। পল এখানে তাদের সঙ্গে মিলে-মিশে কাজ করেন। তাদের কাছ থেকে শিখছেন বাংলা ভাষাও।
“আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি, কররীতে আমি থাকতে চাই কাঠের একটি বাড়িতে,” বলেন কোকো-ম্যাটের প্রতিষ্ঠাতা পল এমোফেডিস।
উদ্যোক্তা মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, “আমাদের আরও নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন। তরুণদের কাজে লাগাতে হবে। তবে আমাদের দেশে এ ধরনের আরও অনেক বৈচিত্র্যময় ও ভিন্নধর্মী কারখানা গড়ে উঠতে পারে। পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা ইউরোপের বাজারে ব্যাপক। রপ্তানিতে এখানে আমাদের নতুন দিগন্ত হতে পারে। তবে এর জন্য সরকারি নীতি-সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন এই উদ্যোক্তা।”
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহা. খালিদ হোসেন বলেন, “বাগেরহাট শহরের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প নগরীতে পরিবেশবান্ধব বাইসাইকেলসহ নানা পণ্য তৈরি হচ্ছে। এসব পণ্য ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে। অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, দক্ষিণের জেলা বাগেরহাটকে ইউরোপে পরিচিতি এনে দিয়েছে এসব পণ্য। ইউরোপে পরিবেশবান্ধব পণ্যের একটি বাজার তৈরি হয়েছে।”