Published : 23 Dec 2024, 05:23 PM
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি হামলাসহ বিভিন্ন শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ছয় শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ মোট ৩২ শিক্ষার্থীকে নানা মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন।
এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ২৫ জন নেতাকর্মীই শাস্তির আওতায় রয়েছে। বাকি সাতজন সাধারণ শিক্ষার্থী।
বিভিন্ন বিভাগ ও আবাসিক হল এবং প্রক্টর দপ্তরে জমা পড়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধ বিবেচনায় প্রশাসন এসব শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক মো. আখতার হোসেন মজুমদার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে অপরাধের ধরন ও মাত্রাভেদে ছয়জনকে স্থায়ী বহিষ্কার (তবে ছাত্রত্ব না থাকলে সনদ বাতিল), পাঁচজনকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার, চারজনকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার, দুজনকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার, একজনকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, একজনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১৩ জনের আবাসিকতা বাতিল করা হয়েছে।
শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা উপ-কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩৫তম সিন্ডিকেট সভায় এসব শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের তালিকা থেকে জানা যায়, স্থায়ী বহিষ্কৃতদের ছয়জনই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তারা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি গোলাম কিবরিয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু, বর্তমান সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত কুমার রায় ও ছাত্রলীগ কর্মী মিশকাত হাসান।
এ ছাড়া দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে পাঁচজনকে। তাদের মধ্যে চারজনই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন। তারা হলেন- নবাব আব্দুল লতিফ হলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম রেজা, ছাত্রলীগের কর্মী আব্দুল্লাহ আত তাসরিফ ও মুজাহিদ আল হাসান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম।
এ ছাড়া আরবি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আরিফুল ইসলামকেও দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
এক বছরের জন্য বহিষ্কৃত চারজনের তিনজনই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তারা হলেন- রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলফি শাহরিন আরিয়ানা ও ছাত্রলীগ কর্মী জারিফা আহনাফ ইলমা, মাদার বখশ হলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কিশোর পাল। অপর শিক্ষার্থী হলেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আহসানুল হক মিলন।
ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে ছাত্রলীগ কর্মী আনিকা আলম ঊষা ও মরিয়ম আক্তার শান্তাকে। এ ছাড়া একই মেয়াদের জন্য বহিষ্কার ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অন্তর বিশ্বাসকে। একই বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন নাবিলকে পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১৩ শিক্ষার্থীর হলের আবাসিকতা বাতিল করা হয়েছে। যাদের ১০ জনই ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। তারা হলেন- বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি তাজরীন আহমেদ খান মেধা, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশা খাতুন ও নবনীতা বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক সম্পাদক নুসরাত জাহান পাপড়ি, সহসম্পাদক লিমা খাতুন, উপ-প্রচার সম্পাদক বাবলি আক্তার, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক নুর ই জান্নাত কথা, গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ফারিনা জামান মিম, দপ্তর সম্পাদক জাফরিন খান প্রিয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাইতাহ ইসলাম।
এ ছাড়া চারুকলা অনুষদের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বাবলী ইসলাম নিঝুম, সমাজকর্ম বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের কাজী উর্বি ইয়াসমিন রূপ এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আফরিদা বিনতে ইকবালের আবাসিকতাও বাতিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ একটি রাজনৈতিক দলের। তবে তাদেরকে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি বরং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ জায়গায় বার্তা থাকবে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাকে দল-মত নির্বিশেষে শাস্তি পেতে হবে।”
এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু বলেন, “জুলাই আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দ্বারা কেউ আহত কিংবা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। উপরন্তু ১৮ জুলাই আন্দোলনকারীরা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এমনকি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি কোথাও সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার প্রমাণ কেউই দেখাতে পারবে না।"
“অথচ আমরা দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্ষমতার ন্যাক্কারজনক অপব্যবহার। বিগত ১৮ বছরে ছাত্রশিবির কিংবা ছাত্রদল করার কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ এমন ন্যাক্কারজনক হস্তক্ষেপের স্বীকার হননি। কেউ ছাত্রত্ব হারায়নি। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের কেবলমাত্র ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার থাকার দরুন বহিষ্কারের যে অপসংস্কৃতি চালু করা হল তার দায় বহন করতে হবে আগামী দিনগুলিতে। অথচ প্রশাসন চাইলেই সুন্দর নজির স্থাপন করতে পারতেন।”