১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করাটা ‘চপেটাঘাত’: জামায়াত

“রাতে কিংবা সন্ধ্যায় আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা সাজা দেওয়ার অভিপ্রায় যদি থাকে, তবেই আইন মন্ত্রণালয় এটি চাইবে,” বলেন শিশির মনির।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 May 2026, 05:19 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:39 PM

বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের ওপর ‘চপেটাঘাত’ করা হয়েছে’ বলে মনে করছে জামায়াতে ইসলামী। 

দলটি বলেছে, “এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে যে ‘আস্থা ও আত্মবিশ্বাস’ তৈরি হয়েছিল, তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”

বৃহস্পতিবার ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ অবস্থান তুলে ধরেন দলের কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদের সদস্য শিশির মোহাম্মদ মনির।

গত ৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয় জাতীয় সংসদ।

এরপর গত মঙ্গলবার বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন কর্মকর্তা ও বিচারককে আইন ও বিচার বিভাগে ফেরত নেয় সরকার। 

বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপকে পরের দিন ‘আদালত অবমাননা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন শিশির মনির। ৭ জুনের মধ্যে সরকার আপিল না করলে হাই কোর্টে আইনি লড়াই শুরুর ঘোষণাও দেন এ আইনজীবী। 

এরই ধারাবাহিকতায় এবার বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে জামায়াতের হয়ে সংবাদ এলেন শিশির মনির।

তিনি বলেন, “এর মধ্যদিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের ভাষায়, এটা স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য কালোদিন হয়ে থাকবে।”

তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকশাল ও সামরিক শাসনের কারণে আমাদের বিচার বিভাগ সেই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৯ সালে মাজদার হোসেন মামলার মাধ্যমে উচ্চ আদালত ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেন। সেই নির্দেশনার আলোকে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে পৃথক করা হয়।”

জামায়াতের এই আইনজীবী বলেন, বিচারকদের নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (বিজেএস) প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তাদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে আমাদের দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেয়। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের সেই রায়ে বলা হয়, ৯০ দিনের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর আলোকে ৩০ নভেম্বর ২০২৫ সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে এবং পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগই বিচারিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। বিচার বিভাগের দুটি অংশ রয়েছে, উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। আর নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ একসময় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে হতো। পরে সেখান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) নামে একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা চালু করা হয়।

বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে এ কাজটি করা হয়ে থাকে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছভাবে মানা হয়।  কিন্তু তাদের ছুটি, তাদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার সবগুলো ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে।

“ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিচারকরা কোনো আদেশ দিলে তাদের বদলি করে দেন, পদোন্নতি দেন না কিংবা শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ আনা হয়।”

জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরে শিশির মনির বলেন, “বদলি, ছুটি পদোন্নতি আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকা উচিৎ নয়, তা পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে থাকা উচিত।

“এটি লঙ্ঘন করা হলে অধঃস্তন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। রাতে, কিংবা সন্ধ্যায় আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা তাকে সাজা দেওয়ার যদি অভিপ্রায় থাকে, তবেই আইন মন্ত্রণালয় এটি চাইবে। আর যদি এই অভিপ্রায় না থাকে- তাহলে সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে আইন মন্ত্রণালয় ও সরকারের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়।”

তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় পুনর্বহাল করা অত্যন্ত জরুরি।”

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলএহসানুল মাহবুব জুবায়ের, এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, নির্বাহী পরিষদ সদস্য  মোবারক হোসাইন ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।

পরে হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন।