ইউপি নির্বাচনের আগে সরকারি এমপিদের বরাদ্দ বিতর্কের কারণ হতে পারে
একজন এমপি যে পরিমাণ বরাদ্দ পাবেন, তা দিয়ে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। কিন্তু অর্থের পরিমাণ সামান্য হলেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে দেওয়া এই বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনাটা হবে বড়।
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। মন্ত্রীর অভিপ্রায়ে ২০৩টি আসনে এমপিরা তাদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবেন। বিশেষ এই বরাদ্দের পরিমাণ ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আগামী বছর ৩০ জুনের মধ্যে বরাদ্দের টাকা খরচ করতে হবে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার মানে এই বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ইউপি নির্বাচন সামনে রেখেই। প্রশ্ন হলো, এই বরাদ্দ শুধু সরকারি দলের এমপিদের জন্যই কেন? বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা কেন এই বরাদ্দ পাবেন না? এটি কি ইউপি নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করবে বা সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের ভোটের মাঠে এগিয়ে রাখবে?
আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দলীয় সমর্থনে বাধা নেই। সেই হিসেবে ভোটাররা জানবেন যে, কোন প্রার্থী কোন দল সমর্থিত। তাছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, খুব সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া বাকি সবাই কোনো না কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে দল তাদের মনোনয়ন না দিলেও বা দলীয় প্রতীকে ভোট না হলেও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোটারদের দলীয় বিবেচনা ঠিকই থাকবে।
এটা ঠিক যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, পারিবারিক পরিচিতি, অতীত কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয়ভাবে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও জনসম্পৃক্ততাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এসব ছাড়িয়ে তার দলীয় পরিচয়ও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেমন প্রধান বিবেচ্য থাকে দলীয় প্রতীক—যে কারণে বড় দলগুলোর প্রার্থীরা স্থানীয়ভাবে কম প্রভাবশালী বা কম জনসম্পৃক্ত হলেও তাদের যেমন শুধুমাত্র দলীয় পরিচয়ের কারণে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেটি অনেক সময় হয় না। কিন্তু তারপরও দলীয় সরকারের অধীনে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও সেখানে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে থাকেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের বড় অংশই এই যুক্তিতে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দেয় যে, তারা ভাবে সরকারি দলের লোক জয়ী হলে এলাকার উন্নয়ন হবে। বিরোধী দল সমর্থিত বা স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হলেও তিনি উন্নয়নের জন্য কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ পাবেন না, উন্নয়ন হবে না—এমন একটি ধারণা জনমনে থাকে। মূলত এই যুক্তিতেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে থাকেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও বা দল থেকে কাউকে মনোনয়ন না দিলেও এটা সত্য যে, দলীয় সমর্থনের বাইরে কারো পক্ষে জয়ী হয়ে আসা কঠিন। যে কারণে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে আরও আগেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। অর্থাৎ প্রার্থীদের পোস্টারে দলের নাম বা প্রতীক না থাকলেও ভোটাররা ঠিকই জানবেন কে কোন দলের প্রার্থী।
একটা সময় পর্যন্ত সমাজের অনেক নির্দলীয় মানুষ—যারা সৎ, যোগ্য এবং ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত, তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়ী হতেন। কিন্তু যখনই স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলীয় প্রতীকে হওয়া শুরু করল, তখন নির্দলীয় ভালো মানুষদের জিতে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তীব্র সমালোচনার মুখে অবশ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় পদ্ধতিতে হচ্ছে। কিন্তু তাতে দলীয় প্রভাব মোটেও কমেনি।
তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপি সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে। কারণ জাতীয় নির্বাচনের পর এই নির্বাচন হবে মাঠপর্যায়ে সরকারের জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের প্রথম বড় পরীক্ষা। যদিও এর আগে আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন হবে। কিন্তু একটি আসনের উপনির্বাচন আর একসঙ্গে সারা দেশের ইউপি নির্বাচনের গুরুত্ব সমান নয়। কেননা স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলের জন্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জনসম্পৃক্ততার একটি বড় পরীক্ষা হবে। বিশেষ করে এই নির্বাচনে সরকার কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারল, সেদিকে দেশের বিরোধীসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন নজর থাকবে, তেমনি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও বন্ধুরাষ্ট্রগুলোরও নজর থাকবে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ যে রাস্তায় নেমেছিল, তার একটি বড় কারণ বছরের পর বছর তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। সুতরাং, সেই অভ্যুত্থানের পরে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি যদি নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে বা অতীতের মতো নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাহলে সেটি বিএনপির জন্য আখেরে কল্যাণ বয়ে আনবে না। