১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

হত্যা মামলার বাদীই সম্পত্তির লোভে বাবাকে খুন করেন: পুলিশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ফান্দাউক গ্রামের হাজী মো. আলম মিয়া। গত ৩ সেপ্টেম্বর হত্যার শিকার হলে তার ছেলে মাহমুদুল হত্যা মামলা করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Sep 2025, 12:55 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:17 PM

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ‘দ্বিতীয় স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করে সম্পত্তি দিয়ে দেবে’ এমন শঙ্কায় নিজের বাবাকে হত্যা করে ছেলে চুরির গল্প সাজিয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

ঘটনার আটদিনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিষয়টি জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সুপার শচীন চাকমা।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামি মো. মাহমুদুল হাসান (২১) হত্যার দায় স্বীকার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জহিরুল আলম তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিভুক্ত করেন।

গত ৩ সেপ্টেম্বর হত্যার শিকার হন নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউক গ্রামের হাজী মো. আলম মিয়া (৬০)। তিনদিন পর ৬ সেপ্টেম্বর তার ছেলে মো. মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে নাসিরনগর থানায় হত্যা মামলা করেন। 

মামলার এজাহারে মাহমুদুল বলেন, ৩ সেপ্টেম্বর অজ্ঞাতনামা আসামিরা টিনের চালা কেটে এবং পেছনের দরজা ভেঙে তার বাবা আলম মিয়ার বাড়িতে প্রবেশ করে এবং আলম মিয়াকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। 

পরে হত্যাকারীরা আলম মিয়ার আলমারি থেকে প্রয়াত স্ত্রী বিলকিস বেগমের আড়াই লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়।

মামলায় আলম মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী আমেনা বেগম এবং আমেনার পূর্বের স্বামী মমিন মিয়াকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এজাহারে মাহমুদুল দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি সিলেটে ছিলেন এবং বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন।

মামলার পর পিবিআইয়ে প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার শচীন চাকমার তত্ত্বাবধানে পুলিশ পরিদর্শক মো. বেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ছায়া তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। 

এ বিষয়ে পিবিআইয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “হত্যাকাণ্ডের সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পিবিআই বুঝতে পারে, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। 

“এজাহারে সৎ মা আমেনা ও তার পূর্বের স্বামীকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করলেও সম্পত্তির লোভ, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মাহমুদুলের অস্বাভাবিক গতিবিধি, মুঠোফোন চুরির ঘটনা গোপন করা এবং সাজানো চুরির গল্প সবকিছুই মাহমুদুলের দিকে সন্দেহ ঘণীভূত করে।”

পরে বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মাহমুদুলকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজের বাবা আলমকে হত্যার দায় স্বীকার করেন মাহমুদুল।

তার জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসপি শচীন চাকমা বলেন, “২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মাহমুদুলের মা বিলকিস বেগম মারা যান। মাহমুদুলের ধারনা ছিল, বাবা আলম তার মায়ের সুচিকিৎসা করেননি এবং তার মা জীবিত থাকাবস্থায় পুনরায় বিয়ে করতে চেয়েছিল। 

“আলম প্রায় সময় অকথ্য ভাষায় ছেলে মাহমুদুলকে গালিগালাজ করতেন। একাধিকবার মাহমুদুলকে তার স্ত্রীর সামনে চড়ও মেরেছিলেন আলম।

“এর মধ্যে আলম দ্বিতীয় স্ত্রী আমেনা বেগমকে পুনরায় বিয়ে করে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার চিন্তা করায় মাহমুদুল তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।” 

এসপি শচীন আরও বলেন, “পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর সিলেট যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন মাহমুদুল এবং বাড়ির পেছনের দরজা খোলা রাখেন। এরপর বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে রাত আনুমানিক ৮টার দিকে পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন।  

“ঘরে ঢুকে তিনি মাচার ওপর লুকিয়ে থাকেন। এরপর সুকৌশলে বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় ফেরার জন্য চাপ দেন মাহমুদুল। 

“আলম বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়লে রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে মাহমুদুল লোহার পাইপ দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। হত্যার পরে লোহার পাইপটি বাড়ির সামনের পুকুরে ফেলে দেন তিনি।”

পুলিশ সুপার শচীন চাকমা আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে নাসিরনগরের ফান্দাউকে মাহমুদুলের দেখানো স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত তিন ফুট লম্বা ও দেড় ইঞ্চি প্রস্থের লোহার পাইপটি থেকে উদ্ধার করেছে পিবিআই।