Published : 09 Aug 2026, 03:50 PM
বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের নিরিখে আমরা সাধারণত মসলিন, জামদানি কিংবা টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে গর্ববোধ করে থাকি। তবে প্রায়শই আমাদের মনে থাকে না যে, বাঙালি ছাড়াও এই দেশে বসবাসরত অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় তাঁতশিল্প বিদ্যমান।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, নান্দনিক বোধ ও শিল্পচেতনার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে তাদের নিজস্ব তাঁতশিল্প।
তাদের বৈচিত্র্যময় তাঁতশিল্পের কৃৎকৌশল, নকশা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়েই এই আয়োজন।
বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রায় ত্রিশটির মতো আদিবাসী জাতিসত্তা বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করে। তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই আছে নিজস্ব ও সমৃদ্ধ বয়ন ঐতিহ্য। তবে দু’য়েকটি বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া (যেমন, মান্দি বা গারো) অধিকাংশ আদিবাসী গোষ্ঠী ঐতিহ্যগত ভাবে কোমর তাঁত ব্যবহার করে থাকেন।
ইদানিং অবশ্য কোথাও কোথাও গর্ত তাঁত/ ফ্রেম তাঁত ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে তা অতিসাম্প্রতিক কালের ঘটনা।
বাংলাদেশে আদিবাসীদের বড় কেন্দ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। এছাড়াও সিলেট, কক্সবাজার, পটুয়াখালি, বরগুনাসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
কাপড় বোনায় নারীরাই প্রধান
আদিবাসী তাঁতি বলতে আমাদের মূলত নারীদেরকেই বুঝতে হবে। কেননা একমাত্র মনিপুরী ছাড়া অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীতে নারীরাই একচ্ছত্র ভাবে তাঁতের কাজ করে থাকেন। (তবে কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী নিজেদের বস্ত্র নিজেরা উৎপাদন করে না। যেমন সাঁওতাল বা ওঁরাও।)
মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় চাকমা, বম, ম্রো, খুমি, পাংখোয়া, চাক ইত্যাদি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভেতর; কক্সবাজার ও বরগুনায় রাখাইন জনগোষ্ঠীতে, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় মান্দি, মনিপুরী, হাজং ইত্যাদি জাতিসত্তার ভেতর এবং উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় বিভিন্ন ‘কোচ বংশদ্ভুত’ আদিবাসী নারীদের ভেতর (যারা পলিয়া, দেশী ইত্যাদি নামে পরিচিত) একটি বিপুল অংশ দীর্ঘকাল ধরে তাঁতের কাজের সঙ্গে যুক্ত।
বিভিন্ন আদিবাসী নারীদের ভেতর, শুধু মাত্র মান্দি ছাড়া, সবাই মূলত ঐতিহ্যবাহি কোমর তাঁতই ব্যবহার করে আসছে বংশ পরম্পরায়, শত শত বছর ধরে।
