Published : 30 Sep 2025, 07:07 PM
খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের ঘটনার পর ‘বিচারের উদ্যোগ না নিয়ে’ ওই এলাকায় শান্তিরক্ষায় নিয়োজিতরা ‘কেন সেটা বাড়তে দিল’– সেই প্রশ্ন তুলেছেন মহিলা সমিতির সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম।
খাগড়াছড়িতে মারমা কিশোরকে দলবেঁধে ধর্ষণ এবং প্রতিবাদকারী বিচার প্রার্থীদের উপর ‘হামলা ও হত্যার’ প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে ফওজিয়া বলেন, “ধর্ষণ একটি ক্রিমিনাল অপরাধ, এটা বাংলাদেশের আইন বলে। সরকার নাকি ধর্ষণের বিচারের জন্য কঠিন থেকে কঠিন বিচারের ব্যবস্থা করছেন। অথচ ধর্ষণের বিচারের জন্য মানুষকে দাবি জানাতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। তাহলে সরকার যে আইন করেন, সরকার যে বক্তব্য দেন, সেই বক্তব্য কেন বাস্তবায়িত হয় না? এর পিছনে কারণ কী?
“ধর্ষণের বিচার কেন চাইতে হবে? বলা হচ্ছে যে, ধর্ষণ প্রমাণ করা যায় নাই। কেন, আলামত ছিল না? আমরা দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। ধর্ষণকে ক্রিমিনাল একটা গুরুত্বপূর্ণ অফেন্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ধর্ষণকে নানাভাবে ভাবা হচ্ছে। সেখানে আমরা জানি যে আলামত পাওয়াটা খুবই কঠিন।
তিনি বলেন, “এখন প্রশ্ন উঠেছে, ধর্ষণের যে শিকার, তাকে কেন প্রমাণ করতে হবে? ধর্ষক যে ধর্ষণ করে নাই, তার প্রমাণ দিতে হবে, এই আলামত আমরা চাই। যার নামে অভিযোগ করা হয়েছে, তাকে আমরা ধরি না কেন? তার আশপাশে এদিক সেদিক আমরা ঘুরে বেড়াই। এরকম করতে করতে আমরা এক পর্যায়ে যে মানুষকে উত্তেজিত করে, মানুষকে দিয়ে অপরাধ করানোর চেষ্টা করি।”
গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়িতে ক্ষেত থেকে এক মারমা কিশোরীকে ‘অচেতন অবস্থায়’ উদ্ধারের পর সেই রাতেই ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন তার বাবা। পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর মধ্যে ধর্ষণের প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় খাগড়াছড়িতে। এই আন্দোলন এক সময় সহিংস হয়ে ওঠে।
১৪৪ ধারা জারির পাশাপাশি অতিরিক্ত সেনা ও বিজিবি মোতায়েনের পরও পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। রোববার ১৪৪ ধারার মধ্যেই গুইমারায় ব্যাপক সহিংসতা হয়। সেখানে গুলিতে নিহত হয় তিনজন।
ফওজিয়া মোসলেম বলেন, যে ঘটনাটা খাগড়াছড়িতে হয়েছে। আমরা জানি যে পার্বত্য এলাকায় শান্তি রক্ষার জন্য সেনাবাহিনী নিয়োজিত আছেন? প্রথমে যখন ধর্ষণের ঘটনা ঘটল, তখন কেন সেনাবাহিনী সে ধর্ষণের ঘটনার বিচার করার উদ্যোগ নিল না? কেন সেটাকে বাড়তে দিল? যার কারণে একটা সাম্প্রদায়িকতায় রূপ নিল।
“এই বিষয়টাগুলোতে এত নির্লিপ্ততা সরকারের! এত নির্লিপ্ততা! এই নির্লিপ্ততার কারণটা কী? শুধুমাত্র নির্বাচন করে বাংলাদেশের মানুষ একেবারে পার পেয়ে যাবে? যে জনগোষ্ঠী আপনারা তৈরি করছেন, যে অপরাধে ভরা সমাজ আপনারা তৈরি করছেন, তার মধ্যে কেউ এক ফোঁটা নিরাপদ থাকতে পারবে না।”
মহিলা সমিতির সভাপতি বলেন, “আজকে আমি এখানে দাঁড়িয়ে মনে করছি, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া কল্পনার কথা, যে কল্পনা বলেছিল যে আজকে পাহাড়ে যে ধর্ষণ হচ্ছে, সেই ধর্ষণ সমতলেও নেমে আসবে। আজকে আমরা দেখি, সমতলে হাজার হাজার তরুণী… আমাদের প্রতিদিন কত ধর্ষণের কেস করতে হয়।
