Published : 06 Sep 2026, 09:30 PM
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনে ‘দ্বৈত প্রয়োগ’ রাখা হয়েছে অভিযোগ করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাদের কারো কারো মুখে কালো কাপড় বাঁধা দেখা যায়।
বিলের আলোচনায় অংশ নেবেন না জানিয়ে রোববার রাত ৮টা ১০ মিনিটে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দল জামায়াত ও জোটের শরিক দলগুলোর সদস্যরা ।
এ সময় অধিবেশন পরিচালনা করছিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
ওয়াকআউটের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী জড়িত থাকলে একইভাবে তদন্তের সুযোগ রাখা হয়নি।
ট্রেজারি বেঞ্চের পক্ষ থেকে আগে যে বিলগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছিল, সেগুলো আরও শক্তিশালী আকারে আনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত বিলে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ২৭ আগস্ট আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তাকে ফৌজদারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার মতো কিছু ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার এবং কর্তৃপক্ষকে আগে না জানিয়েই কোনো স্থান পরিদর্শনের সুযোগও রাখা হয়।
আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে আলাদা প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে। এমন অভিযোগ এলে কমিশন প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। সেই প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে। সুপারিশের পরও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বা তা সন্তোষজনক না হলে কমিশন সাধারণ প্রক্রিয়ায় পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এ ব্যবস্থাকেই বিরোধী দল সাধারণ নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে আইনের ‘দ্বৈত প্রয়োগ’ হিসেবে দেখছে।
বিলটি উত্থাপনের সময়ও বিরোধী দল ওয়াকআউট করেছিল। পরে ৩০ অগাস্ট আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিলের আলোচনা বর্জন করে জামায়াত। দলটি তখন বিল পাসের পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
শফিকুর রহমান বলেন, সাধারণ কোনো নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত হলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে আগে তাদের কাছে জবাব চাইতে হবে। প্রথমবার জবাব না দিলে কী হবে, সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের আমির বলেন, একই ধরনের অভিযোগে সাধারণ নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা রাখা যায় না।
“রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরা রাষ্ট্রের কর্মচারী হলেও তারাও দেশের নাগরিক।”
একই অপরাধে একজনের বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করা যাবে, আর অন্য ক্ষেত্রে তদন্ত আটকে থাকবে, এমন বিধান গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দুর্বল আকারে আইন আনার প্রতিবাদে তারা এ বিল পাসের অংশীদার হবেন না।
এরপর তিনি বলেন, “আমরা এ আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না এবং আমরা এখন ওয়াকআউট করছি। মাননীয় স্পিকার, সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।” এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “আপনাকে ওয়াকআউট করার জন্য ধন্যবাদ।”
সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার সময় বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি -এনসিপি সদস্যদের অনেকের মুখে কালো কাপড় বাঁধা দেখা যায়।
পরে স্পিকার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে পরবর্তী আইন প্রণয়ন কার্যক্রম উপস্থাপনের আহ্বান জানান।
মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে বিরোধের প্রেক্ষাপট
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনি কাঠামো নিয়ে চলতি বছর কয়েক দফা পরিবর্তন হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০০৯ সালের আইন বাতিল করে ২০২৫ সালে নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
ত্রয়োদশ সংসদ গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় গঠিত বিশেষ কমিটি গত ২ এপ্রিল মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ২০টি অধ্যাদেশ তখনই আইনে রূপ না দেওয়ার সুপারিশ করে।
এরপর ৯ এপ্রিল বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই ২০২৫ সালের মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন আবার কার্যকর করার বিল পাস হয়।
তখন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছিলেন, নতুন আইন যাচাই-বাছাইয়ের সময় মানবাধিকার কমিশনের আইনি কাঠামোয় যাতে শূন্যতা তৈরি না হয়, সে জন্য সাময়িকভাবে ২০০৯ সালের আইন ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
এরপর নতুন করে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়। গেল ১০ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে খসড়াটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিরোধী দলের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন বিলে মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে নাগরিকের সুরক্ষা যথেষ্ট রাখা হয়নি।
সরকার অবশ্য বিলটিতে আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগেও কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখার কথা বলছে।