মান্দিরা ব্যবহার করে, তাদের ঐতিহ্যানুসারে, মাটিতে সমান্তরাল তাঁত।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর ভেতর নারীদের তাঁতের কাজ শেখাটা অত্যবশকীয় গুণ হিসেবে বিবেচিত হত। সব নারীকেই কমবেশি তাঁতের কাজে পারদর্শী হতে হত এবং এটা তারা খুব ছোটবেলা থেকে পারিবারিক পরিবেশের ভেতর স্বতস্ফুর্তভাবে শিক্ষা লাভ করত।
সাধারণত পরিবারের বয়োজোষ্ঠ্য নারীরা নবীনদের এই কাজের শিক্ষা দিয়ে থাকে। উল্লেখ করা যেতে পারে, আদিবাসী সমাজে যে মেয়ে তাঁতের কাজ জানেনা পূর্বে তার বিয়ে দেওয়া কষ্ট হত। তবে এখন আর এতটা কড়াকড়ি নেই।
অধিকাংশ আদিবাসী নারী শৈশবেই কোমর তাঁতে কাপড় বোনা শিখে নিত এবং বছরে অন্তত একবার নিজের জন্য বা পরিবারের কারও জন্য বস্ত্র বয়ন করার রীতি প্রচলিত ছিল।
ইদানিং আদিবাসী নারীদের ভেতর আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটায় (এবং অন্যান্য কারণে) অনেকে শৈশবে কোমর তাঁতে কাপড় বোনা শিখলেও, চর্চাটা আর ধরে রাখছে না।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একমাত্র মনিপুরীদের ভেতর কিছু পুরুষ তাঁতের কাজের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া আর কোথাও আদিবাসী সমাজে পুরুষদের তাঁতের কাজ করতে দেখা যায় না।
কেন পুরুষরা তাঁতের কাজ করে না, সেটা তা নিয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার প্রচলিত আছে আদিবাসী সমাজে। যেমন, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীতে প্রচার আছে কোনো পুরুষ যদি কখনও তাঁতের কাজে অংশ নেয় তাহলে সে বজ্রপাতে মারা যাবে।
আবার, তঞ্চগ্যা বা তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের বিশ্বাস এরকম যে, যদি কোনো পুরুষ তাঁতের কাজ করে তাহলে সে যখন বনের মধ্যে যাবে তখন বন্যশুকর তাকে আক্রমণ করবে।
প্রকৃতপক্ষে এটাকে মেয়েদের কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুরুষরা বিভিন্নভাবে সাহায্য করলেও কখনও সরাসরি তাঁতের কাজে অংশ নেয়না।
সাধারণত জুমচাষের মাধ্যমে তুলা উৎপাদন করে সেই তুলা থেকে চরকার সাহায্যে সুতা কাটা হয়। তারপর সেগুলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক রংয়ে রাঙানো হয়। এই ছিল ঐতিহ্যবাহি ধারা।
ইদানিং অবশ্য বাজারের রং করা সুতা কিনতে পাওয়া যায়। তাছাড়া সুতির বদলে রেয়নের ব্যবহারও ব্যাপক হারে বেড়েছে। তুলা থেকে যে সুতা কাটা হত, তা ভাতের মারের সাহায্যে পারি করা হয়। (পারি হল, কাপড় বোনার আগে সুতা প্রস্তুত বা সাজানোর একটি প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রেয়নের জন্য অবশ্য পারি করার দরকার পড়ে না।)
তারপর সেটা টানা সুতা হিসেবে তৈরি করা হয়। সাধারণত ঘরের মধ্যে, বারান্দায় বা যে কোনো জায়গায় কোমর তাঁতে কাজ করা যায়।
পার্বত্য এলাকায় যেসব আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে তাদের সবার কাজের ধরন বলতে গেলে একই। যদিও তাদের নিজেদের ভাষায় প্রত্যেকটি তাঁতযন্ত্র (মানে কোমর তাঁত) ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন স্বকীয় ডিজাইনের নিজস্ব নাম রয়েছে।
