Published : 05 Apr 2026, 09:47 PM
গণভোটের রায় মেনে না নিলে বিএনপি সরকারকে ‘অবৈধ সরকার’ আখ্যা দেওয়া হবে হুঁশিয়ার করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
তিনি বলছেন, বিএনপি শুধুমাত্র সেই অধ্যাদেশগুলোকেই আইনে পরিণত করতে চায়, যেগুলোতে তাদের সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ‘বাড়বে’। আর যেসব অধ্যাদেশে ‘জবাবদিহিতার’ কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে তারা বাতিল করতে চায়।
রোববার দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির অবস্থান তুলে ধরেন মুখপাত্র।
বিএনপির কার্যক্রমে ‘স্বৈরাচারের সব লক্ষণ’ দেখতে পাচ্ছেন মন্তব্য করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ১০ এপ্রিলের মধ্যে বিএনপি ‘হুঁশ না ফিরলে’ তারা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন এবং এই সংকটময় মুহূর্তে রাজপথে নামলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জন্য তা ভালো হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কিছু অধ্যাদেশ বিল আকারে এগোলেও কিছু অধ্যাদেশ এখনই না এনে আরও পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছে।
এর সমালোচনা করে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, “অথচ আমরা বারবার তাদের সংবিধানের কথা বলতে শুনি। সারাক্ষণ সংবিধান সংবিধান শুনতে শুনতে মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষ এখন বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতেও সংবিধানকে টেনে আনছে।
“এরপর আমরা দেখলাম যে প্রশাসক নিয়োগ করে তারা সংবিধানের লঙ্ঘন করলেন। সংবিধানে বলা আছে যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যে কোনো সময় অপসারণের ক্ষমতা সরকারের নির্বাহী বিভাগের কাছে রেখে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বিরোধীদলের যে কেউ যদি নির্বাচিত হন, তাকে যেন যে কোনো সময় অপসারণ করা যায়।
“অথবা অপসারণের ভয় দেখিয়ে তাকে সরকারের অনুগত করা যায়। এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত হুমকি ও এটা সুস্পষ্ট সংবিধানের লঙ্ঘন।”
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসানোর ফলে ‘স্বৈরাচারের জন্ম হয়’ মন্তব্য করে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, “বিগত সরকারের সময় আমরা ফ্যাসিবাদ দেখেছি, এখন স্বৈরাচারের সব লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। এই যে প্রশাসক বসানো এগুলো স্বৈরাচারের খুব পরিচিত প্রক্রিয়া, এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের জন্ম হয়।”
বিএনপি সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করায় আসিফ মাহমুদ জিয়াউর রহমানের সময়কার গণভোটের প্রসঙ্গ টানেন।
তিনি বলেন, “বিভিন্ন আলোচনায় জিয়াউর রহমানের সময়কার গণভোটের সঙ্গে এবারের গণভোটকে তুলনা করা হয়। কিন্তু সেই গণভোটের সঙ্গে এটার পার্থক্য রয়েছে।
“জিয়াউর রহমানের সময় মূলত গণভোটের মাধ্যমে লেজিটিমিসি নিয়ে বিভিন্ন প্রসেসের মাধ্যমে এজেন্সিকে ব্যবহার করে একটা কিংস পার্টি তৈরির জন্যই মূলত ওই প্রক্রিয়াটা করা হয়েছিল। আর এবারের গণভোটটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যে।”
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সংস্কারের পক্ষে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করেছে। এই ভোটের রায় যদি আপনারা না মানেন, তাহলে আমরা সেদিন থেকেই এই সরকারকে ‘অবৈধ সরকার’ বলা শুরু করব এবং আমরা এটার জন্য সময় নেব না।
“আপনারা যেমন আমাদের সকল অর্জন ধুলিসাৎ করতে সময় নিচ্ছেন না, আমরাও তেমন সময় নেব না।”
এনসিপি মুখপাত্র বলেন, “আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি আমরা আপনাদের সহায়তা করতে চাই একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য। এখন একটা ক্রাইসিস চলমান আছে। এটা মোকাবেলার জন্য সকল স্টেকহোল্ডাররা একসাথে মিলে কাজ করতে চাই।
“বিরোধী জোটের কোনো চিন্তাই ছিল না এতো দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজপথে নামার। আমরা চিন্তা করছিলাম স্থানীয় নির্বাচনের দিকে ফোকাস করব।
“যে পরিস্থিতিতে আপনারা আমাদের ফেলেছেন, আমাদের এমপিরা কথা বলতে পারছেন না। গণভোট নিয়ে কথা বলার জন্য একটা দীর্ঘ নাটকীয়তার মধ্যে দিয়ে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না। এবং কথা বললেও সেটাকে তোয়াক্কা নেওয়া হচ্ছে।”
আসিফ মাহমুদ বলছেন, এ পরিস্থিতিতে রাজপথে নামা ছাড়া তাদের আর ‘উপায় নেই’।
“সামনের দিনে আমাদের বড় পরিসরে আন্দোলনে নামতে হতে পারে। এবং সেটা কারো জন্যই ভালো হবে না। ওভারঅল বাংলাদেশের জন্যও একটা ক্ষতির কারণ হবে। তাই আমরা আপনাদের আহ্বান জানাতে চাই আপনারা হুঁশে ফিরে আসুন। অন্যথায় আমাদের জনগণের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই।”
এনসিপির দাবির বিষয়ে আসিফ বলেন, “আমাদের দাবি হচ্ছে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশসহ যে অধ্যাদেশগুলো সেই সময়ের প্রয়োজনে করা হয়েছিল, সেগুলোকে বাতিল করতে হবে এবং বাকিগুলো আইনে পরিণত করতে হবে। আমরা আপনাদের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ দেখতে চাই।”

আসিফের ক্ষোভ, তুষারের মুচকি হাসি
বিএনপি সরকার কীভাবে ‘জনগুরুত্বপূর্ণ’ অধ্যাদেশগুলো বাতিল করছে, তা বলতে গিয়ে বেশ ক্ষোভের সঙ্গে কথা বলছিলেন আসিফ।
তিনি বলছিলেন, “তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ নিয়ে কথা হচ্ছিল। পৃথিবীতে গত এক-দুই যুগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে জনগণের মত প্রকাশের অধিকার। অতীতে আমরা দেখেছি কীভাবে নাগরিকদের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
“এমন অবস্থা হয়েছে যে কেউ পরিবারের সঙ্গে কথা বলবে, গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে কথা বলবে এটারও কোনো প্রাইভেসি নাই।”
এসময় আসিফ মাহমুদের পাশে বসা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারকে মুচকি হাসতে দেখা যায়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমাদের প্রায় ১৮-১৯টা এজেন্সির কাছে এই ক্ষমতাটা দেওয়া ছিল যে তারা যে কোনো সময় যে কোনো ব্যাক্তির হোয়াটসঅ্যাাপ মেসেজ দেখতে পারে এবং কল শুনতে পারে। এবং তাদের কোনো জবাবদিহিতার বিষয়ই ছিল না।
“অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুধুমাত্র চারটা এজেন্সিকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়। আর বলা হয়েছিল যে কোনো ব্যাক্তির ওপর আড়ি পাততে হলে সেটা আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে হতে হবে। কিন্তু এখন আবার সেটা ১৮-১৯টা এজেন্সির কাছে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার আহ্বান জানান আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ আমলে তাদের সিভিল সোসাইটির যে রোলটা ছিল, সেখানে ফিরে আসা উচিৎ।”
গণতন্ত্রের ‘অন্ধকার সময়’: তুষার
আসিফ মাহমুদের আগে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার কথা বলেন। তিনি বলেন, “বিএনপি বলেছিল কখনো তারা প্রশাসক বসাবে না। তারা এর মধ্যেই ৫৯ জন প্রশাসক বসিয়েছে। তারা কারা? হয় তারা বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত, না হয় নির্বাচনে পরাজিত।
“আসিফ মাহমুদরা যখন সরকারে ছিল তখন তারা পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু অধ্যাদেশ করেছিল। এখন বিএনপি সেগুলো আইনে পরিণত করতে চায়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যাতে কলমের এক খোঁচায় নির্বাহী আদেশে বাতিল করার ক্ষমতা নিজেদের কাছে নিতে চায়। অর্থাৎ তারা দেশকে পাকিস্তান আমলের আইয়ুব খানের সময়কার ‘বেসিক ডেমোক্রেসির’ জামানায় ফিরিয়ে নিতে চায়।”
সরকার যেভাবে প্রশাসক বসানো ও নির্বাহী জনপ্রতিনিধিদের বাতিল করার ক্ষমতা হাতে রাখতে চাইছে, তা বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেন সারোয়ার তুষার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানেও ভিসি নিয়োগে ‘দলীয়করণ’ হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “তারা বলেছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ করবে না। অথচ তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বানিয়েছে বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদককে। আমাদের সাইলেন্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিন্তু বলেছিলেন, তারা শিক্ষাখাতে দলীয়করণ করবে না।
“এরপরও এসব হল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে তারা যাকে বসিয়েছেন, তিনি একজন বিশিষ্ট ঋণখেলাপী এবং তাদের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য। তবে ইশতেহারে তারা লিখে রেখেছে তারা দলীয়ভাবে কোন নিয়োগ দেবে না।”
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, “গতকালকে আপনারা দেখেছেন, কয়েকজন ব্যাবসায়ীকে নিয়ে তারা একটি পরামর্শক দল তৈরি করেছে। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, এই কয়েকজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে একটা মনোপলি তৈরি হবে।”
গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করার মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ‘গণভোটের রায়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়’ মন্তব্য করে তুষার বলেন, “এগুলো বাতিল করার মধ্য দিয়ে তারা মূলত বাংলাদেশকে একটি সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।… উই আর পাসিং ডার্ক ডেইজ ইন আওয়ার ডেমোক্রেটিক হিস্ট্রি।”