১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘বিরোধী দলের অবস্থান থেকে পতন ঘটানোর’ পাল্টা হুমকি ইশরাকের

“মাননীয় সংসদ নেতার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনি খালি হুকুম দেবেন।”

‘বিরোধী দলের অবস্থান থেকে পতন ঘটানোর’ পাল্টা হুমকি ইশরাকের
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Apr 2026, 09:24 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:31 PM

বিরোধী দলের বক্তব্যে ‘ক্যাম্পাসে উত্তাপ বাড়ার’ অভিযোগ তুলে সংসদে পাল্টা হুমকি দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। 

বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় ঢাকা ৬ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেছেন, নির্বাচিত সরকারকে হুমকি দিলে বিরোধী দলের জন্যও ভালো কিছু হবে না। 

ইশরাক বলেন, “আমরা জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়ে এই সংসদে এসেছি। আমাদেরকে যদি কেউ হুমকি ধামকি দিয়ে মনে করে সরকার পতন করবে, আমি ... মাননীয় সংসদ নেতার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনি খালি হুকুম দেবেন।

“আপনারা যদি আমাদেরকে পতন করার হুমকি দেন, তাহলে বিরোধী দলের অবস্থান থেকে আপনাদেরকে পতন ঘটানো হবে ইনশাআল্লাহ।”

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এদিন অধিবেশন পরিচালিত হয়।

ইশরাক বলেন, গত কয়েকদিনে সংসদে অনেক সদস্যের বক্তব্য শোনার পর তার নিজের ‘প্রথম পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য’ বদলাতে হয়েছে।

“আমাদের সম্মানিত বিরোধী দলের সদস্যরা এখানে রয়েছেন। তাদের অনেকেই খুব সুন্দর বক্তব্য দিয়ে থাকেন। সেটাকে আমরা অ্যাপ্রিশিয়েট করি। কিন্তু তারা সংসদের বাইরে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংসদের ভেতরেও যেভাবে বক্তব্য রাখছেন, তার মাধ্যমে যে বিষ বাষ্প ছড়ানো হচ্ছে, সেটির একটা প্রভাব কিন্তু আমরা বর্তমান যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্যাম্পাস যে উত্তপ্ত হয়েছে, সেখানে দেখতে পাচ্ছি।”

বিএনপির এই এমপি বলেন, “গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার এখানে সুন্দর আলোচনা হল। জ্বালানি বিষয়ক একটি সমস্যা নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হল। আমাদের মাননীয় বিরোধী দলের নেতা, তিনিও খুব সুন্দর বক্তব্য রাখলেন। 

“কিন্তু পরের দুই দিনেই আমরা দেখলাম, তাদের নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের কথা বলেছে এবং একপ্রকার জনগণকে উসকানি দিয়েছে।”

ইশরাক বলেন, “এমনও কথা বলা হয়েছে যে ১৭ দিনের মধ্যে নাকি বিএনপির নির্বাচিত সরকারকে তারা ক্ষমতা থেকে হটাবে।”

এর পরই তিনি বলেন, “আমরা কোন ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চাই না। আমরা বাংলাদেশে কোনো ধরনের বিভক্তির রাজনীতি চাই না। আমরা একটা শান্তির রাজনীতি চাই, একটা ঐক্যের রাজনীতি চাই।”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিগত ২৪ সালে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি যদি আমরা সম্মান প্রদর্শন করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।”

তার ভাষায়, “এই যে সংঘাত, এই যে একটা অস্থির পরিবেশ তারা তৈরি করার চেষ্টা করছে, তার মধ্যে লাভবান কারা হচ্ছে? একমাত্র ফ্যাসিবাদের যারা দোসর, যারা পলাতক রয়েছে, তারাই লাভবান হবে।”

নূরের আন্দোলনযাত্রা

পটুয়াখালী ৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হলে সিট পেতে ‘আধুনিক দাসপ্রথার মত’ লেজুড়বৃত্তি, চাকরিতে কোটার বাধা এবং পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলার অভিজ্ঞতা তাকে পরিবর্তনের রাজনীতিতে ঠেলে দেয়।

নূর দাবি করেন, ২০১৮ সালের ১৭ মার্চ তিনিই ‘আনুষ্ঠানিকভাবে’ কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। পরে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও শিক্ষার্থীদের ওপর ‘হাতুড়ি, হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব’ হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নূর বলেন, “কোন কিংস পার্টি গঠনের জন্য এদেশের ছাত্রজনতা রাজপথে নেমে আসে নাই, জীবন দেয় নাই।”