তবে বয়ন পদ্ধতি ও কৃৎ কৌশলের দিক থেুকে বিশেষ কোন ফারাক নাই। সাধারণত দুইটি কাপড় একসঙ্গে বোনা হয় কোমর তাঁতে। উত্তরবঙ্গের নারীরা পাট থেকে সুতা তৈরি করে তা দিয়ে কোমর তাঁতের সাহায্যে ধোকরা বা চট বা চটি বোনে প্রায় একই পদ্ধতিতে।
নকশাতে নিসর্গের অনুপ্রেরণা
আদিবাসীরা তাঁতে যেসব নকশা ব্যবহার করা হয় তার অধিকাংশ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কিংবদন্তির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
মোটিফ হিসেবে সাধারণত বেছে নেওয়া হয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়বস্তু। যেমন-বিভিন্ন ফুল, ফল, পশু-পাখি, মাছ, প্রজাপতি ইত্যাদি। উল্লেখ্য, প্রতিটি জাতিসত্তারই আছে নিজস্ব মোটিফ ও নকশা যা দেখে প্রত্যেকটি আদিবাসী জাতিসত্তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়।
বিবিধ সংকটের পরও আদিবাসী তাঁত শিল্প এখনও নিজস্ব অস্তিত্ব বজায়ে রেখেছে। আর রংয়ের বৈচিত্র্য ও ডিজাইন বা নকশার মাধুর্যে যে কাউকে চমৎকৃত করার শক্তির অধিকারী।
তাঁতশিল্পের নিরিখে মনিপুরীদের কথা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মনিপুরীরা এখন প্রধানত বাস করে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে। তাদের তাঁতের ইতিহাস অন্তত দুই হাজার বছরের পুরানো বলে মনে করা হয়। মনিপুরীদের পাহাড়ি তুলা থেকে সুতি সুতা ও গুটিপোকার চাষ থেকে রেশমি সুতা তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। তারা প্রধানত কোমর তাঁতে বস্ত্র উৎপাদন করলেও বর্তমানে ফ্রেম তাঁতও ব্যবহৃত হচ্ছে।
কোমর তাঁতের তাঁতি হচ্ছে মেয়েরা। প্রতিটি মণিপুরী মেয়ে প্রতিদিনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডেরর ভেতর তাঁতের প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে পারিবারিকভাবে। বাংলাদেশের মনিপুরীরা মূলত ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ ও ‘মৈতৈ’ এই দু’টি গোত্রে বিভক্ত। এরা সনাতন ধর্মালম্বী।
এছাড়া মনিপুরীদের মধ্যে যারা ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছে তাদের বলা হয় পাঙ্গাণ। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ- উভয়েরই রয়েছে নিজস্ব ডিজাইন ও মোটিফের শক্তিশালী তাঁত ঐতিহ্য।
কোমর তাঁতে মনিপুরীরা মেয়েরা শাল, বিছানার চাদর, গায়ে দেওয়ার চাদর ইত্যাদি তৈরি করে থাকে।
মনিপুরীদের ভেতরে আগে বেশ কিছু নকশা প্রচলিত ছিল যেগুলো এখন আর দেখা যায় না। এগুলো হল: কানাপ, খানমেন, চাটপা, সাথোকপা চি ইত্যাদি। তবে বর্তমানে প্রচলিত মনিপুরী নকশার মধ্যে কিছু পুরানো নকশা দেখা যায়, যেমন- ‘মোইরাং’। এই ডিজাইনটি পাড়ের ঠিক ওপরে করা হয়। দেখতে মন্দিরের চূড়ার মতো। এটাকে মনিপুরী তাঁতবস্ত্রের প্রতীক বলা যেতে পারে।
জানা যায়, ‘মোইরাং’ মনিপুরীদের একটি প্রাচীন গোত্রের নাম। এবং ভারতের মনিপুর অঞ্চলে এই গোত্রটি সংখ্যাগুরু।
ঠিক কী কারণে ‘মোইরাং’ মনিপুরী তাঁতবস্ত্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় তা অবশ্য জানা যায়নি প্রবীণ লোকদের সঙ্গে কথা বলেও। এটুকু জানা গেছে, বস্ত্রে ‘মোইরাং’ দেখলে বোঝা যায় এটি মনিপুরী বস্ত্র।
তবে তাদের দাবী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বস্ত্রের ডিজাইনে এই ‘মোইরাং’ ব্যবহার করা হচ্ছে।
মনিপুরী তাঁত বস্ত্রের ডিজাইন বেশ সরল কিন্তু নান্দনিক। মনিপুরী নারীরা উৎসবে ব্যবহার করে চাকছাবি/ লেইফানেক, ইনাফি। চাকছাবি/ লেইফানেক মূলত থামির মতো। এর জমিনে উজ্জ্বল রং ব্যবহার করা হয়। লাল, গোলাপি রংয়ের আধিক্য থাকে। এতে স্ট্রাইপ ডিজাইন করা থাকে।
চাকছাবির পাড়ে বেশ ভারি হাতের করা নকশা থাকে। মূল নকশাটির নাম ‘গিল্লা’। এটি ডিম্বাকার। এর ভেতরে লতাধর্মী নকশা থাকে। গিল্লার ওপরে এবং নিচে পাড়ের প্রান্তে থাকে ‘কানি’। এটি সাধারণত বরফি ধরনের হয়ে থাকে। গিল্লার পাশে থাকে ‘তংকাপ’। এটি জ্যামিতিক অর্ধত্রিভূজাকার। পুরো পাড় জুড়ে গিল্লা, কানি ও তংকাপের ধারাবাহিকতা থাকে।
ইনাফি হচ্ছে নারীদের ব্যবহৃত উর্ধ্ববাস। এটি মূলত সুতির সুতায় তৈরি ওড়না বিশেষ। তবে বর্তমানে রেশমি সুতায়ও তৈরি হয় এটি। জামদানি সদৃশ্য নকশা করা হয় এতে। ফুল, লতাপাতা ইত্যাদি থাকে এর নকশায়।
চাকছাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রংয়ের ব্যবহার করা হয় এতে। নারীদের সাধারণ ব্যবহার্য বস্ত্র হচ্ছে ফানেক/ লাহিং। এটি চাকছাবির মতোই। তবে সাধারণ মানের। খুব বেশি নকশা বা উজ্জ্বল রং এতে ব্যবহার করা হয় না। পাড়ের দিকে হালকা নকশা থাকে।
পুরুষদের প্রাত্যহিক ব্যবহার্য বস্ত্র পাঁচহাতি/ খুদেই মাতেয়েক। এটি ৪/৫ হাত দৈর্ঘ্যের বড় গামছার মতো। এটিকে ধুতির মতো করে ব্যবহার করা হয়।
মণিপুরীদের ব্যবহার্য ধুতি বাঙালিদের ব্যবহার্য ধুতির মতোই। তবে পাঁচহাতি/ খুদেই মাতেয়েকে গামছায় যেমন বিভিন্ন চেক ডিজাইন থাকে তেমন কিছু ডিজাইন করা থাকে।
নকশার নিরিখে, মনিপুরী তাঁতবস্ত্রের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে এখনও ব্যাপকমাত্রায়। একারণে এখনও টিকে রয়েছে মনিপুরী তাঁত।
দ্বিতীয়ত, কিছু ব্যতিক্রমের পরও, এখনও বাইরের নকশা তেমন একটা গ্রহণ করেনি তারা। মূলত নিজস্ব নকশাতেই বস্ত্র বয়ন হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সবচেয়ে বৃহৎ আদিবাসী জাতিসত্তা হল, চাকমারা। চাকমা ভাষায় কোমর তাঁতকে ‘বেইন’ বলে। চাকমা তাঁতের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য হল ‘আলাম’। আলামকে এক ধরনের ডিজাইন ক্যাটালগ বলা যেতে পারে।
প্রতিটি নারী তার ব্যবহৃত প্রতিটি ডিজাইন এখানে তুলে রাখে। কিংবা বিষয়টিকে এভাবেও বলা যায়, প্রতিটি চাকমা নারী আলাম করতে করতে চাকমা ঐতিহ্যের ডিজাইনগুলো আয়ত্ব করে। এভাবে বংশ পরম্পরায় তাদের, তাঁতের ডিজাইন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হচ্ছে।
