Published : 13 Jun 2026, 10:38 AM
মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক শিশু প্রায় ৫৮ বছর পর ফিরে পেয়েছেন জন্মপরিচয় ও পরিবারের সদস্যদের। প্রযুক্তির সহায়তা, স্মৃতির খণ্ড খণ্ড চিত্র এবং সন্তানের নিরলস অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে সম্ভব হয়েছে এই পুনর্মিলন।
ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল ইউনিয়নের কালিপুর চৌধুরী বাড়িতে। ফিরে আসা ব্যক্তির নাম দেলোয়ার হোসেন দুলাল চৌধুরী। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত পরিবারের সদস্যরা।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, দীর্ঘ ৫৮ বছর পর পরিবারের সঙ্গে দুলাল চৌধুরীর পুনর্মিলন সত্যিই অত্যন্ত আবেগঘন, বিরল এবং হৃদয়স্পর্শী একটি ঘটনা।
স্বজনরা জানান, ১৯৬৯ সালের দিকে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সে নিখোঁজ হন দুলাল। এরপর পথ হারিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায় পৌঁছান। সেখানে একটি পালক পরিবারের আশ্রয়ে বড় হন তিনি। নতুন পরিবেশে জীবন গড়ে উঠলেও নিজের প্রকৃত পরিচয়, জন্মস্থান কিংবা পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা ছিল না দুলালের।
তবে শৈশবের কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি আজীবন তাকে তাড়িয়ে ফিরেছে। নদী, লঞ্চঘাট, একটি বাজার এবং কিছু পরিচিত পরিবেশের কথা তার মনে থাকলেও সেগুলো দিয়ে নিজের শেকড়ের সন্ধান মেলেনি।

ছেলের অনুসন্ধানেই খোলে রহস্যের জট
দীর্ঘ সময় ধরে পরিচয়ের খোঁজ চললেও কোনও অগ্রগতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাবার হারিয়ে যাওয়া অতীত খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন ছেলে ইমাম হোসাইন আকিব।
সম্প্রতি কোরবানির ঈদকে ঘিরে পারিবারিক আলোচনার সময় বাবার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তিনি নদী, লঞ্চঘাট এবং কালিপুর বাজারের কথা বলেন। এসব তথ্যকে ভিত্তি করে অনুসন্ধান শুরু করেন আকিব।
গুগল ম্যাপ ও বিভিন্ন স্থানীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় মেঘনা নদীর তীরবর্তী কালিপুর অঞ্চলকে। পরে স্থানীয় সাংবাদিক ও গবেষকদের সহযোগিতায় যোগাযোগ করা হয় কালিপুরের চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে।
এরপর সেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের পর কালিপুরে আসেন দুলাল চৌধুরী। সেখানে পৌঁছে তিনি শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে মিল খুঁজে পান এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা ও পরিবেশের।
পুরনো গেইট, খালপথ, আমগাছ এবং লবণ তোলা ঘাটের মতো বিভিন্ন নিদর্শন দেখে তিনি স্মৃতিচারণ করেন। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরাও তার বর্ণনার সঙ্গে এলাকার অতীতের বাস্তবতার মিল খুঁজে পান।
সবশেষে জীবিত ভাই মুকুল চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয় তাদের রক্তের সম্পর্ক। প্রায় ছয় দশক পর দুই ভাইয়ের মিলনের মুহূর্তে উপস্থিত সবার চোখেই জল এসে যায়।
দুলাল চৌধুরী বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের পরিবারকে খুঁজে পাব। ছোটবেলার স্মৃতি ছাড়া আমার কাছে কিছুই ছিল না। আজ ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনদের কাছে ফিরে এসে মনে হচ্ছে জীবনের বড় একটি শূন্যতা পূরণ হয়েছে।”
বাবার মুখে শোনা কিছু অস্পষ্ট তথ্য নিয়েই অনুসন্ধান শুরু করার কথা জানান ছেলে ইমাম হোসাইন আকিব। তিনি বলেন, “গুগল ম্যাপ, স্থানীয় তথ্য ও মানুষের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে সঠিক জায়গার সন্ধান পাই। পরিবারের সঙ্গে বাবার পুনর্মিলন আমাদের জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
আকিব বলেন, “আমি আমার জীবনের শেকড় খুঁজে বের করেছি। আমি এখন গর্ব করে বলতে পারি- আমার দাদার নাম শামসুল হক চৌধুরী, দাদির নাম সুফিয়া বেগম।
“আমার এই প্রাপ্তি কোনও কিছুর মাধ্যমে প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আল্লাহর রহমতে আমার বাবাকে ফ্যামিলি ফিরিয়ে দিতে পেরেছি।”
দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া দুলাল চৌধুরীকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
ভাই মুকুল চৌধুরী বলেন, “ছোটবেলায় ভাই হারিয়ে যাওয়ার পর আমরা অনেক খোঁজ করেছি। একসময় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। এত বছর পর আবার তাকে ফিরে পাব, কখনো কল্পনাও করিনি। আজ আমাদের পরিবারের জন্য আনন্দের দিন।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, এত বছর পর একজন মানুষ পরিবারকে খুঁজে পেয়েছেন- এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য। ঘটনাটি সবাইকে আবেগাপ্লুত করেছে।
আরেক বাসিন্দা মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কতটা বদলে দিতে পারে, এটি তার বড় উদাহরণ। হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত শেকড়ে ফিরে এসেছেন।
ইউএনও মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, এত দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকার পর আবার পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরে আসা শুধু একটি ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় নয়, এটি পারিবারিক বন্ধন এবং ভালোবাসার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। এই পুনর্মিলনের মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের আবেগ, আনন্দ ও উচ্ছ্বাস সবাইকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
বর্তমানে দেলোয়ার হোসেন দুলাল চৌধুরী স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আবারও যুক্ত হয়েছেন তার জন্মপরিবারের সঙ্গে। নতুন করে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি ফিরে পেয়েছেন নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিচয়।
হারিয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় দশক পর এক শিশু পরিবারের কাছে ফিরে আসার ঘটনা এখন চাঁদপুরজুড়ে আলোচনার বিষয়। প্রযুক্তির ব্যবহার, সন্তানের অদম্য প্রচেষ্টা এবং মানুষের আন্তরিক সহযোগিতায় এই পুনর্মিলন অনেকের কাছেই এক অনন্য মানবিক গল্প হয়ে উঠেছে।