Published : 07 Aug 2025, 09:14 PM
জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে না থেকে কক্সবাজারে ‘বেড়াতে’ যাওয়ার ব্যাখ্যায় এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, এটা ‘অসম্পূর্ণ জুলাই ঘোষণাপত্রের’ প্রতি তার ‘নীরব প্রতিবাদ’।
দলের কাউকে না জানিয়ে কক্সবাজারে যাওয়ায় হাসনাতসহ পাঁচ নেতাকে শোকজ করেছিল এনসিপি। সেই নোটিসের উত্তরে তিনি এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, “আমি এবং অনেকেই ব্যথিত হই, যখন দেখি যে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের সময় সেই মানুষদের কথা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে, যারা অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন। শহীদ পরিবার, আহত এবং নেতৃত্বদানকারীদের অনেকেই মতামত প্রদানের সুযোগ পাননি, এমনকি অন্তর্ভুক্তির ন্যূনতম সম্মানটুকুও পাননি।”
পাশাপাশি তাদের অবকাশ যাপন নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা ও কিছু গণমাধ্যমের ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ বক্তব্য এবং তার বিপরীতে দলের ‘নীরব ভূমিকার’ সমালোচনা করেছেন হাসনাত।
তার অভিযোগ, যে কারণ দর্শাও নোটিস তাকে দেওয়া হয়েছে, সেটা ‘বিধিবহির্ভূত’ এবং তা কার্যত ‘মিথ্যা অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে উসকে দিয়েছে’।
গত মঙ্গলবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে ঢাকায় যখন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান চলছিল, তখন হঠাৎ খবর আসে, এনসিপির পাঁচ শীর্ষ নেতাকে কক্সবাজারে দেখা গেছে।
দলটির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ ছাড়াও যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, তার স্ত্রী এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী আছেন ওই দলে।
কেবল তাই নয়, সেখানে একটি হোটেলে তারা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে ‘বৈঠক করছেন’ বলেও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
পরে কক্সবাজারের ইনানীর 'সীপার্ল রিসোর্ট এন্ড স্পা' হোটেলের (হোটেল রয়্যাল টিউলিপ নামে পরিচিত) সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভও করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।
বৈঠকের কথা অস্বীকার করে খালেদ সাইফুল্লাহ ও নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী সেদিন টেলিফোনে সাংবাদিকদের বলেন, তারা কক্সবাজারে গেছেন ‘ঘুরতে’, বৈঠকের বিষয়টি ‘সত্য নয়’।
তবে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ওই পাঁচ নেতাকে কারণ দর্শাতে বলে এনসিপি। দলকে না জানিয়ে কক্সবাজারে যাওয়ায় কারণ তাদের বৃহস্পতিবারের মধ্যে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়।
এনসিপির দপ্তরের দায়িত্বে থাকা যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "শোকজ নোটিসের জবাব নেতারা যথাসময়ে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব বরাবর দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা মিডিয়াকে জানানো হবে।"
হাসনাত নোটিসের জবাব দলীয় ফোরামে জমা দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ফেইসবুকেও প্রকাশ করেছেন।
শুরুতেই ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে হাসনাত লিখেছেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষ জীবন দিয়েছিল নতুন বাংলাদেশের জন্য। এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের আশায়, যেখানে কোনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না এবং প্রতিটি নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন।
“এই আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যেই এই সরকার গঠিত হয়েছিল। সরকারের উচিত ছিল এমন একটি ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা, যা সেই মানুষগুলোর আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করবে।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশাহত হওয়ার কথা জানিয়ে এই এনসিপি নেতা বলেন, “ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত খসড়ায় এমন কিছু উপাদান দেখি, যা অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেমন, ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে সংবিধান সংস্কারের জন্য জনগণ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের উপর দায়িত্ব অর্পণের অভিপ্রায় প্রকাশ করেছে।
“এই দাবিটি অসত্য এবং সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনার পথে একটি বড় অন্তরায়। আমরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছি গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে, যা রাষ্ট্রের কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনবে এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ঘটাবে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে কক্সবাজার চলে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে হাসনাত বলেন, “৪ আগস্ট সন্ধ্যায় জানতে পারি যে আমাদের আন্দোলনের আহত এবং নেতৃত্বদানকারী অনেক ভাইবোনকে এই অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা আমার কাছে শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক ব্যর্থতা বলেই মনে হয়েছে।
“তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে এই অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। যেখানে ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজনকে, শহীদ এবং আহতদের পরিবর্তে কিছু মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর কথা এবং মতামতকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে উপস্থিত থাকার কোনও ইচ্ছা বা প্রয়োজন আমি বোধ করিনি।”
তিনি বলছেন, “পরদিন ঢাকার বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। উদ্দেশ্য ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে পূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বোঝার চেষ্টা করা এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে চিন্তা করা। একইসাথে এটি ছিল একটা অসম্পূর্ণ জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রতি আমার নীরব প্রতিবাদ।”
নাহিদ জানতেন?
