১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

২২ বছর পর সাব্বির হত্যার রায়, ছাত্রদলের সাবেক নেতা জাকিরসহ সবাই খালাস

“রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে না পারায় নারায়ণগঞ্জের একটি আদালত সব আসামিকে খালাস দিয়েছে।”

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jan 2025, 09:55 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:28 PM

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত ব্যবসায়ী নেতা ছাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খানসহ সব আসামিকে খালাস দিয়েছে আদালত।

মঙ্গলবার দুপুরে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মমিনুল ইসলাম আসামিদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আবুল কালাম আজাদ জাকির জানান।

মামলায় খালাস পাওয়া বাকি আসামিরা হলেন- জাকির খানের দুই ছোট ভাই জিকু খান ও মামুন খান, তার সহযোগী জঙ্গল ওরফে লিটন, মোক্তার হোসেন, মনিরুজ্জামান শাহীন, নাজির আহমেদ ও আব্দুল আজিজ।

তাদের মধ্যে মনিরুজ্জামান শাহীন মারা গেছেন। 

২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর মাসদাইর এলাকায় নিজের বাড়ির অদূরে ছাব্বির আলম খন্দকারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিট পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সাবেক সহসভাপতি ছাব্বির বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা (বহিষ্কৃত) ও বর্তমানে তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের ছোট ভাই। ২২ বছর পর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হল।

জেলা আদালতের পিপি আবুল কালাম বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে না পারায় আদালত সব আসামিকে খালাস দিয়েছে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি এখনও হাতে আসেনি। যিনি খুন হয়েছিলেন, তার ভাই তৈমুর আলম খন্দকার সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিল বিভাগের একজন আইনজীবী। নিহতের মেয়েও একজন আইনজীবী।

“ওনারা নিজেরাও এই মামলাটি তদারকি করেছেন। এখন এই রায়ের বিপরীতে মামলাটির বিষয়ে পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা বাদীর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম বলেন, “এই মামলায় ৫২ জন সাক্ষীকে তালিকাভুক্ত করা হলেও সাক্ষ্যগ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে ২১ জনের। দীর্ঘ সময়ে এ মামলাটি তদন্ত করেছেন অন্তত নয়জন কর্মকর্তা।”

যদিও রায়ের বিষয়ে মন্তব্য জানতে নিহতের ভাই তৈমুর আলম খন্দকার ও মেয়ে ফাতেমা-তুজ-জোহরার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

এদিকে মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় সকাল থেকেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। জাকির খানের কয়েকশ অনুসারী আদালতপাড়ায় জড়ো হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যকে সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক কাইউম খান বলেন, “সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে কাশিমপুর কারাগার থেকে জাকির খানকে নারায়ণগঞ্জ আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার পর তাকে আবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”

মামলার নথির বরাতে আইনজীবী জানান, সকালে প্রাতঃভ্রমণের জন্য নগরীর মাসদাইর এলাকার শেরে বাংলা সড়কের বাসা থেকে বের হন ব্যবসায়ী নেতা ছাব্বির আলম খন্দকার। বাসার অদূরে সড়কের ওপর স্থানীয় দুজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় তার বড় ভাই আলোচিত রাজনীতিক তৈমুর আলম খন্দকার ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

নারায়ণগঞ্জের জাকির খান রিমান্ডে

ওই মামলায় তিনি ওই সময়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খানসহ কয়েকজনকে আসামি করেন। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে জাকির খান ও তার দুই ভাইসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি।

অভিযোগপত্রে গিয়াসউদ্দিনকে অব্যাহতি দেওয়ায় নারাজি দিলে আদালত পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। যদিও ২০১১ সালে মামলার বাদী তৈমুর তার নারাজি পিটিশন প্রত্যাহারের আবেদন করলে সিআইডির দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়। তবে এর কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকে।

এ মামলার অভিযোগপত্রে অভিযুক্তের তালিকায় তিন নম্বরে ছিলেন জাকির খান। উপরের তালিকায় ছিল তার দুই ছোট ভাইয়ের নাম। ছাব্বির আলম হত্যা মামলা ছাড়াও জাকির খান আরও অন্তত তিনটি হত্যা এবং অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ ২৯টি মামলার আসামি। বেশ কয়েকটি মামলায় এরই মধ্যে তিনি বেকসুর খালাস ও জামিন পেয়েছেন।

এদিকে দীর্ঘ বছর পলাতক থাকার পর ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর র‌্যাব-১১ এর এক অভিযানে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন জাকির খান। তার গ্রেপ্তারের পর ছাব্বির আলম হত্যা মামলার বিচারকাজ গতি পায়।

গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে সাক্ষ্য দেন এই মামলার বাদী তৈমুর আলম খন্দকার।

গত বছর আসামিপক্ষের আইনজীবীর এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির আদেশ দেন বলে জানান জাকির খানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাজীব মণ্ডল।

তিনি বলেন, “জাকির খানের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা ছিল। ৩০টি মামলায় এরই মধ্যে তিনি খালাস পেয়েছেন। আজ আরও একটি হত্যা মামলায় তিনি খালাস পেলেন। দুটি চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলা এখনও তার বিরুদ্ধে চলমান। কিন্তু ওই দুই মামলাতেও তিনি জামিনে রয়েছেন। মামলার কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছানোর পর তার মুক্তির আর কোনো বাধা থাকবে না।”

চার খুনের আসামি নারায়ণগঞ্জের আলোচিত 'ক্যাডার' জাকির গ্রেপ্তার

পরিবহন দখল নিতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১২

নব্বইয়ের দশকে জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজ থেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে আসা জাকির হোসেন ওরফে জাকির খান এক সময় শহরের ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হন। ছাব্বির আলম খন্দকার হত্যার পর আসামি হিসেবে নাম এলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

প্রায় দুই দশক পর আগ্নেয়াস্ত্রসহ তাকে গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা বলেন, ছাব্বির হত্যা মামলার পর জাকির থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান। পলাতক থাকা অবস্থাতেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় আদালত সাজা প্রদান করে। এরপর থেকে তিনি আর দেশে ফেরেননি। এক বছর আগে ভারত হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

জাকিরের নামে চারটি হত্যা মামলাসহ অসংখ্য মামলা রয়েছে উল্লেখ করে র‌্যাব জানায়, নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী ও মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন জাকির খান। দেওভোগ এলাকার অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী দয়াল মাসুদকে শহরের সোনার বাংলা মার্কেটের পেছনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে শহরের ত্রাস হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী।

“জাকির খানের বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালে সন্ত্রাসমূলক অপরাধ দমন বিশেষ আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় তার ১৭ বছরের সাজা হয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে তার সাজা কমে আট বছর হলেও তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে দেশে ও বিদেশে প্রায় দুই দশক পলাতক ছিলেন।”

স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী জানান, ১৯৮৯ সালে জাতীয় পার্টির প্রয়াত সংসদ সদস্য এ কে এম নাসিম ওসমানের হাত ধরে জাকির জাতীয় ছাত্রসমাজে যোগ দেন। ওই নেতার সঙ্গে বিরোধের জেরে ১৯৯৪ সালে তিনি ছাত্রদলে যোগ দেন।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জাকির জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হন। তখন শহরের ডিআইটিতে তাকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়। বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কয়েক দফা জেলও খাটেন তিনি। দেশে না থাকলেও অনুসারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল জাকির খানের।

গত ৫ অগাস্ট শিক্ষার্থী-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে শহরের পরিবহন, ঝুটসহ বিভিন্ন সেক্টরে জাকির খানের অনুসারীদের দখল ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। গত ২২ সেপ্টেম্বর একটি পরিবহন দখলকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে জাকির খানের অনুসারীদের সঙ্গে বিএনপির আরেকটি পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এই সময় গুলিও চলে।