আলাম, চাকমা বয়নশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিধান বিশেষ। আগেকার দিনে আলামে ফুল তুলতে পারা প্রত্যেক মেয়ের জন্য অপরিহার্য গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো। এমনকি আলাম বুনতে না জানলে মেয়েদের বিয়ে দিতে অসুবিধা হত। আলামের ফুলগুলোর বিভিন্ন নামও আছে।
চাকমা নারীদের ব্যবহৃত পোশাক হচ্ছে ‘পিনন’ ও ‘খাদি’। পিনন অনেকটা লুঙ্গির মতো করে পরতে হয়। এগুলোর জমিন হয় কালো বা নীলের মধ্যে স্ট্রাইপ এবং লাল পাড় যুক্ত। পিননে একদিকে নকশা খোচিত চাবুকি বা আঁচলা থাকে।
চাবুকির নকশার বিভিন্ন নাম হয়। যেমন- যেইদ চাবুকি, বিজন ফুল চোখ চাবুগি, ধান ছড়া, মন-অ-চাবুকি ইত্যাদি। আর খাদি পরতে হয় ওপরের অংশে ওড়নার মতো করে। চাকমা নারী-পুরুষ উভয়ই ব্যবহার করে ‘খাবাং’, এটা মাথায় পরতে হয়।
চাকমারা বস্ত্রবয়নে বিভিন্ন নকশা ব্যবহৃত করে, সেগুলোর কয়েকটির নাম: ছোদোরেজম (ছোট চাদর বা ওড়নার জমিনে এবং পাড়ে বোনা ছোট ছোট ফুল ও বিন্দুর সমন্বয়ে তৈরি একপ্রকার চেইন বা লুপ মোটিফ), এলবিজা (আদা গাছের পাতা এবং তার নিচের কন্দের যে সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক গঠন থেকে অনুপ্রাণিত নকশা), সুবগিজ (নদী বা ছড়ার পানির স্রোতের ঢেউ-এর নকশা), রাঙ্গা (অর্থ হলো লাল রঙ বা রঙিন। কাপড়ের জমিনে লাল রঙের সুতো দিয়ে প্রধান জ্যামিতিক অলংকরণ বা ভরাট কাজ), তিন বাইয়া (তিনটি সমান্তরাল সুতোর লাইনে তৈরি সরল নকশা), সাত বাইয়া (সাতটি লাইনের সমন্বয়ে তৈরি মাঝারি ধরনের নকশা), এগারো বাইয়া ও তের বাইয়া (জটিল, ঘন এবং বড় আকারের জ্যামিতিক নকশা), বেগুণবীচি (কাপড়ের মূল জমিনে ছোট ছোট ডট বা বিন্দুর মতো যে নকশা ছিটানো থাকে), করঙ্গ (কাঁকড়ার শরীর এবং তার বাঁকানো পায়ের যে জ্যামিতিক অবয়ব, তা কোমর-তাঁতের সুতোয় হুবহু ফুটিয়ে তোলা হয়) ইত্যাদি।
চাকমা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গা, খিয়াং, পাংখোয়া, লুসাই, বম ইত্যাদি জনগোষ্ঠী বাস করে, যাদের রয়েছে নিজস্ব ধরনের পোশাক। প্রতিটি পোশাকের আছে নিজস্ব নাম এবং তাতে ব্যবহৃত ডিজাইন বা নকশার ভিন্নতা ও নিজস্বতাও উল্লেখযোগ্য।
যেমন, ত্রিপুরা মহিলারা নিচের অংশে লুঙ্গির মতো করে পরে ‘রিনাই’ এবং ওপরের অংশে ‘রিসা’। পাশাপাশি খিয়াংরা নিচের অংশে যেটা পড়ে তার নাম ‘খারাং’। এই সব পোশাকে যেসব নকশা/ মোটিফ ব্যবহৃত হয় তার আবার আলাদা আলাদা নামও আছে।
ম্রোদের ব্যবহৃত নকশা নাম: পোপাই (কাপড়ে জ্যামিতিক নকশার মাধ্যমে ডানা ছড়ানো বা উড়ন্ত প্রজাপতির অবয়ব), পেসিং (কাঁকড়ার শরীর এবং আড়াআড়ি ছড়ানো পায়ের যে জ্যামিতিক অবয়ব), পুরুই (পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা ছড়া বা ঝরনার পানির যে বহমান রূপ) ইত্যাদি।