হাসনাত লিখেন, ৪ অগাস্ট রাতে প্রথমে তিনি দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তাকে না পেয়ে পরে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীকে বলেন যে তিনি তার ‘স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে দুই দিনের জন্য ভ্রমণে’ যাচ্ছেন।
“যেহেতু তিনি (পাটওয়ারী) সে সময় অফিসে আহ্বায়ক মহোদয়ের সাথে ছিলেন, আমি তাকে অনুরোধ করি যাতে তিনি আহ্বায়ক মহোদয়কে বিষয়টি জানান। তিনি আমাকে জানান যে তিনি তা করবেন।
“প্রায় ত্রিশ মিনিট পর জনাব নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী আমাকে নিশ্চিত করেন যে তিনি আহ্বায়ক মহোদয়কে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং আহ্বায়ক মহোদয় এতে সম্মতি প্রদান করেছেন। পরবর্তীতে আমার সঙ্গে জনাব নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী, সস্ত্রীক সারজিস আলম ও তাসনিম জারা- খালেদ সাইফুল্লাহ দম্পতি যুক্ত হন।”
গোয়েন্দা সংস্থা ও গণমাধ্যমের সমালোচনা
হাসনাত লিখেছেন, “বিমানবন্দর থেকে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ছবি ও ভিডিও করে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা মিডিয়ার হাতে তুলে দিয়েছে। কিছু মিডিয়া সেখানে ক্রাইম মুভির মিউজিক জুড়ে দিয়ে ইচ্ছেমতো মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগসহ সেইসব উপস্থাপন করেছে।
“কিছু মিডিয়া ও গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে অপরাধপ্রবণ এবং সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি গুজব ছড়ানো হয়েছে যে, আমরা পিটার হাসের সঙ্গে গোপন বৈঠকে যাচ্ছি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করতে। অথচ তিনি তখন বাংলাদেশেই ছিলেন না।”
এসব তৎপরতার সঙ্গে বিগত দিনে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ‘মিল’ পাচ্ছেন মন্তব্য করে হাসনাত বলেছেন, “রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এই প্রবণতা, যেখানে কাউকে টার্গেট করে রাষ্ট্রদ্রোহী বানিয়ে ফেলা যায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে চলতে পারে না। গোয়েন্দা সংস্থা ও মিডিয়ার এই সম্মিলিত ‘ডেমোনাইজেশন’ টেকনিক আজকে আমাদের টার্গেট করেছে। ভবিষ্যতে অন্য যে কাউকে করতে পারে।
“সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ব্যাপার হল, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কিছু মিডিয়া এই একই প্যাটার্নে হাসিনার আমলেও বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নামে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করত। নতুন বাংলাদেশেও গোয়েন্দা সংস্থা এবং কিছু মিডিয়ার এই পুরনো অপরাধপ্রবণতা আমাকে একইসাথে অবাক এবং ক্ষুব্ধ করে।”
এই এনসিপি নেতা বলছেন, “পুরো ঘটনার সবচেয়ে দুঃখজনক ও নিন্দনীয় দিক ছিল তাসনিম জারার বিরুদ্ধে পরিচালিত নগ্ন ও কুরুচিপূর্ণ স্লাটশেইমিং। শুধুমাত্র একজন নারী হওয়ার কারণে তাসনিম জারাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার চালানো হয়।
“কিছু মিডিয়া চক্রান্তমূলকভাবে তাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর ও আপত্তিকর শিরোনাম প্রকাশ করতে থাকে। গোয়েন্দা সংস্থা ও কিছু গণমাধ্যমের সমন্বিত এই আক্রমণ একটি নারীকে হেয়প্রতিপন্ন করার সুস্পষ্ট চেষ্টা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই ন্যক্কারজনক আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে রাজনীতিতে অংশ নিতে আগ্রহী নারীদের নিরুৎসাহিত করা।”
দলের শোকজ নোটিসের সমালোচনা করে হাসনাত লিখেছেন, “আমি মনে করি আমাদের পার্টির উচিত ছিল এই গোয়েন্দা সংস্থা ও অসৎ মিডিয়ার বিরুদ্ধে দৃঢ় ব্যবস্থা নেওয়া। তার পরিবর্তে পার্টি এমন ভাষায় আমাদের বিরুদ্ধে শোকজ প্রকাশ করেছে, যা মিথ্যা অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে উসকে দিয়েছে।
“যে কোনও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে শোকজ করতে হয় গঠনতন্ত্র বা বাই-লজের কোনো নির্দিষ্ট ধারা লঙ্ঘনের কারণে। আমাকে দেওয়া শোকজে এমন কিছুর উল্লেখ নেই, কারণ আমি পার্টির কোনো আইন লঙ্ঘন করিনি। এমন বিধিবহির্ভূত শোকজ দেওয়া এবং অতি উৎসাহী হয়ে তা মিডিয়ায় প্রকাশ করা কতটুকু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক হয়েছে, সে বিষয়ে গভীরভাবে ভাববার অনুরোধ করব।”
মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, “আমি এনসিপির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং মনে করি যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতার মাধ্যমেই আমাদের দল রাজনৈতিকভাবে আরও পরিণত হবে। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমাকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যার সুযোগ দেওয়ার জন্য।”