১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা বাড়ায় সম্পর্কের জটিলতা

ভাবুন তো- অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা ইচ্ছাটা নিজের ভেতরের অনিশ্চয়তা থেকে তৈরি হচ্ছে কিনা?

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 May 2026, 03:57 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:33 PM

জীবনের অনিশ্চয়তা অনেক সময়ই অস্বস্তিতে ফেলে। তখন মনে হয় সবকিছু নিজের হাতে রাখলেই যেন নিরাপত্তা পাওয়া যাবে।

তবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের এই প্রবণতা বরং মানসিক চাপ বাড়ায় এবং সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। অনেক সময়েই বোঝা যায় না কখন দায়িত্বশীলতা আর নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে।

নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের লক্ষণ

মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘কাম ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উদাহরণ দিতে উল্লেখ করা হয়, প্রথমে বুঝতে হবে, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ দেখতে কেমন। অনেক সময় এটি খুব সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পায়।

যেমন- অন্যের কাজ নিজে করে ফেলা, সবকিছু বারবার যাচাই করা, অন্যের সিদ্ধান্তে অস্বস্তি বোধ করা বা নিজের মতো না হলে বিরক্ত হওয়া। বাইরে থেকে এটি দায়িত্বশীলতা মনে হলেও ভেতরে থাকে অস্থিরতা ও উদ্বেগ।

মনে হতে পারে, ‘আমি না করলে ঠিকমতো হবে না’- এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে চাপ তৈরি করে। নিজের ওপরেও চাপ বাড়ে, আবার অন্যরাও অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করে।

কেন নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া হয়?

নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন সাধারণত ক্ষমতা দেখানোর জন্য নয়, বরং নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য। যখন জীবনে অনিশ্চয়তা, ভয় বা অতীতের কোনো অস্থির অভিজ্ঞতা থাকে, তখন মনের ভেতরে একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়। সেই ব্যবস্থা বলে সবকিছু নিজের মতো রাখলেই ঝুঁকি কমবে।

অনেক ক্ষেত্রে এটি উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত। মস্তিষ্ক যখন কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুভব করে, তখন সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এতে সাময়িক স্বস্তি আসে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটা আরও চাপ তৈরি করে।

শৈশবের অভিজ্ঞতা, অতিরিক্ত দায়িত্ববোধ, নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা এসবও নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।

কারও কারও ক্ষেত্রে বিশ্বাসের সমস্যা থেকেও এটি আসে।

নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে কী হয়?

নিয়ন্ত্রণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলে শুরুতে অস্বস্তি লাগতেই পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এটি নিরাপত্তার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়।

মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডা. ক্রিস মোসুনিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “এর ফলে মানসিক চাপ কমে, সম্পর্কগুলো সহজ হয়, আর নিজের ভেতরেও এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়। কারণ তখন নিরাপত্তা আসে নিজের ভেতর থেকে, বাইরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে নয়।”

পরিবর্তনের শুরু: সচেতনতা

পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হল- নিজের আচরণ চিনতে পারা। কখন যথা হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, কখন অন্যের কাজ নিজের হাতে নেওয়া হচ্ছে এসব মুহূর্ত খেয়াল করা জরুরি।

যখনই নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছে হয়, নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে এটি কি সত্যিই প্রয়োজন, নাকি শুধু অস্বস্তি থেকে আসছে?

তাড়াহুড়ো নয়, বিরতি

নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা সাধারণত খুব তাড়াহুড়ো তৈরি করে। মনে হয় এখনই কিছু করতে হবে। এই মুহূর্তে একটু থেমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কয়েক মিনিট সময় নিয়ে ধীরে শ্বাস নেওয়া, নিজের শরীরের অনুভূতি লক্ষ্য করা এসব ছোট অভ্যাস তাড়না কমাতে সাহায্য করে। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু না করলেও পরিস্থিতি ঠিক থাকে।

অস্বস্তি আর বিপদের পার্থক্য

অনেক সময় অস্বস্তিকে বিপদ মনে হয়। তবে সব অস্বস্তি বিপজ্জনক নয়। কারও কাজ নিজের মতো না হওয়া মানেই সেটা ভুল নয়।

নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে এখানে কি সত্যিই কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা আছে, নাকি শুধু অভ্যাসের বাইরে? এই পার্থক্য বোঝা গেলে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কমে যায়।

ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু

একসঙ্গে সবকিছু বদলানো কঠিন। তাই ছোট জায়গা থেকে শুরু করা ভালো।

যেমন- কারও কাজ তার মতো করতে দেওয়া, পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন মেনে নেওয়া।

এই ছোট অভিজ্ঞতাগুলো ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে শেখায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ না করলেও ঠিক থাকে।

সীমা নির্ধারণের গুরুত্ব

নিয়ন্ত্রণ আর সীমা নির্ধারণ এক জিনিস নয়। নিয়ন্ত্রণ মানে অন্যকে নিজের মতো চালানো, আর সীমা মানে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা।

যেখানে প্রয়োজন, নিজের সীমা পরিষ্কারভাবে জানানো যেতে পারে। এতে সম্পর্কের মধ্যে সম্মান বজায় থাকে এবং অযথা চাপ তৈরি হয় না।

নিখুঁত হওয়ার চাহিদা কমানো

নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দেয়। মনে হয় একটু ভুল হলেই সব নষ্ট হয়ে যাবে।

ইচ্ছাকৃতভাবে ‘যথেষ্ট ভালো’ মানসিকতা গ্রহণ করলে চাপ কমে। এতে কাজও সহজ হয়, মনও হালকা থাকে।

যোগাযোগে স্বচ্ছতা

অনেক সময় না বলেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়।

এতে সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে। সরাসরি ও শান্তভাবে কথা বলা সম্পর্ককে সহজ করে।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা, অন্যের কথা শোনা— এই দুটোই বিশ্বাস তৈরি করে। তখন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কমে যায়।

শরীর ও মনের যত্ন

নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি চাপের ফল। তাই নিয়মিত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ঘুম, হালকা ব্যায়াম এসব অভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। যখন শরীর ও মন শান্ত থাকে, তখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার তাড়নাও কমে যায়।

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি

মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ড. জুলি স্মিথ ওপরের পরামর্শগুলো দিয়ে ‘কাম ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলেন, এই ধরনের আচরণ পরিবর্তন করতে হলে নিজেকে দোষারোপ না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস বদলাতে হবে।”

তার মতে, সচেতনতা, ছোট ছোট সিদ্ধান্ত এবং নিজের অনুভূতিকে গ্রহণ করার ক্ষমতাই পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন

রাগ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর কৌশল

আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়াতে

সম্পর্কে সীমা লঙ্ঘন বলতে যা বোঝায়

যে কারণে সম্পর্কে প্রতিশ্রুতির ভীতি কাজ করে