Published : 01 Sep 2026, 10:49 PM
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ছয় সাবেক সংসদ সদস্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বলে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নে অভিযোগ জমা পড়েছে।
এর জবাবে আগের সরকারের ১৬-১৭ বছরে সংঘটিত ‘গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের’ নথি আইপিইউকে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদের কয়েকজন সদস্য।
আগের সরকারের সময়ে ‘নির্যাতনের শিকার’ বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যদের বিষয়েও আইপিইউর মানবাধিকার কমিটিতে অভিযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন তারা।
সেজন্য জাতীয় সংসদে মানবাধিকারবিষয়ক একটি কমিটি গঠনের ‘অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত’ হয়েছে বলে চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে আইপিইউ মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ ও তার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন আগের সরকারের সময়ে ‘নির্যাতনের শিকার’ কয়েকজন সংসদ সদস্য ও তাদের স্বজনেরা।
জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও চিফ হুইপও সেখানে ছিলেন।
বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফ করেন চিফ হুইপ। সেখানে অন্যদের মধ্যে জহরত আদিব চৌধুরী, তাহসিনা রুশদীর লুনা, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, আনিসুর রহমান, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও সানজিদা ইসলাম তুলি বক্তব্য দেন।
আইপিইউর নথি অনুযায়ী, ছয় সাবেক সংসদ সদস্যের বিষয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে অভিযোগ জমা পড়ে। তারা হলেন সাবের হোসেন চৌধুরী, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, হাবিবে মিল্লাত, আসাদুজ্জামান নূর, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মুহাম্মদ ফারুক খান।
অভিযোগে ‘হুমকি, ভয় দেখানো, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক, কারাগারে অমানবিক পরিবেশ এবং ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার’ কথা বলা হয়েছে।
গত ১৯ এপ্রিল আইপিইউ গভর্নিং কাউন্সিল কারাবন্দি ফজলে করিম চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর, মোশাররফ হোসেন ও ফারুক খানের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানায়। মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের জামিনের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখার আহ্বান জানানো হয়। ওই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল আপত্তি জানিয়েছিল।
আইপিইউ ছয় সাবেক সংসদ সদস্যের বিচার পর্যবেক্ষণে একজন পর্যবেক্ষক পাঠানোর আগ্রহ জানায়। তাদের অবস্থা জানতে বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানো এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করারও কথা ছিল।
ব্রিফিংয়ে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, সাবেক সংসদ সদস্যদের বিষয়ে জমা পড়া অভিযোগ তদন্তের জন্য আইপিইউ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছে।
“বর্তমানে কারাগারে থাকা সাবেক সংসদ সদস্যদের ডিভিশন বা বিশেষ শ্রেণির সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে।”
হুম্মামের বক্তব্যের পর চিফ হুইপ বলেন, আইপিইউ প্রতিনিধি দল কোনো তদন্ত করতে বাংলাদেশে আসেনি। তবে তারা ‘জানতে চেয়েছে’।
নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সংসদের কার্যক্রমে সবার অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রতিনিধি দলের সফরের মূল উদ্দেশ্য।”
আগের সরকারের সময়ে ‘নির্যাতনের শিকার’ সংসদ সদস্যদের বিষয়ে আইপিইউতে অভিযোগ দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
চিফ হুইপ বলেন, এসব বিষয় সমন্বয়ের জন্য জাতীয় সংসদে মানবাধিকারবিষয়ক কমিটি গঠনের আলোচনা হয়েছে। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটি গঠনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, “আইপিইউ কোনো আদালত নয়। তাদের বিচার বা ট্রাইব্যুনাল গঠনের ক্ষমতা নেই।”
তার দাবি, “বাংলাদেশে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। অভিযুক্তরা দোষী হলে শাস্তি পাবেন। নির্দোষ হলে আদালতের মাধ্যমে খালাস পাবেন। আইপিইউ চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারে।”
জহরত বলেন, “আইপিইউ কোনো অপরাধীকে রক্ষা করবে না বলে অ্যান্ডা ফিলিপ তাদের জানিয়েছেন।”
মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, আইপিইউতে সংসদ সদস্যদের মানবাধিকারবিষয়ক একটি কমিটি রয়েছে। কমিটি বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করে।
“আগের সরকারের সময়ে সংসদ সদস্যদের ওপর নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা আইপিইউর কাছে তুলে ধরা হবে।”
নাজিবুর বলেন, “যারা এতকাল অত্যাচার নির্যাতন করল সে নির্যাতনকারীরা আজকে মজলুম সাজার চেষ্টা করছে।”
তার অভিযোগ, “দেশের বাইরে পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সংস্থায় লবিং হচ্ছে। আগের সরকারের নির্যাতনের ঘটনা আড়াল করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হচ্ছে।”
মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, ‘গুম’ হওয়ার পর যারা এখনো ফিরে আসেননি, তাদের সন্ধানে আইপিইউর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। গুম ও হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতেও সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।
এসব দাবি নিয়ে আইপিইউ মহাসচিবের কাছে লিখিত আবেদন দেওয়া হবে বলে জানান আরমান।
সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, গত ১৬-১৭ বছরে ‘গুমের’ যেসব ঘটনা তদন্ত কমিশনের তালিকায় এসেছে, সেগুলো বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে।
তার দাবি, তালিকাভুক্ত বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি। হাঁটুতে গুলি করে পঙ্গু করার ঘটনা প্রায় ৬০০টি।
জুলাই অভ্যুত্থানে সরকারি তালিকায় ১ হাজার ৪০০ জন এবং বাস্তবে ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আনিসুর রহমান বলেন, আগের সরকারের সময়ে ‘গুম, খুন, নির্যাতন ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের’ ঘটনা আইপিইউ প্রতিনিধি দলের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এসব বক্তব্য প্রতিনিধি দল নথিভুক্ত করেছে। তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দেওয়া হবে।
গত ৩০ অগাস্ট ঢাকায় আসা অ্যান্ডা ফিলিপের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছাড়ার কথা রয়েছে।