বিরতির সময়ই লিখে দিলেন ১-০ তে জিতবে ব্রাজিল!

বিরতির ফাঁকে কথা হলো ৩৫ বছর বয়সী এক ব্রাজিলিয়ান সমর্থকের সঙ্গে, যার ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেল ম্যাচ শেষে!

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Nov 2022, 06:22 AM
Updated : 29 Nov 2022, 06:22 AM

প্রথম দেখায় চোখ আটকে গেল তার দিকে। গায়ে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি। মাথায় আবার মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী টুপি। ওলে, ওলে ওলে…কোরাসের সুরে গলা ফাটিয়ে চলেছেন তো চলেছেনই ক্লান্তিহীনভাবে। ততক্ষণে প্রথমার্ধে শেষ। গোলের দেখা নেই রিশার্লিসন, ভিনিসিউস জুনিয়র, রাফিনিয়াদের পায়ে। কৌতুহল নিয়ে দিয়েগো নান্তে নামের ওই ব্রাজিলিয়ান সমর্থকের কাছে গেলাম। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখতে হাসিমুখে বললেন, কিছু বলবে? 

আর দেরি নয়, প্রশ্নটা করে ফেললাম-যেভাবে ব্রাজিল খেলছে, তাতে আজ কি জিতবে? একজন পাঁড় সমর্থকের জন্য প্রশ্নটা মোটেও সুবিধের নয়। প্রশ্ন শুনে নান্তোর চোখে বিস্ময়ের শেষ নেই। স্বস্তির কথা রাগ-ক্ষোভ নেই, বরং কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকালেন। এই প্রতিবেদকের হাতে থাকা কলম ও নোট বুক চেয়ে নিলেন। তারপর লিখে দিলেন, নেইমারকে ছাড়াই ১-০ গোলে জিতবে। 

দোহার স্টেডিয়াম-৯৭৪-এ দলের আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা নেইমারকে ছাড়া সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ গোলেই জিতেছে ব্রাজিল। সার্বিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে কাতার বিশ্বকাপ শুরু করা দলটি টানা দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে পেরিয়েছে গ্রুপ পর্বের বৈতরণী। 

এই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে সুইসদের বিপক্ষে জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ পেল ব্রাজিল। আগের দুই দেখায় পয়েন্ট খোয়াতে হয়েছিল। সেই ১৯৫০ সালে প্রথম দেখায় ২-২ ড্র, চার বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপের ম্যাচের নিষ্পত্তি ১-১ ড্রয়ে। 

নেইমারের জায়গায় সুইসদের বিপক্ষে শুরুর একাদশে খেলেন ফ্রেদ। কিন্তু প্রাণভোমরা অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের আক্রমণের সুর শুরু থেকে বড্ড বেসুরো। সুইস গোলরক্ষককে তেমন কোনো পরীক্ষাই নিতে পারছিলেন না ভিনিসিউস, ফ্রেদরা। সার্বিয়া ম্যাচে চোখ ধাঁধানো ভলিতে চলতি আসরে সেরা গোলটির একটি করা রিশার্লিসনও ছিলেন বিবর্ণ। 

প্রথমার্ধের বিবর্ণতা কাটিয়ে ওঠার কিছুটা ইঙ্গিত মিলল দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে। ৬৪তম মিনিটে ভিনিসিউস জালে বলও জড়ালেন। উচ্ছ্বাসের গগণবিদারী চিৎকারে কেঁপে উঠল গ্যালারি। কিন্তু চুপসে যাওয়া বেলুনোর মত মুহূর্তে স্তব্ধও হয়ে গেল ভিএআরের নাক গলানোয়। আক্রমণের শুরুতে অফসাইডে ছিলেন রিশার্লিসন। 

গ্যালারিতে বয়ে যাওয়া হলুদ জার্সির স্রোতের ভিড়ে খড় কুটোর মতো ভেসে থাকা গুটি-কয়েক সুইস সমর্থক পাশ থেকে হা রে রে করে চেচিয়ে উঠলেন অফসাইডের বাঁশি বাজার আনন্দে। হকচকিয়ে গেলেন ব্রাজিল সমর্থকরা। কিছু একটা বললেন প্রতিপক্ষ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে। ওই দুই সুইস সমর্থক তাদের পাত্তাই দিলেন না! 

আরেকটি ড্রয়ের চোখ রাঙানি দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে ম্যাচ। ব্রাজিল সমর্থকদের দুর্ভাবনার পারদ চড়তে থাকে। এর মধ্যে আচমকাই এসে যায় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৮৩তম মিনিটে ভিনিসিউসের কাছ থেকে বল পেয়ে বুলেট গতির শটে দূরের পোস্ট দিয়ে জাল খুঁজে নেন কাসেমিরো। এগিয়ে যাওয়ার আনন্দের বন্যা বইতে থাকে গ্যালারির চারধারে। 

যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে প্রতি-আক্রমণ থেকে ব্যবধান বাড়ানোর দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন ভিনিসিউস। কিন্তু ওয়ান-অন-ওয়ান চ্যালেঞ্জে রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড এড়াতে পারেননি আকনজিকে। একটু পর রদ্রিগোর চেষ্টাও রুখে দেন এই সুইস ডিফেন্ডার। তাতে ব্যবধান আর দ্বিগুণ হয়নি। 

শেষের বাঁশি বাজতে চারধার কাঁপিয়ে নেচে ওঠেন ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা। আমি খুঁজতে থাকি নান্তো নামের সেই ভবিষ্যৎদ্রষ্টাকে। কিন্তু ততক্ষণে হলুদ উচ্ছ্বাসের স্রোতে হারিয়ে গেছেন তিনি। নোট বুকে তার লেখার দিকে তাকিয়ে শুধু ভাবতে থাকি। 

ভাগ্যিস নান্তের একটি ছবি এবং কি মনে করে একটা সেলফিও তুলে রেখেছিলাম!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক