স্কুল নম্বর ২৪২১ তৌফিক ইমরোজ খালিদী: যার খবর বদলানো যায় না
“সবকিছু বদলানো যায় না, যেমন সত্য, সুন্দর ও সংবাদ”—ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের নম্বর ২৪২১ থেকে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক হয়ে ওঠার স্মৃতিময় আখ্যান লিখেছেন বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ।
He was a man, take him for all in all,
I shall not look upon his like again.
— উইলিয়াম শেক্সপিয়র, হ্যামলেট
আজ এমন একটা খবর নিয়ে লিখতে বসেছি, যা আমি বদলে দিতে চাই। পারব না জানি, তবু মন মানছে না।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী—আমাদের তৌফিক ভাই, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন। যিনি সারা জীবন খবর দিয়েছেন, আজ তিনিই হয়ে গেছেন একটা বড় খবর।
মডেল স্কুলের সেই সিনিয়র ভাই
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে সবাই একজন সাংবাদিক হিসেবে চেনেন। কিন্তু আমার সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল ভ্রাতৃত্বের। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে তিনি ছিলেন আমার এক বছরের সিনিয়র। মডেল স্কুলের ছাত্ররা একটা পরিচয় সারা জীবন বয়ে বেড়ায়, তা হলো তার ‘স্কুল নম্বর’। এই নম্বর কখনো সে হারায় না, কেউ নিয়েও নিতে পারে না। এখনও স্কুলের পুনর্মিলনীতে খেলাচ্ছলে মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হয়—“স্কুল নম্বর ২৪২১-কে যে খুঁজে আনতে পারবেন (উদাহরণস্বরূপ), তার জন্য রয়েছে একটি মোবাইল ফোন পুরস্কার।” ২৪২১ ছিল তৌফিক ভাইয়ের স্কুল নম্বর। কিন্তু এখন তাকে আর কেউ খুঁজে আনতে পারবেন না।
ঢাকার অন্য একটি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে মডেল স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রথম থেকেই বোঝা গিয়েছিল, এ ছেলে আলাদা। বাংলা ও ইংরেজিতে অসাধারণ দখল, আর অঙ্কে ৯৯ বা ১০০ পাওয়া যেন তার কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার। ১৯৮২ সালে এসএসসিতে সম্মিলিত মেধাতালিকায় তিনি হয়েছিলেন ঊনবিংশতম। তখন মেধাতালিকায় স্থান হতো শীর্ষ কুড়ি জনের। সেই কুড়ির মধ্যে একজন আমাদের তৌফিক ভাই—এ কথা আমরা গর্ব করে বলতাম।
কিন্তু মেধা তার একমাত্র পরিচয় ছিল না।
নজরুল ইসলাম হাউজের কলেজ এল্ডার
মেধার আড়ালে যে মানুষটা ছিলেন, তিনি ছিলেন বিনয়ী, উষ্ণ এবং অপরিসীম সহানুভূতিশীল।
আবাসিক ছাত্রদের স্কুল; হাউজই ছিল ছাত্রদের পরিবার। প্রতিটি হাউজে ছাত্রদের নিয়ে একটি প্রিফেক্টোরিয়াল বোর্ড থাকত, তার সর্বোচ্চ পদটির নাম ‘কলেজ এল্ডার’। তৌফিক ভাই ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম হাউজের কলেজ এল্ডার।
পদ পাওয়া এক কথা, ছাত্রদের মন পাওয়া আরেক কথা। তার নেতৃত্বে ছিল না কোনো হম্বিতম্বি; ছিল দায়িত্ববোধ, ছিল শান্ত অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্ব। জুনিয়ররা তাকে ভয় পেত না, ভরসা করত।
অন্যরকম ভাবার সাহস
এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের পর বুয়েট বা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া তার জন্য কঠিন কিছু ছিল না। আমাদের সমাজে সেটাই কাঙ্ক্ষিত ও নিশ্চিত পথ। কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন অন্যরকম। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে, আর সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করলেন।
এই সিদ্ধান্তটাই বলে দেয়—তৌফিক ভাই কখনো সমাজের চোখে ‘সফল’ হতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন নিজের হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিতে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ভাষার প্রতি এই আকর্ষণই তাকে একদিন সাংবাদিকতার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। ছকে বাঁধা পথে না হাঁটার সেই সাহসই তো পরে তাকে বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা বানাল।
স্বজন হারানোর বেদনা
কয়েক বছর আগে আপন ছোট ভাইকে হারিয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে ক্রমাগত নিঃসঙ্গ হয়েছেন।
অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ছিলেন। মডেল স্কুলের বন্ধুদেরকে আমৃত্যু আপন করে রেখেছিলেন। নিজের অফিসে বা বাসায় মাঝেমধ্যেই বন্ধুদের মিলনমেলার আয়োজন করতেন। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুর বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহত পাইলট আবিদ সুলতান তার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তার আরেক বন্ধু, সিলেটের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, লে. কর্নেল (অব.) মুনীর আহমেদ কাদরী বলছিলেন, “বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আবিদের মৃত্যু তৌফিককেও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। আমাদের তিনজনের অনেক স্মৃতি খানখান হয়ে ভেঙে পড়েছিল।”
