১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের সামনে আরও একটি ১৫ অগাস্ট

এক সময় বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা জাসদ বলেছে, “বাংলাদেশের ইতিহাসে এ বর্বর ঘটনা (বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড) এক অমোচনীয় কলঙ্ক হিসেবেই থেকে যাবে। দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জাতির এ কলঙ্ক দূর করা সম্ভব বলে বাংলাদেশ জাসদ মনে করে।”

‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের সামনে আরও একটি ১৫ অগাস্ট
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির এই সিঁড়িতেই গুলি করে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেই বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Aug 2026, 01:07 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ফিরে এল সেই ১৫ অগাস্ট, ৫১ বছর আগে যে দিনটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রমের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হত। পুরো মাসজুড়ে থাকত নানা আয়োজন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেই সরকার পতনের পর তৃতীয়বারের মত দিনটি এল বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি ছাড়াই।

২০২৪ সালে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসাবে ১৫ অগাস্টের ছুটির বাতিল করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে।

বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বৈরশাসন আর শত শত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন। দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে ছয় শতাধিক মামলা ঝুলছে। 

জুলাই অভ্যুত্থান ঠেকাতে দমন-পীড়নে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখনও নিষিদ্ধ। শেখ হাসিনার মতই অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। একটি অংশ গ্রেপ্তার হয়ে আছেন কারাগারে। কর্মীরা সব ছন্নছাড়া।    

এরকম পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার ৫১তম বার্ষিকী সামনে রেখে ফেইসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের অনেকে। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বিদেশে বসে বিভিন্ন কর্মসূচির পোস্ট শেয়ার করছেন।  

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে কড়া নিরাপত্তা

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে কড়া নিরাপত্তা

গতবছর ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনার পতনের ছয় মাস পূর্তির দিনে ‘মুজিববাদের কবর রচনার’ ঘোষণা দিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভেকু দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবারের ১৫ অগাস্টকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে’ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।

এর অংশ হিসেবে ঢাকার সকল প্রবেশপথে চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো আনা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায়। এসব স্থাপনা সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারির আওতায় থাকবে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জেও ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়াসহ জেলার ‘স্পর্শকাতর’ স্থানে জেলা পুলিশের পাশাপাশি পাঁচ প্লাটুন বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ৫ অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে চাপা উত্তেজনা দেখা দেয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়।  

ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। তাছাড়া নেতাকর্মীদের নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনার কথা কয়েকটি সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছেন।  

অন্যদিকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকারও। যদিও তাতে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।  

একজন শেখ মুজিব

স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তা ও সৈনিকের হাতে সপরিবারে জীবন দিতে হয় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে।

তার পরিবারের ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে অন্তঃসত্ত্বা নারীও সেদিন ঘাতকের গুলি থেকে রেহাই পায়নি।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগ গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসেন তিনি।

এরপর বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ও ছেষট্টির ছয় দফা প্রণয়নে শেখ মুজিবকে দেখা যায় নেতৃত্বের ভূমিকায়। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করলে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কারামুক্ত হন শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করে ছাত্র-জনতা।

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন শেখ মুজিব। তার সেই ডাকে বাঙালির রক্তাক্ত সংগ্রামে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।

স্বাধীনতার পর শুরু হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার পালা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বদলে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ। 

১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্ট প্রকাশিত দৈনিক বাংলা, ফাইল ছবি

১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্ট প্রকাশিত দৈনিক বাংলা, ফাইল ছবি

৫০ বছর আগে সেই রাতে ঘাতকরা শেখ মুজিব ছাড়াও স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, শেখ মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসেরকে হত্যা করে।

সেই রাতেই নিহত হন শেখ মুজিবের বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু; তার ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকট আত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত ও রিন্টু।

ধানমণ্ডির বাড়িতে পুলিশের বিশেষ শাখার সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমান ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলকেও গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।

শেখ মুজিবের দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় সে সময় প্রাণে বেঁচে যান। শেখ মুজিবকে জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় দাফন করা হলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পুরনো খবর

১৫ অগাস্টথমথমে রাত পেরিয়ে বিভীষিকার ভোর

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আত্মস্বীকৃত খুনিদের রক্ষায় সে সময় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিচার শুরু হয়। চূড়ান্ত বিচার শেষে ২০১০ সালে পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২০ সালে ফাঁসি হয় আরেক আসামি আবদুল মাজেদের।

পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের পর দুই দশকের বেশি সময় শেখ মুজিব ছিলেন অনেকটা বিস্মৃত। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর ১৫ অগাস্টকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ ঘোষণা করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শেখ মুজিবকে স্মরণ করার সুযোগ তৈরি হয়।

২০০১ থেকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের পাঁচ বছরে আবারও বাতিল করা হয় সেই শোকের দিবস। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে হাই কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সাল থেকে দিনটি আবার জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের পাশাপাশি ঘোষণা হয় সরকারি ছুটি।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা কর্মসূচি পালন করত এই দিনে।

চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকেই ১৫ অগাস্টের জাতীয় শোক দিবসের সাধারণ ছুটি বাতিল করা হয়। 

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর আক্রান্ত হয় বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ভবনটি। ভেঙে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর বহু ভাস্কর্য।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর আক্রান্ত হয় বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ভবনটি। ভেঙে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর বহু ভাস্কর্য।

শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালের মত শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরকেও এখন ‘স্বৈরশাসনের’ কাল হিসেবে দেখানো হয়। সমালোচকরা এক্ষেত্রে ১৯৭৪ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদাহরণ টানেন।

সে সময় বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা জাসদের শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান নেতৃত্বাধীন অংশটি এখন বাংলাদেশ জাসদ নামে কার্যক্রম চালাচ্ছে। 

আম্বিয়া বলেন, "গতবারের মত এবারও আমরা তোপখানা রোডে আমাদের অফিসে অস্থায়ীভাবে বনানো বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করব। শনিবার বিকাল ৫টায় শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আলোচনা সভাও হবে।”

দলটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল–বাংলাদেশ জাসদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম হত্যা বার্ষিকীতে ১৯৭৫ সনের এদিনে নৃশংস ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ, কর্নেল জামিলসহ কর্তব্যরত অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ, শেখ ফজলুল হক মনি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যবৃন্দ, মোহাম্মদপুরের দুটি পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং অন্যান্যদের হত্যকাণ্ডে তীব্র ঘৃণা ও গভীর শোক প্রকাশ করছে।

“বাংলাদেশের ইতিহাসে এ বর্বর ঘটনা এক অমোচনীয় কলঙ্ক হিসেবেই থেকে যাবে। দেশে আইনের শাসন, ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জাতির এ কলঙ্ক দূর করা সম্ভব বলে বাংলাদেশ জাসদ মনে করে।”