খিয়াংদের নকশাগুলোর নাম আবার আলাদা। যেমন, খ্রারাংওয়াং চিউক (লতানো ফুলের নকশা), ডঅংচিনন (বনের মধ্য দিয়ে হরিণ দল বেঁধে হেঁটে যাওয়ার সময় মাটিতে জ্যামিতিক আকৃতির যে পায়ের ছাপ বা ত্রিকোণাকার চিহ্নের আদলে নকশা), থাংলাইপাগ (নদীর স্রোত, পানির ঢেউ বা পাহাড়ের উথাল-পাথাল রূপ-কে নির্দেশ করে) ইত্যাদি।
রাখাইন সম্প্রদায়ের বাস মূলত কক্সবাজার এলাকায়। এছাড়াও পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইনদের দেখা মেলে।
রাখাইনদেরও বস্ত্রবয়নের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তাদের ভাষায় তাঁতকে বলা হয় ‘রাঁকেহ’। বর্তমানে রাখাইনদের ব্যবহৃত তাঁত হল, ঐতিহ্যবাহি রাখাইন তাঁত ও ফ্রেম লুমের সংমিশ্রণে এক বিশেষ ধরনের তাঁত।
বরগুনা-পটুয়াখালী অঞ্চলে এখনও এরকম কিছূ তাঁত দেখা যায়। তবে কক্সবাজারে তারা এখন সাধারণত ফ্রেম লুম বা চিত্তরঞ্জন তাঁত ব্যবহার করে।
কক্সবাজার বা বরগুণা-পটুয়াখালী অঞ্চলে রাখাইনরা মূলত টুরিস্ট বা পর্যটকদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে কাপড় বোনে। তবে তাদেরও আছে নিজস্ব পোশাক যা তারা ব্যবহার করে বিশেষ উৎসবের দিন।
রাখাইনদের নিজস্ব পোশাকের নাম ‘থাবিনছে’। তাদের ভাষায় সুতা হচ্ছে ‘খি’ এবং কাপড় ‘অঁনজশা’। এদের পুরানো কিছু ডিজাইন বা নকশার নাম হল- চিনতাবাং (পাহাড়ি ময়ূর বা পাখির পেখম এবং পালকের রাজকীয় সৌন্দর্য থেকে অনুপ্রাণিত নকশা), চিনল চই (মূলত লতানো বুনো ফুল বা জুঁই ফুলের মালার মতো দেখতে নকশাকে বোঝায়), খামাওবং (কাপড়ের বুননে তার জ্যামিতিক ত্রিকোণাকার বা চতুষ্কোণ আকৃতি ফুটিয়ে তোলা), সেরাবং (হরিণের ক্ষুর বা পায়ের ছাপের নকশা), ছাখেরা (কাপড়ের জমিনে জালের মতো আড়াআড়ি নকশা বোনা, যা মাছ ধরার জালের মতো দেখতে), লেপ্রাদাউ (উড়ন্ত প্রজাপতির ডানার বাহারি রং ও প্রতিসাম্য জ্যামিতিক লাইনের মাধ্যমে কাপড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়), সেই (এর অর্থ হীরা বা ডায়মন্ড। তাই কাপড়ের জমিনে ছোট ছোট ডায়মন্ড আকৃতির বা চতুষ্কোণ ঘর কাটা নকশাকে বোঝায়), খ্রাউতেংপে (নদীর ঢেউ বা ঢেউখেলানো পাহাড়ের সারি) ইত্যাদি।
সাংগ্রাই বা পানি উৎসব তাদের বড় উৎসব, যা অনুষ্ঠিত হয় বাংলা নববর্ষে বা বৈশাখ মাসের শুরুতে।
ঐতিহ্যগতভাবে মান্দি বা গারো মহিলা নিজেদের পোশাক ‘গান্না’ ও ‘দকবান্দা’ বা ‘দকশারি’- নিজেরাই বয়ন করে থাকেন।
মান্দি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে ‘গারো’ নামে পরিচিত। ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইল জেলায় মান্দিদের বাস। মান্দি ভাষায় তাঁতকে বলে ‘গান্না দক্কা’। এই তাঁত কোমর তাঁতের মতো নয়। আবার তা গর্ত তাঁতও নয়।