সোবহানবাগের দুই ভবন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন সোবহানবাগ অফিসার্স কোয়ার্টারে। তার মা-বাবা দুজনই ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরিজীবী। দুই ছেলে আর এক মেয়েকে তারা উচ্চশিক্ষিত করেছিলেন; আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের মতো মানুষ করেছিলেন। তার ভদ্রতা আর বিনয়ের মধ্যে সেই পারিবারিক শিক্ষার ছাপ আমি সবসময় দেখেছি।
আমিও তখন একই কোয়ার্টারে থাকি। আমার ঠিকানা এক নম্বর ভবন, তার তিন নম্বর—মুখোমুখি। আমি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র। ছুটিতে ঢাকায় এলেই দেখা হতো। সেই দেখাগুলো ছিল ছোট ছোট আলাপে ভরা; সেই আলাপগুলো আজও আমার অমূল্য স্মৃতিসম্পদ। স্কুলের সিনিয়র, কিন্তু তিনি কখনো সিনিয়র হয়ে থাকেননি, স্নেহ দিয়ে কাছে টেনে নিতেন। সোবহানবাগ-শুক্রাবাদ মিলিয়ে আমার ওখানে বেশ কজন পাড়ার বন্ধু ছিল, এখনো আছে; তৌফিক ভাইয়ের ছিল না। উনি মেতে থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রগতিশীল ছাত্র-রাজনীতি এবং সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে।
বর্ষাবরণের মঞ্চ
একটা ঘটনা প্রায়ই মনে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে তিনি আয়োজন করছিলেন বর্ষাবরণ অনুষ্ঠানের। আমাকে ডেকে বললেন, “আমার মঞ্চটা তুমি সাজিয়ে দাও।”
আমার সেদিনই ময়মনসিংহে ফিরতে হবে, না গেলেই নয়। কিন্তু তৌফিক ভাই বলেছেন, কাজটা তো করে দিতে হবে। তার কথায় আবেদন ছিল, সঙ্গে ছিল এমন এক নির্ভরতা, যাকে ফেলা যায় না। আমি গেলাম নিউমার্কেটের পেছনে চারুকলা ইনস্টিটিউটের হোস্টেলে। সেখান থেকে দুই বন্ধুকে নিয়ে হাজির হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, তুলে দিলাম তৌফিক ভাইয়ের হাতে। ওরাই মঞ্চটা সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছিল।
তিনি জানতেন কার কাছ থেকে কীভাবে কাজ আদায় করতে হয়, আর সেটা করতেন ভালোবাসা দিয়ে। তাই তো পরে একটা গোটা নিউজ পরিবার গড়ে তুলতে পেরেছিলেন; তার দল গড়ার প্রথম পাঠ আমি সেদিন পেয়েছিলাম।
খবরের মানুষ
পেশাজীবনে তিনি এলেন সাংবাদিকতায়। কাজ করেছেন দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ডাক এল বিবিসি বাংলা থেকে; সেখানেও সুনামের সঙ্গে কাজ করলেন। তারপর দেশে ফিরে গড়লেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম—বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন পত্রিকা, যা আজ দেশের সর্ববৃহৎ অনলাইন নিউজ পোর্টাল। তিনি আগেভাগেই বুঝে ফেলেছিলেন যে প্রযুক্তির রূপান্তর ঘটছে, ভবিষ্যৎ হতে যাচ্ছে ডিজিটাল; আর সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি তিনি গড়ে দিয়েছেন। ২০১৭ সালে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উন্নয়নে বিশেষ স্বীকৃতি ও সম্মাননা হিসেবে জাতীয় আইসিটি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
২০০৮ সালে দেশের একটি শীর্ষ পত্রিকা যখন স্লোগান তুলল ‘বদলে যাও, বদলে দাও’, তখন তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে বললেন, “সবকিছু বদলানো যায় না, যেমন নিউজ।”
সংবাদের সততার প্রতি এই অবিচল আস্থাই ছিল তার সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র।
যে চিহ্ন রয়ে গেল বুকে
গত পহেলা বৈশাখে তার বাসায় দাওয়াত ছিল। বিকেলের দিকে গেলাম। আগের মতোই উষ্ণ অভ্যর্থনা। দেশের কত বিশিষ্ট জনের উপস্থিতিতে মুখরিত তার ঘর। নিজে থেকে সকলের আপ্যায়ন করছিলেন। নতুন বছরের প্রথম দিনেই যে তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হবে, তা কে জানত!
কিছুদিন আগে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি টাঙানো নিয়ে যা ঘটেছিল, তা নিয়ে আমি একটা ছোট্ট ভিডিও নির্মাণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলাম এবং সেটা তৌফিক ভাইয়ের ফোন নম্বরে শেয়ার করেছিলাম। তিনি অনতিবিলম্বে ভালোবাসার ইমোজি দিয়ে রেসপন্স করেছিলেন। সেটাই আমার কাছে তার পক্ষ থেকে সর্বশেষ সাড়া। তারপরও কয়েক দিন মেসেজ পাঠিয়েছি, কিন্তু তিনি আর সাড়া দেননি। আর কোনো দিন সাড়া দেবেন না। ওই লাল টকটকে ইমোজিটা আমার বুকে রয়ে গেল তার ভালোবাসার শেষ চিহ্ন হয়ে।
যে খবর বদলায় না
তৌফিক ভাই নেই। আমার মতো অনেকেই এই খবরটা বদলাতে চাইবেন, কেউই পারবেন না।
তবু আমি জানি, মডেল স্কুলের খাতায় ২৪২১ নম্বরটি থেকে যাবে। নজরুল ইসলাম হাউজের স্মৃতিতে, সোবহানবাগ কোয়ার্টারের দুই ভবনের মাঝখানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়াঢাকা পথে, মিছিলে-মিটিংয়ে আর সত্য সংবাদের সামনে-পেছনে তিনি থাকবেন।
এই খবরও কোনো দিন বদলাবে না।
