গোলাপবাগ মাঠ: বিএনপির আবেদনই পায়নি দক্ষিণ সিটি
বিএনপি নেতা কায়সার কামালও বলেছেন, সমাবেশে মাইক ব্যবহার, মঞ্চ তৈরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে তারা কেবল ডিএমপিকেই চিঠি দিয়েছেন।
ঢাকার গোলাপবাগে সমাবেশের জন্য পুলিশের তরফে মাঠ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার শর্ত দেওয়া হলেও বিএনপি সেই অনুমতি নেয়নি।
দলটির কাছ থেকে কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি বলে শুক্রবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ওই মাঠের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছ থেকে ২৬ শর্তে অনুমতি পাওয়া বিএনপিও স্বীকার করেছে, সিটি কর্পোরেশনের কাছে কোনো আবেদন তারা করেনি।
শুক্রবার বিকালে ঢাকার পুলিশ কমিশনারের সাথে দেখা করে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের কাছে গোলাপবাগ মাঠে মঞ্চ নির্মাণ ও মাইক ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। পরে পুলিশের তরফ থেকে ২৬টি শর্তে তাদের অনুমতি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
এর প্রথম শর্তে বলা হয়, “এই অনুমতিপত্র স্থান ব্যবহারে অনুমতি পত্র নয়, স্থান ব্যবহারের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে অনুমোদন নিতে হবে।“
রাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গোলাপবাগ মাঠে অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পের কাজ শেষের পথে। শিগগিরই এই মাঠ উদ্বোধনের দিন ঠিক করা হবে।
“সুতরাং প্রকল্পের এই পর্যায়ে গোলাপবাগ খেলার মাঠে রাজনৈতিক সমাবেশ আয়োজন করা হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে।”
এ নগর সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের শুক্রবার রাত ৯টায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপি এ ব্যাপারে তাদের কাছে এখন পর্যন্ত অনুমতি চেয়ে কোনো চিঠি দেয়নি। আবেদন পাওয়ার পরেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
“আমি যতটুকু জানি এ বিষয়টি নিয়ে মেয়র মহোদয় মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন।”
মাঠ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সমাবেশে মাইক ব্যবহার, মঞ্চ তৈরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে শুধু ডিএমপির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেইনি।”
শনিবার দুপর ১২টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে সমাবেশ শেষ বিএনপিকে বলেছে ডিএমপি।
ডিএমপির বাকি শর্তগুলো
· গোলাপবাগ মাঠের ভেতরে সমাবেশের যাবতীয় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
· নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্তসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক (দৃশ্যমান আইডি কার্ডসহ) নিয়োগ করতে হবে।
· স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থলের ভেতরে ও বাইরে উন্নত রেজুলেশনের সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।
· নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি প্রবেশ গেটে আর্চওয়ে স্থাপন করতে হবে এবং সমাবেশস্থলে আগতদের হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে চেকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
· নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভেহিকল স্ক্যানারের মাধ্যমে সমাবেশস্থলে আসা সব যানবাহন তল্লাশির ব্যবস্থা করতে হবে।
· নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে।
· মাঠের বাইরে ও আশপাশে মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
· মাঠে প্রজেক্টর স্থাপন করা যাবে না।
· মাঠের বাইরে, রাস্তায় বা ফুটপাতে কোথাও লোক সমবেত হওয়া যাবে না।
· আজান, নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় সংবেদনশীল সময়ে মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
· ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত আসতে পারে- এমন কোনো বিষয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন, বক্তব্য প্রদান বা প্রচার করা যাবে না।
· অনুমতিত সময়ের মধ্যে সমাবেশের কার্যক্রম শেষ করতে হবে।
· সমাবেশ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে লোকজন সমবেত হওয়ার জন্য আসতে পারবে।
· সমাবেশস্থলের আশপাশসহ রাস্তায় কোনো অবস্থায় সমবেত হওয়াসহ যান ও মানুষ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা করা যাবে না।
· পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুনের আড়ালে কোনো ধরনের লাঠি-রড ব্যবহার করা যাবে না।
· আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কোনো কার্যকলাপ করা যাবে না।
· রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
· উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান বা প্রচারপত্র বিলি করা যাবে না।
· মিছিল সহকারে সমাবেশস্থলে আসা যাবে না।
· নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিং করতে হবে, মূল সড়কে কোনো পার্কিং করা যাবে না।
· সমাবেশস্থলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হলে আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে।
· স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করে সমাবেশ করতে হবে।
এসব শর্ত পালন না করলে ‘তাৎক্ষণিকভাবে এই অনুমতির আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে’ উল্লেখ করে অনুমতিপত্রে বলা হয়, ‘জনস্বার্থে’ কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া এ অনুমতি আদেশ বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে।
বিএনপি নয়া পল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ সমাবেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের অনুমতি দেয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের। এ নিয়ে অনড় অবস্থানে ছিল দুই পক্ষ।
এর মধ্যে গত বুধবার বিএনপি কর্মীরা নয়া পল্টনে জড়ো হলে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়, বিএনপি অফিসে অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচশ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এরপর বিএনপি তাদের অনড় অবস্থান থেকে সরে আসে। বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘সমঝোতা বৈঠকে’ তারা কমলাপুরের ফুটবল স্টেডিয়াম চায়। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বিএনপিকে মিরপুরের বাঙলা কলেজ মাঠে সমাবেশ করতে বলা হয়।
রাতের ওই বৈঠকে সমঝোতার ইংগিত আসার পর ভোর হওয়ার আগেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মির্জা আব্বাসকে তাদের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সন্ধ্যায় তাদের পল্টনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
তাদের আদালতে তোলার আগেই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বিকালে ঢাকার পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়ে সমাবেশের জন্য গোলাপবাগ মাঠের জন্য আবেদন দেন।
এর ঘণ্টাখানেক পর পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিএনপির সংবাদ সম্মেলন থেকেও জানানো হয়, তাদের সমাবেশ গোলাপবাগ মাঠেই হবে।
ওই খবরে বিএনপিকর্মীরা বিকালেই গোলাপবাগ মাঠে ভিড় করেন। রাতে সেখানে মঞ্চ নির্মাণের কাজও শুরু হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদও সন্ধ্যার আগে গোলাপবাগ মাঠের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘুরে দেখেন।
তিনি বলেন, সমাবেশের জন্য বিএনপিকে গোলাপবাগ মাঠ ব্যবহারের অনুমতি আগের ‘শর্তেই’ দেওয়া হয়েছে, যেমনটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দেওয়া হয়েছিল। একইরকম নিরাপত্তা বলয় গোলাপবাগেও থাকবে।
