১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কী কী সম্পত্তি আছে শেখ হাসিনার?

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনে শেখ হাসিনার দাখিল করা হলফনামায় তার ঘোষিত সম্পদ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

কী কী সম্পত্তি আছে শেখ হাসিনার?
ফাইল ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Sep 2026, 10:31 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ কীভাবে কার্যকর করা হবে, সেই প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে রুলস অব প্রসিডিউর সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

সোমবার প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা জানান ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “রুলস অব প্রসিডিউর বা কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন হলে তা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলাসহ ইতোমধ্যে হওয়া অন্যান্য রায়ের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে।”

গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের তাদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয় রায়ে।

এখন প্রশ্ন হল, আদালতের রায় বাস্তবায়িত হলে শেখ হাসিনার কোন কোন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে? কী কী সম্পদ তার নামে রয়েছে?

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনে শেখ হাসিনার দাখিল করা হলফনামায় তার ঘোষিত সম্পদ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। সেই নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি।

শেখ হাসিনার নামে কী কী সম্পদ আছে 

৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব সে সময় নির্বাচন কমিশনে দিয়েছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

সেখানে বলা হয়েছিল, ২০২২ সালে তিনি ১ কোটি ৭ লাখ টাকা আয় করেছেন এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে কৃষিখাত থেকে। ওই খাত থেকে তার আয় ২০১৮ সালের তুলনায় বেড়ে ৪ গুণ হয়েছিল।

আর সিকিউরিটিজ থেকে তার আয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছিল। ২০১৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চার বছরে তিনি ফিক্সড ডিপোজিট ও সঞ্চয়পত্রে মোট ৭৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন ।

শেখ হাসিনার আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তখন তার বার্ষিক আয় ছিল ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

হলফনামায় দেখা যায়, শেখ হাসিনার তখন তিনটি মোটরগাড়ি ছিল, যার একটি উপহারের। আর দুটির দাম সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা। 

তার কাছে থাকা সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দাম দেখানো হয়েছিল ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আর তার বাড়ির আসবাবের দাম দেখানো হয়েছিল ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

শেখ হাসিনা তার নামে থাকা কৃষিজমির পরিমাণ দেখিয়েছিলেন ১৫ দশমিক ৩ বিঘা, যার কেনা অংশের দাম ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। বাকিটা পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া। সেসব জমির অবস্থান টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে।

এর মধ্যে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা একটি ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক (আংশিক) জমির  দাম দেখানো হয়েছে ৫ লাখ টাকা।

গাজীপুর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায় বাংলাদেশ স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্ব পাশে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ঘেঁষে রয়েছে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের একটি বাগানবাড়ি।

১৯৭০ সালের দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এ জমি লিখে দিয়েছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক হয়েছেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। পরে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জমির কিছু অংশ সন্তানদের লিখে দেন। সেই সূত্রে মালিক হন শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদ এবং শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক। নথিপত্রে জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২৯৭ শতক (৯ বিঘা)।

হলফনামায় ঢাকার পূর্বাচলে শেখ হাসিনার নামে একটি প্লট দেখানো হয়েছে, যার দাম ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার নামে, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, ছোট বোন শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীর নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে এসব প্লট নেওয়ার অভিযোগে দুদকের মামলায় তাদের সাজার রায়ও হয়েছে।

২০০৮ সালের হলফ নামায় আপত্তি দুদকের 

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ২০২৫ সালে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল দুদক। 

সেখানে বলা হয়, শেখ হাসিনা নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইসিতে দাখিল করা হলফনামায় নিজের সম্পদের বিষয়ে ‘অসত্য’ তথ্য দিয়েছেন। 

এ কারণে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের আওতায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয় ইসিকে।

শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের হলফনামায় তার নামে ৬ দশমিক ৫০ একর কৃষিজমি থাকার তথ্য দিয়ে এর দাম দেখিয়েছিলেন ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। 

কিন্তু দুদক বলছে, তারা যাচাই করে দেখেছে, শেখ হাসিনার নামে তখন ২৮ দশমিক ৪১১ একর কৃষিজমি ছিল, যার মধ্যে কেনা জমির দাম ৩৩ লাখ ৬৬ হাজার ১০ টাকা।

এই হিসাব দেখিয়ে দুদক বলছে, শেখ হাসিনা ২১ দশমিক ৯১ একর জমির তথ্য গোপন করেছেন এবং প্রকৃত দামের চেয়ে ৩১ লাখ ৯১ হাজার ১০ টাকা কম দাম দেখিয়েছেন।

অভিযোগে আরো বলা হয়, শেখ হাসিনা তৎকালীন মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সিরাজুল আকবরের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির কোটা ব্যবহার করে ২ লাখ ৩০ হাজার ইউরো দামের একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি আমদানি করেন। এলসির বিপরীতে ব্যাংক থেকে মোট ১ কোটি ৯৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। গাড়িটি তার ধানমন্ডির ঠিকানা ‘সুধাসদনে’ রেজিস্ট্রেশন করা হয় এবং তিনিই ব্যবহার করেছেন।

তবে সিরাজুল আকবরের আয়কর রিটার্ন ও নির্বাচনের আগের হলফনামায় ওই গাড়ির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এবং তিনি নিজেও কখনো সেটি ব্যবহার করেননি।

৩২ নম্বরের বাড়ি কার?

ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান। তখন থেকেই তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন।

সেদিন বিকাল থেকেই তখনকার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে লুটপাট চালানো হয়। সেখানে থাকা আসবাবপত্রসহ দামী অলংকার নিয়ে যেতে দেখা যায়।

সে সময় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনেও হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রয়ারিতে ভেকু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের এই তিনতলা বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। এই বাড়িতে থেকেই তিনি পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

এই বাড়ি থেকেই একাত্তরের ২৫ শে মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টে এই বাড়িতেই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে তাকে হত্যা করা হয়।

১৯৮১ সালে তার মেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে শুরুতে তাকে ওই বাড়িতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে ওই বছরের ১০ জুন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার পর শেখ হাসিনা বাড়ির মালিকানা পান। তবে তিনি সেখানে থাকেননি।

শেখ হাসিনা বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করেন। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে এবং নাম দেয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর।

অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধু ভবনের মালিকানা এখন আর শেখ হাসিনার হাতে নেই। আর ধানমন্ডির সুধা সদনের মালিকানা রয়েছে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নামে।

পুরনো খবর

শেখ হাসিনা পরিবারের 'দুর্নীতিরযত অভিযোগ