১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

রাবির সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটি ভেঙে পড়েছে, স্মৃতিকাতর শিক্ষার্থীরা

কয়েক দশক ধরে সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির পতনের সঙ্গেই অবসান ঘটে অনেকের স্মৃতিরও।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 11:19 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

কেউ এখানে বসে কাটিয়েছেন প্রথম বর্ষের অলস বিকাল। কেউ কেউ ‘জটিল’ ভাইভা শেষে এখানে এসে ছেড়েছেন স্বস্তির নিঃশ্বাস। কারও আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার প্রথম দিনের স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে জায়গাটি। 

লাল ফুলে ছেয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার নিচে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ছবি তোলা কিংবা নিছক কিছুক্ষণ বসে থাকা-  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক প্রজন্মের কাছে এটি ছিল পরিচিত এক ঠিকানা।

সোমবার সকালে হঠাৎ ভেঙে পড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটি। কয়েক দশক ধরে সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির পতনের সঙ্গেই অবসান ঘটে অনেকের স্মৃতিরও। তবে গাছটি আর না থাকলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পগুলো এখন ফিরে আসছে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে।

গাছটির সঠিক বয়স জানা না গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই এটি লাগানো হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান। 

অর্থাৎ কয়েক দশক ধরে ক্যাম্পাসের বদলে যাওয়া, অসংখ্য শিক্ষার্থীর আসা-যাওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নানা মুহূর্তের নীরব সাক্ষী ছিল গাছটি।

কৃষ্ণচূড়ার মৌসুমে অবশ্য গাছটির রূপ বদলে যেত। সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে উঠত অসংখ্য লাল ফুল। দূর থেকেই চোখে পড়ত তার রঙিন উপস্থিতি। তখন সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের সামনের জায়গাটি হয়ে উঠত আরও আকর্ষণীয়। ছবি তোলা থেকে শুরু করে আড্ডা- শিক্ষার্থীদের আনাগোনায় মুখর হয়ে উঠত গাছটির আশপাশ।

তবে সৌন্দর্যের বাইরেও গাছটির সঙ্গে জমে ছিল মানুষের ব্যক্তিগত গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মামুন-উজ্জামান স্নিগ্ধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে! মানুষ, গাছ, প্রাণ কিংবা প্রকৃতি কারো প্রতিই হয়তো এজন্য মায়া রাখতে নেই। স্মৃতিকাতর হই, হৃদয় ভারী হয়ে আসে।”

জান্নাতুল ফেরদৌস রিতুর কাছে গাছটির স্মৃতি আরও ব্যক্তিগত। ভর্তি পরীক্ষা শেষে বাবাকে প্রথম দেখেছিলেন এই গাছের নিচেই। তিনি বলেন, “ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর আব্বুকে প্রথম দেখেছিলাম এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে। সেই মুহূর্তের সঙ্গে, সেই জায়গাটার সঙ্গে গাছটারও যেন একটা অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আজ যখন দেখলাম গাছটা আর নেই, মনে হলো পরিচিত কোনো আপনজনকে হারিয়ে ফেলেছি।”

শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরাই নন, গাছটি ভেঙে পড়ায় স্মৃতিকাতর হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাও।

সাবেক শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ অভি গাছটির ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “বিজ্ঞান ভবনের দিকে সাধারণত বসা হতো কম। হল থেকে যাওয়া-আসার সময় সামনে দিয়ে যেতাম, এই আরকি। তবে কৃষ্ণচূড়ার দিনে এখানে অনেকক্ষণ দাঁড়াতাম। দেখতাম কী সুন্দর। গাছটি ভেঙে গেছে। এমন অনেক কিছুই আসলে শেষ হয়ে যায়, যা আমাদের স্মৃতিকাতর করে। বাস্তব থেকে গল্পে স্থানান্তরিত হয়।”

আরেক সাবেক শিক্ষার্থী সাদিয়া ইয়াসমিনের কাছেও গাছটি ছিল ক্যাম্পাসের স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি লিখেছেন, “ক্যাম্পাস ছেড়েছি বছর দুয়েকের বেশি। কিন্তু ক্যাম্পাসের কথা মনে হলেই কিছু জিনিস স্মৃতিতে ভাসত, তার মধ্যে বড় এই কৃষ্ণচূড়া গাছ একটা। আবার কবে ক্যাম্পাসে যেতে পারব জানি না। কিন্তু গাছটা যে এখন আর ওখানে নেই, এটা ভাবলেও মন ভার হয়ে আসছে। অদ্ভুত না!”

সোমবার গাছটি ভেঙে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে গাছটির পুরোনো ছবি। কেউ নিজের তোলা ছবি খুঁজে বের করেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা লিখেছেন। কারও কাছে গাছটি কেবল একটি গাছ নয়- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি সময়ের প্রতীক।

তবে দীর্ঘদিনের এই গাছটির পতনের পেছনে রয়েছে স্বাভাবিক বার্ধক্যও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান বলেন, “গাছটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই লাগানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন বয়স হওয়ার কারণে এর মূল দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মাটির নিচের মূলের ওপর নির্ভর করে গাছটি দাঁড়িয়ে থাকলেও ওপরের দিকে শাখা-প্রশাখা বেশি বিস্তৃত হয়ে যাওয়ায় গোড়ার পক্ষে সেই ভার বহন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই গাছটি ভেঙে পড়েছে।”

তিনি বলেন, “গাছটির কাণ্ডের ভেতরে পোকামাকড়ের আক্রমণের চিহ্নও দেখা গেছে। পরিবেশ ও পরিচর্যার ওপর একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের আয়ু অনেকটাই নির্ভর করে। অনুকূল পরিবেশে এবং কাণ্ডে পোকামাকড়ের আক্রমণ না হলে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ শতাধিক বছর, এমনকি প্রায় ২০০ বছর পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারে।”