মান্দি রীতিতে মাটিতে সম্পূর্ণ টানা দিয়ে তাঁতের ওপর বসে মহিলারা বস্ত্র বয়ন করে থাকে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে আমরা দেখেছি যে, এই ধরনের তাঁত এখন বিলুপ্ত প্রায়। ইদানিং তাদের মধ্যে গর্ত তাঁতেরও প্রচলন হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে মান্দি নারীরা, পোশাক ‘গান্না’ ও ‘দকবান্দা’ বা ‘দকশারি’- নিজেরাই বয়ন করে থাকেন।
মান্দিদের বস্ত্র বেশ উন্নত মানের। তাদের নিজস্ব বিভিন্ন নকশার মধ্যে বেশি দেখা যায় ‘মিক্রন’ যার অর্থ চোখ। কাপড় বোনার সময় এই নকশা, এক ধরনের জ্যামিতিক ও ডায়মন্ড আকৃতিতে রূপ দেওয়া হয়।
আধুনিকতার পরশ ও ভবিষ্যত
একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহি আদিবাসী তাঁতশিল্প অনেকটাই বিপন্ন। তবে এর মধ্যেও বেশ কিছু আদিবাসী উদ্যোক্তা ও ডিজাইনার সমকালীন বাস্তবতায় কীভাবে আদিবাসী তাঁতশিল্পকে নতুন রূপে হাজির করা যায়, সেই চেষ্টা করছেন।
উদাহরণ হিসেবে তেনজিং চাকমার নাম করা যায়। এছাড়াও অনেক বাঙালি ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী নকশা ও বস্ত্র ব্যবহার করে নতুন ধরনের পোশাক পরিকল্পনা এবং বিবিধ পণ্য তৈরির মাধ্যমে মূলধারার সমকালীন জীবনধারার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও এই প্রচেষ্টার পরিসর এখনও বেশ সীমিত ।
বাঙালি ছাড়াও এই দেশে বসবাসরত অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে বৈচিত্র্যময় শিল্প। মডেল: অদিতি নিয়োগী। গয়না: ট্রাইবাল ক্র্যাফটস।
সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন- বিসিক, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ইত্যাদি) যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এদেশের আদিবাসী তাঁতশিল্পের নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
মসলিন, জামদানি নিশ্চয় আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য। পাশাপাশি, বৈচিত্র্যময় আদিবাসী তাঁতশিল্প সচল রাখা ও যথাযথভাবে সংরক্ষণ নিশ্চিত করা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আমার ধারণা, এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি এবং বিষয়টি নিয়ে আরও ভাবনার অবকাশ আছে।
লেখক পরিচিতি: চিত্রশিল্পী, লেখক, গবেষক, কিউরেটর, উদ্যোক্তা এবং ‘যথাশিল্প’-এর পরিচালক। বাংলাদেশের লোকশিল্প, রিকশাচিত্র এবং ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র ও তাঁতশিল্প বিষয়ক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য পরিচিত। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা: বাংলাদেশের লোকশিল্পের রূপরেখা (২০১৩), ঢাকাই জামদানি (২০১১), বাংলাদেশের সিনেমা-ব্যানার পেইন্টিং: বিলুপ্তপ্রায় শিল্পশৈলী (২০১৭), ধামরাই জনপদের কাঁসা-পিতল শিল্প (২০০৭), বাংলাদেশের আধুনিক চারুশিল্পের প্রবণতা (২০০৪)।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ট্রাইবাল ক্র্যাফটস ও কুঁড়ি চিসিম।
প্রচ্ছদ ছবির মডেল: অদিতি নিয়োগী।
আরও পড়ুন