Published : 29 Mar 2026, 09:11 PM
আটলান্টিক মহাসাগরের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ইউরোপের প্রাচীনতম শহর লিসবন। পাহাড়ের ঢালে সাজানো এই শহরটি বছরজুড়েই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে। তবে বসন্তের আগমনে লিসবন যেন এক মায়াবী রূপকথার নগরীতে পরিণত হয়।
শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে ফেলে প্রকৃতি যখন নতুন করে সাজে, তখন লিসবনের অলিগলি ভরে ওঠে এক উজ্জ্বল আভা আর স্নিগ্ধতায়। বিশেষ করে এই সময়ে শহরের বুক চিরে ছুটে চলা ঐতিহ্যবাহী হলুদ ট্রামগুলোর মাথায় যখন গোলাপি ফুলের ছায়া পড়ে, তখন মনে হয় কোনো দক্ষ শিল্পী ক্যানভাসে জলরঙে এক জীবন্ত ছবি এঁকেছেন।
লিসবনের বসন্ত মানেই ‘জুডাস ট্রি’-এর রাজত্ব। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম ‘সার্সিস সিলিকুয়াস্ট্রাম’। তবে এটি বিশ্বজুড়ে ‘ইউরোপিয়ান রেডবাড’ নামেই বেশি পরিচিত। লিসবনের রাস্তা, পার্ক, ছোট ছোট চত্বর কিংবা পাহাড়ের খাঁজে থাকা প্রাচীন ভবনগুলোর সামনে এখন এই ফুলের মেলা।
এই গাছের বিশেষত্ব হলো, এর পাতা গজানোর আগেই ডালজুড়ে ফুটে ওঠে থোকা থোকা উজ্জ্বল গোলাপি বা বেগুনি রঙের ফুল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো গাছটি যেন গোলাপি কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর লিসবনে এই ফুলের প্রাচুর্য অনেক বেশি। শহরের ‘অ্যাভেনিদা দা লিবারদাদে’ থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক ‘আলফামা’ জেলা- সবখানেই এখন বসন্তের জয়গান। এই ফুলের স্নিগ্ধতা আর ট্রামের যান্ত্রিক শব্দের এক অদ্ভুত মিতালি তৈরি হয়েছে এখানে।
লিসবনের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এর পুরোনো দিনের ‘হলুদ ট্রাম’। বিশেষ করে বিখ্যাত ‘টুয়েন্টি এইট’ (২৮ নম্বর) ট্রামটি যখন উঁচু-নিচু সরু রাস্তা দিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে এগিয়ে চলে, আর তার ওপর যখন জুডাস ট্রি-এর গোলাপি পাঁপড়ি ঝরে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্য।
লিসবন ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। পর্যটকেরা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন একটি ভালো ফ্রেমের আশায়, যেখানে হলুদ ট্রামের সঙ্গে গোলাপি ফুলের এক নিখুঁত মেলবন্ধন পাওয়া যাবে।
জুডাস ট্রি, এই ফুলের নামের পেছনে লুকিয়ে আছে শত বছরের পুরনো লোককথা। ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও খ্রিস্টীয় বিশ্বাস মতে, বাইবেলের চরিত্র জুডাস ইস্কারিওট এই গাছেই ফাঁস দিয়েছিলেন। কথিত আছে, সেই শোকে সাদা ফুলগুলো লজ্জায় ও দুঃখে গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছিল।
যদিও এটি কেবলই একটি কিংবদন্তি, কিন্তু এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব লিসবন তথা পর্তুগিজদের কাছে অপরিসীম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গাছটি ইউরোপের ভূখণ্ডে বসন্তের আগাম বার্তা দিয়ে আসছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের আদি এই উদ্ভিদটি লিসবনের জলবায়ুর সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।
জুডাস ট্রি কেবল চোখের আরাম দেয় না, বরং এই অঞ্চলের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বসন্তের শুরুতে যখন প্রকৃতিতে অন্য ফুলের অভাব থাকে, তখন এই ‘রেডবাড’ মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পতঙ্গদের জন্য খাদ্যের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়। এর ফুলের মিষ্টি সুধা আহরণে ভিড় জমায় অসংখ্য মৌমাছি, যা প্রাকৃতিক পরাগায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। লিসবন পৌরসভা গত কয়েক দশকে পরিকল্পিতভাবে এই গাছগুলো রোপণ করেছে, যা আজ শহরটিকে এক ‘গ্রিন সিটি’ বা সবুজ নগরীর মর্যাদা দিচ্ছে।
বর্তমান যুগে লিসবনের এই বসন্তের দৃশ্য আর কেবল স্থানীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ‘ইনস্টাগ্রাম’ কিংবা ‘টিকটক’-এর কল্যাণে লিসবন এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘স্প্রিং ব্লসম ডেস্টিনেশন’। বিশেষ করে ভোরের নরম আলো কিংবা গোধূলির ম্লান বিকেলে যখন গোলাপি ফুলের ওপর সূর্যের আভা পড়ে, তখন পুরো শহরটি এক সোনালি-গোলাপি আভায় ভরে ওঠে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্রাভেল ব্লগার ও ফটোগ্রাফারদের ভিড় এখন লিসবনের পথে পথে। অনেকেই জাপানের ‘চেরি ব্লসম’-এর সঙ্গে লিসবনের এই বসন্তের তুলনা করছেন। যদিও চেরি ব্লসম আর জুডাস ট্রি সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির, তবুও লিসবনের এই রূপ কোনো অংশেই কম নয়। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বসন্তের এই দুই মাস পর্তুগালে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, যা দেশের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে।
লিসবনের বাসিন্দাদের কাছে বসন্ত মানেই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি কাটিয়ে একটু বুক ভরে শ্বাস নেওয়া। বিকেলের দিকে দেখা যায়, বয়স্ক পর্তুগিজরা পার্কের বেঞ্চে বসে জুডাস ট্রি-এর নিচে আড্ডা দিচ্ছেন। কফি শপগুলোর বাইরের টেবিলে বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তরুণ-তরুণীরা মেতে উঠছে বসন্তের গল্পে। ছোট ছোট শিশুরা রাস্তায় ঝরে পড়া গোলাপি পাঁপড়ি কুড়িয়ে আনন্দ পাচ্ছে। নাগরিক ব্যস্ততার মাঝেও প্রকৃতি যেন এখানে পরম মমতায় মানুষকে আগলে রেখেছে।
লিসবনের বসন্ত ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এর রেশ থাকে দীর্ঘকাল। জুডাস ট্রি-এর এই গোলাপি মায়া খুব বেশি হলে এক থেকে দেড় মাস স্থায়ী হয়। এরপর ফুল ঝরে গিয়ে গাছে সবুজ পাতা গজাতে শুরু করে। কিন্তু এই অল্প সময়ের জন্যই লিসবন হয়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এক গন্তব্য।