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয় সরকারের নিরপেক্ষ থাকা যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তেমনি প্রায় এক বছরে এই সরকার জনগণের কতটুকু আস্থা অর্জন করতে পারল, তারও একটি পরীক্ষা হবে। সে কারণেই ইউপি নির্বাচনের আগে সরকারি দলের এমপিদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে যে, এই বরাদ্দ কেন শুধু সরকারি দলের এমপিরাই পাবেন? কেন বিরোধী এমপিদেরকে বঞ্চিত করা হলো? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, যে বিরোধী দল সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এবং বিভিন্ন দাবিতে লংমার্চের মতো কর্মসূচি দিয়েছে; যারা প্রতিনিয়তই সরকারের ব্যর্থতা ও দলীয়করণের অভিযোগে মুখর থাকে; সবশেষ গত ১৮ অক্টোবর যেখানে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারা আর সরকারকে সহযোগিতা করবেন না—এমন বাস্তবতায় কেন শুধুমাত্র সরকারি দলের এমপিদের জন্য একটা বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে বিরোধী দলের হাতে সমালোচনার আরেকটি অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তর্কের খাতিরে বলা হতে পারে যে, সরকার কোন আসনে কতটুকু বরাদ্দ দেবে, সেই এখতিয়ার তার। আবার সব আসনে সমান বরাদ্দ দেওয়া হবে, এটিও যৌক্তিক নয়। কেননা সব আসনের আয়তন ও জনসংখ্যা যেমন এক নয়, তেমনি সব আসনের সমস্যাও অভিন্ন নয়। একটা ছোট আসনেও অনেক বড় সমস্যা থাকলে সেখানে বেশি বরাদ্দ দিতে হয়। আবার অনেক বড় আসনে খুব বেশি অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন না থাকলে সেখানে সরকার কম বরাদ্দ দেবে—এটিই স্বাভাবিক। ফলে সংসদের সাড়ে তিনশো এমপিকে সরকার সমান বরাদ্দ দেবে বা দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে যদি সরকার এমন কোনো বরাদ্দ দেয়, যার মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, সেটি সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
এটা ঠিক যে, একজন এমপি যে পরিমাণ বরাদ্দ পাবেন, তা দিয়ে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। কিন্তু অর্থের পরিমাণ সামান্য হলেও সমালোচনাটা হবে বড়। তাছাড়া এই অর্থ এমপিরা নিজেদের অভিপ্রায় তথা ইচ্ছামতো খরচ করতে পারবেন। ফলে তিনি এই টাকা দিয়ে রাস্তা বানাবেন নাকি নির্বাচনি খরচ হিসেবে তার আসনের আওতাভুক্ত ইউপি নির্বাচনে দলীয় সমর্থিত প্রার্থীদের দেবেন, সেটি নিশ্চিত নয়। তবে সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে নির্বাচনের আগে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট এমপির মাধ্যমে কিছু উন্নয়নমূলক ও জনপ্রিয় কাজ করে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করবেন। বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবেন।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের চেয়ে ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থানীয় এমপির মাধ্যমে যদি সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা তাদের ইউনিয়নে কয়েক লাখ টাকার একটি দৃশ্যমান প্রকল্পও বাস্তবায়ন করতে পারেন, ভোটের মাঠে সেটির রাজনৈতিক মূল্য অনেক। এর মধ্য দিয়ে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা ভোটারদের এটা বোঝাতে সক্ষম হবেন যে, তিনি জয়ী হলে এলাকার আরও উন্নয়ন হবে। এর মধ্য দিয়ে এমপি এবং সরকারি দলের স্থানীয় প্রার্থীর মধ্যে একটি রাজনৈতিক সম্পর্কও তৈরি হয়। বিশেষ করে যদি এমপি প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করেন, তাহলে সেই প্রার্থী বলতে পারেন যে, তাদের এমপির মাধ্যমে এলাকায় উন্নয়ন হচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও হবে।
তবে সরকার বলতে পারে, ইউপি নির্বাচনের আগেও সরকারি দলের এমপিদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও এটি নির্বাচনি বরাদ্দ নয়, বরং ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা। কেননা অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে প্রান্তিক পর্যায়ে খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি। বিএনপি দায়িত্ব গ্রহণের পরে কিছুটা কাজ শুরু হলেও ব্যাপকভাবে উন্নয়ন কাজ শুরুর মতো অর্থ সরকারের হাতে আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সুতরাং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে প্রান্তিক এলাকার রাস্তা মেরামত, প্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণসহ নানা ধরনের কাজ প্রয়োজন হতে পারে। এই ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে সরকার জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করবে—এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এই বরাদ্দ যদি সরকারি দলের এমপিদের পাশাপাশি বিরোধী দলের এমপিদের দেওয়া হতো, তবে এ নিয়ে বিতর্ক এড়ানো যেত।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক। ইমেইল: aminalrasheed@gmail.com