“আমি মনে করি, যখন একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়, সেই ধর্ষণের শিকার হয় রাষ্ট্র, সেই ধর্ষণের শিকার হয় রাষ্ট্রনায়করা, সেই ধর্ষণের শিকার হয় এদেশের সমগ্র মানুষ, আমরা নারী সমাজ তো হইই।”
যে নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তার জন্য বিচার আদায় করার প্রত্যয় জানিয়ে এই নারী নেত্রী বলেন, “আপনারা আসেন, আমরা সকলে মিলে যে কোনো অপরাধকে নির্মূল করার জন্য সংগঠিত হই, শক্তিশালী হই, আওয়াজ তুলি এই বলে যে অপরাধীরা নির্মূল হোক। দেশ শান্তিতে সুখে এগিয়ে যাক, বাংলাদেশের যে মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহিদের স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন আজকে বাস্তবায়িত হোক।”
মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, “গ্রামে পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা মারমা কিশোরীর উপরে একদল হিংস্র মানুষের যে উন্মত্ত আচরণ, তার যন্ত্রণা তার দীর্ঘশ্বাস আজকে ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। শুধুমাত্র তাই নয়, ধর্ষণ বা যে কোনো ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরুদ্ধে আমরা। যারা অপরাধী, তারা সহজেই পার পেয়ে যায়। তাদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয় না।
“সেরকম একটা পরিস্থিতিতে যখন এই মার্মা কিশোরীর ধর্ষণের বিচারের দাবিতে এলাকাবাসী ফুঁসে উঠেছে, তার শহরের লোকেরা যখন ফুঁসে উঠেছে, পাহাড়ি আদিবাসী সম্প্রদায় যখন ফুঁসে উঠেছে, তখন আমরা দেখলাম যে, সেই ধর্ষণের যে অপরাধ, সেই অপরাধটা হারিয়ে গেল। সেই অপরাধটা সামনে এল না। যারা প্রতিবাদকারী, আন্দোলনকারী, তাদের উপরে আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেমে পড়েছে।”
তিনি বলেন, “জুজুর ভয় দেখিয়ে সবসময় যে কথা তারা বলে থাকে, সেইভাবে তারা কিন্তু তাদের উপরেই আক্রমণটা চালাল। আমরা দেখলাম যে কীভাবে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হল, আমরা দেখলাম যে সেই মারমা কিশোরীর যন্ত্রণা এবং দীর্ঘশ্বাস। পাশাপাশি এলাকায় অগ্নিসংযোগের লুটপাটের একটা মহোৎসব হল। কোথায় ছিল আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? কোথায়? তারা কীভাবে এটা দেখেছে? নাকি তারা এই যে সেখানে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হল, এই দায় কে নেবে? কীভাবে নেবে?
“এই যে ধর্ষণের শিকার যে নারী, তার এই যে ঘটনা, এই ঘটনার প্রকৃত সত্য আমাদের সামনে হাজির করবে রাষ্ট্র। কেননা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের বয়ান আমরা শুনে থাকি। বিভিন্ন রকমের কারণ আমাদের বলানো হয়, বিভিন্ন রকমের জুজুর ভয় দেখিয়ে আমাদের কাছে বিভিন্ন রকম প্রতিবেদন পেশ করা হয়, উপস্থাপন করা হয়।”
মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমরা আশা করব, এই ঘটনার প্রকৃত সত্য সেটা উদঘাটন করা হবে এবং যারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত, যথাযথভাবে তাদের বিচার করা হবে।
“একই সঙ্গে যাদের যে প্রতিবাদকারী আন্দোলনকারীদের উপরে হামলা করা হয়েছে। হামলাকারীদের যারা হত্যা, হামলা করেছে, সেই অপরাধেরও যেন বিচার করা হয়। কোনোভাবে কোনো পরিচয়ে যেন তারা সেই বিচারের আওতার বাইরে না থাকে।”
অন্যদের মধ্যে মহিলা সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম, সংগঠনের নেত্রী রেখা সাহা, রেহানা ইমু, সেলিনা পারভীন মানববন্ধনে বক্তব্য দেন।