তার দাবি, ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর সরকার ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের একদফার যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখাও দেওয়া হয়েছিল।

জুলাইয়ের আগে আন্দোলনের স্ফূলিঙ্গ ‘বড় বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে’ বলে বিএনপি নেতাদেরও সতর্ক করেছিলেন বলে তার ভাষ্য।

আন্দোলনে জামায়াতের অবদান স্বীকার করে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নূর বলেন, “আমি জামায়াতে ইসলামের বিগত দিনের কন্ট্রিবিউশনকে অ্যাকনলেজ করি, কিন্তু ... আন্দোলন সংগ্রামের বিষয়ে আমি এই যে ক্রাইসিস মোমেন্টে এত ছাত্র আন্দোলন লিড করেছি, জামায়াত শিবিরের কারো সাথে আমার কখনো আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে আলাপ আলোচনা নাই।”

জুলাই সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল, তা নিয়ে এখন ‘মিথ্যা-সত্য মিশিয়ে’ উপস্থাপন করা হচ্ছে।

বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে নূর বলেন, “তর্কের খাতিরে তর্ক, বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে ... গঠনমূলক সমালোচনা এবং ইতিবাচক পরামর্শের মাধ্যমে সহযোগিতা করুন।”

যশোরের চিকিৎসা সংকট ও উন্নয়নের কথা অমিতের

যশোর ৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তার বক্তব্যে যশোরের স্বাস্থ্যসেবা সংকটের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা খুলনায় নেওয়ার পথে জেলার ‘বহু রোগী’ মারা যাচ্ছেন।

২০০১ সালে যশোরে একটি পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর ১৯ বছরেও তা চালু হয়নি বলে আক্ষেপ করেন প্রতিমন্ত্রী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “আগামীতে আমার এই অঞ্চলের কোনো মানুষকে যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে কিংবা খুলনায় নিয়ে যাওয়ার পথে জীবন হারাতে না হয়।”

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যশোরে গিয়ে খাল পুনঃখনন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। এর আগে এ হাসপাতালের ঘোষণা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতার সমালোচনা করে অমিত বলেন, খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান কেউই এ আন্দোলনের একক কৃতিত্ব দাবি করেননি।

বিরোধী দলীয় সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সামান্য কিছু শব্দ বা বাক্য নিয়ে ‘এত উত্তেজনা’ দেখানো হচ্ছে, তা ‘শরীরের জন্যও ভালো নয়’।

‘চেতনা বিক্রি’ নয়

নাটোর ১ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেন, ১৭ বছরের ‘যন্ত্রণা বঞ্চনা’ বুকে নিয়ে তারা একটি ‘কার্যকর’ সংসদে এসেছেন।

একাত্তরকে যেমন রাজনৈতিকভাবে ‘বিক্রি’ করা হয়েছে, এখন কেউ কেউ একইভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও ‘বিক্রির’ চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষায়, “চেতনা বিক্রি করার না, ধারণ করার বিষয়।”

ফারজানা বলেন, তারা কাউকে ‘জান্নাতের স্বপ্ন’ দেখাননি, তাই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়, কিন্তু কাজ শুরু হয়েছে।

নারী সংসদ সদস্যদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম নেই যে ধর্ম কখনো পূণ্যকে ‘না’ বলেছে, পাপকে ‘হ্যাঁ’ বলেছে। ইসলাম সবথেকে বেশি সম্মানিত করেছেন নারীদেরকে।”

নারী এমপিদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য হলেও এ নিয়ে বিরোধী দল বা অন্যদের কাছ থেকে কোনো নিন্দা আসেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

রাষ্ট্রপতিকে ‘ব্যক্তি হিসেবে’ ধন্যবাদ দিতে নারাজ নিজান

লক্ষ্মীপুর ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর সংসদে আবার ফিরতে পারবেন কি না, তা তাদের অনেকেরই ধারণায় ছিল না। জুলাইয়ের রক্তাক্ত আন্দোলন সেই পথ খুলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “ওই চেয়ারকে ধন্যবাদ দিচ্ছি, ও প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে, ব্যক্তি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সাহেবকে ধন্যবাদ জানাতে পারলাম না বলে আমি দুঃখিত।”