০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নাভি পিল্লাই: গণহত্যার বিচার ও দায়মুক্তির রাজনীতি

নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয়, রুয়ান্ডার আকায়েসু মামলার দৃষ্টান্ত এবং একাত্তরের গণহত্যার দায়মুক্তির রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ।

নাভি পিল্লাই: গণহত্যার বিচার ও দায়মুক্তির রাজনীতি

১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক আকায়েসু রায়ের অন্যতম বিচারক নাভি পিল্লাই; যা আন্তর্জাতিক আদালতে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অংশ হিসেবে প্রথম সাব্যস্ত করেছিল। ছবি রয়টার্স

লুবনা ফেরদৌসী লুবনা ফেরদৌসী

Published : 09 Oct 2026, 09:54 PM

Updated : 09 Oct 2026, 09:54 PM

যুদ্ধ থেমে গেলেই কি শান্তি ফিরে আসে? কখনো যুদ্ধ শেষ হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, অথচ ক্ষমতার রাজনীতি তার পরিণতি বাঁচিয়ে রাখে ইতিহাসের বিকৃতিতে, অপরাধীর দায়মুক্তিতে এবং ভুক্তভোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া নীরবতায়। শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি যাচাই করতে তাই একটি প্রশ্ন জরুরি: সত্য বললে এখনো কার বিপদ হয়?

যার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে, যার শরীর ও জীবন নির্যাতনের সাক্ষ্য বহন করছে, অথচ অপরাধী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক মিত্রতার সুরক্ষায় নিরাপদ—তার কাছে আমরা কোন শান্তির কথা বলছি? বন্দুকের শব্দ না শোনাকে? নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলার বাধ্যবাধকতাকে? অপরাধীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, কিন্তু সাক্ষীর নিরাপত্তা অনিশ্চিত হলে সংঘর্ষ থামলেও অন্যায়ের কর্তৃত্ব শেষ হয় না।

নাভি পিল্লাইয়ের ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার এই প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনজ্ঞের দীর্ঘ কর্মজীবন মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। নোবেল কমিটি বিশেষভাবে তুলে ধরেছে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা। এই স্বীকৃতির রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, শান্তির আলোচনায় ক্ষমতার জবাবদিহিকে কেন্দ্রে আনা।

শান্তি কূটনৈতিক সমঝোতা বা সংঘর্ষবিরতির বিষয় যেমন, তেমনি এটি একটি রাজনৈতিক এবং নৈতিক প্রশ্নও। সংঘর্ষের অবসান ঘটলেও অন্যায়ের অবসান ঘটে না, যদি ক্ষমতা জবাবদিহির বাইরে থাকে, অপরাধের সত্য স্বীকৃতি না পায় এবং ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হয়। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে, অথচ যাদের প্রতিনিধিত্বের দাবি তারা করেন, সেই মানুষগুলো অনিরাপদ থেকে যেতে পারেন।

খবরটি আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে, কারণ আমার বর্তমান গবেষণাগুলোর একটি ১৯৭১ সালের গণহত্যা, গণহত্যা অস্বীকারের রাজনীতি এবং তার সমকালীন রাজনৈতিক উত্তরজীবন নিয়ে। এই কাজ বারবার ভাবায়, সহিংসতার পর তার অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকে। কী ঘটেছিল, কাকে লক্ষ্য করে ঘটেছিল, কার নির্দেশে ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর বদলে দিতে পারলে অপরাধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও বদলে দেওয়া যায়।

গণহত্যা মানুষের জীবন ধ্বংস করে; পরবর্তী প্রজন্মকে সেই মৃত্যুর স্বীকৃতি নিয়েও লড়তে হয়। কখনো নিহত মানুষের পরিচয় মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়, কখনো অপরাধের উদ্দেশ্য অস্বীকার করা হয়, কখনো আবার অপরাধীকে দেশপ্রেমিক হিসেবে হাজির করা হয়। ভুক্তভোগীর স্মৃতি তখন রাজনৈতিক সমঝোতার পথে অসুবিধা হয়ে দাঁড়ায়। অতীতের বিবরণ নিয়ন্ত্রণ করে বর্তমানের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলে।

ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা, নতুন প্রমাণ খোঁজা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা সংশোধন করা গবেষণার প্রয়োজনীয় কাজ। কিন্তু প্রমাণের মোকাবিলা না করে অপরাধ অস্বীকার করা, দায় আড়াল করা এবং সাক্ষীকে অবিশ্বাস্য বানানোর চেষ্টা ভিন্ন বিষয়। সেখানে সংশয়ের ভাষা ব্যবহার করে দায়মুক্তির রাজনীতি করা হয়। এর ফল শুধু ভুল ইতিহাস নয়; কার ক্ষতি স্বীকৃতি পাবে এবং কারা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ফিরে পাবেন, সেটিও নির্ধারিত হয়।

সহিংসতার ইতিহাস পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়, নিহত মানুষের সংখ্যা জানা জরুরি। সংখ্যা অপরাধের ব্যাপ্তি বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু সংখ্যার মধ্যে তাদের জীবন হারিয়ে গেলে আমাদের বোঝাপড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার, অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকা মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা আছে। তারা শুধু সহানুভূতি চান না; সত্যের স্বীকৃতি ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিও চান। এগুলো করুণা নয়, অধিকার।

পিল্লাইয়ের বিচারিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আকায়েসু মামলায় তিনি ছিলেন তিন সদস্যের বিচারক প্যানেলে। সেই মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার প্রথম দণ্ডাদেশ আসে। রায়টি আরও প্রতিষ্ঠা করে, কোনো সুরক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাও গণহত্যার অংশ হতে পারে।

এই স্বীকৃতির তাৎপর্য আইনি এবং গভীরভাবে রাজনৈতিক। যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতাকে প্রায়ই যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা হয়েছে। যেন যুদ্ধ পুরুষেরা করে, আর নারীর শরীর তার মূল্য পরিশোধ করে। এই ধারণা অপরাধকে স্বাভাবিক করে এবং কে ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে, কে প্রতিরোধ করতে পারত—সেই প্রশ্নগুলো আড়াল করে। নির্যাতিত মানুষকে লজ্জা বহন করতে হয়, অথচ অপরাধীর দায় অদৃশ্য থাকে।

আকায়েসু রায় সেই দায় সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তৈরি করেছিল। যৌন সহিংসতাকে একটি জনগোষ্ঠীর ধ্বংসের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিচারিক অনুসন্ধানের আওতায় আনা সম্ভব হয়। নির্যাতিত মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ এখানেই ক্ষমতার আড়ালে থাকা দায় অনুসন্ধান করা।

১৯৭১ সালের ইতিহাসের সঙ্গে এই প্রশ্নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যৌন সহিংসতা ক্ষমতা, আধিপত্য এবং একটি জনগোষ্ঠীকে দমন করার বৃহত্তর সহিংসতার ইতিহাসের অংশ। তাকে ব্যক্তিগত নির্যাতন কিংবা নির্যাতিত নারীর কথিত লজ্জায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। আমার গবেষণার একটি উদ্বেগ হলো, অস্বীকার ও রাজনৈতিক পুনর্বয়ান কীভাবে এসব অভিজ্ঞতাকে খাটো করে, অথচ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করে।

নির্যাতিত নারীর অভিজ্ঞতাকে সম্মান দিতে যে সমাজ দ্বিধাগ্রস্ত, অথচ অপরাধীর রাজনৈতিক পুনর্বাসনে উদার, তাকে নিজের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। আনুষ্ঠানিক সম্মান যথেষ্ট নয়, যদি তাদের কণ্ঠ, নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়ার দাবি প্রান্তে থেকে যায়। স্মৃতির মঞ্চে জায়গা দেওয়া আর ন্যায়বিচারের দাবিতে পাশে দাঁড়ানো এক কথা নয়।

শান্তির সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক এখানেই। অস্ত্রের শব্দ থামলেও ভয় থেকে যেতে পারে। জবাবদিহি না থাকলে মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করবেন যে একই সহিংসতা আবার ঘটবে না? রাষ্ট্র স্বাভাবিকতা ফেরার ঘোষণা দিতে পারে, অথচ সাক্ষী নিরাপদে কথা বলতে পারেন না। তখন জানতে হবে, কার জীবন স্বাভাবিক হয়েছে?

আদালতের একটি রায় নিহত মানুষকে ফিরিয়ে আনে না, সব ক্ষত সারায় না এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা আঘাতের অবসান ঘটায় না। তবু ন্যায্য বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে অপরাধকে সুবিধাজনক ইতিহাসের ব্যাখ্যায় বিলীন করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামরিক পদমর্যাদা, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা দায়মুক্তির সনদ নয়। নির্যাতিত মানুষের কাছে বিচার এই স্বীকৃতিও পৌঁছে দিতে পারে যে অন্যায়টি তার ওপর হয়েছে; তার দায় তার নয়।

আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকেও এই বিশ্বাসের যোগ্য হতে হবে। দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য এক নিয়ম, শক্তিশালী রাষ্ট্র ও তার মিত্রের জন্য আরেক নিয়ম হলে আইনের সর্বজনীনতার দাবি টেকে না। যে রাষ্ট্র প্রতিপক্ষের জবাবদিহি চায়, তাকে নিজের এবং নিজের মিত্রের বিরুদ্ধে তদন্তও মেনে নিতে হবে। ভুক্তভোগীর জাতীয়তা এবং অপরাধীর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিচার পাওয়ার প্রয়োজন বদলে দিতে পারে না।

একই সঙ্গে বিচার হতে হবে প্রমাণনির্ভর, স্বাধীন ও ন্যায্য। আকায়েসু মামলাতেও দণ্ডাদেশের পাশাপাশি কিছু অভিযোগে খালাস দেওয়া হয়েছিল। অপরাধের ভয়াবহতা বিচারপ্রক্রিয়ার মানদণ্ড শিথিল করার অনুমতি দেয় না। বিচার দাবি করা এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচারের অধিকার রক্ষা করা পরস্পরবিরোধী দায়িত্ব নয়। রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে কোনটি মানা হবে, তা নির্ধারণ করা যায় না।

আমাদের উপমহাদেশে ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি বিপদ হলো, জবাবদিহির দাবিকে প্রতিহিংসা এবং দায়মুক্তিকে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন হিসেবে হাজির করা। কিন্তু সেই ঐক্যের মূল্য দিচ্ছেন কে? ভুক্তভোগী সাক্ষ্য ছেড়ে দেবেন, আর প্রভাবশালী মানুষ রাজনৈতিক মর্যাদা ফিরে পাবেন—এমন সমঝোতা ক্ষমতার পুরোনো ভারসাম্যই রক্ষা করে। পুনর্মিলনের জন্য সত্য, স্বীকৃতি ও প্রতিকারের জায়গা প্রয়োজন। আক্রান্ত মানুষকে আলোচনা থেকে সরিয়ে দিয়ে সেই কাজ হয় না।

পিল্লাইয়ের কাজের প্রতি আমার শ্রদ্ধার জায়গা হলো, তিনি এমন একটি আইনি পরিসর তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, যেখানে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানের ভাষ্যের পাশাপাশি নির্যাতিত মানুষের অভিজ্ঞতাও বিচারিক সত্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব পেতে পারে। তাকে আন্তরিক অভিনন্দন।

এই স্বীকৃতি উদ‌যাপনের অর্থবহ উপায় নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকেও একই পরীক্ষার মুখোমুখি করা। প্রমাণ আমাদের পছন্দের নেতা বা মিত্রের দিকে পৌঁছালেও কি আমরা তদন্ত চাইব? আমরা কি গণহত্যার বিরোধিতা করি, নাকি শুধু সেই গণহত্যার, যার অপরাধী আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ? নীতিগতভাবে ন্যায়বিচার সমর্থনের চেয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া কঠিন।

যুদ্ধের সমাপ্তি রাষ্ট্র ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সেই সিদ্ধান্তে নিহত মানুষের ইতিহাস, বেঁচে থাকা মানুষের সাক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সত্য জানার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীকে দায়মুক্তি দিয়ে ভুক্তভোগীকে শান্ত থাকতে বলা ক্ষমতাবানের জন্য সুবিধাজনক। সেই সুবিধাকে শান্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়াও ন্যায়বিচারের সংগ্রামের অংশ।

ড. লুবনা ফেরদৌসী: যুক্তরাজ্য প্রবাসী শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিশ্লেষক। ই-মেইল: lferdowsi@yahoo.com