ইতিহাসই বাঁচিয়ে রাখবে কুমুদিনী হাজংকে

তার বাবা অতিথ চন্দ্র ছিলেন হাতিখেদা বিদ্রোহের কর্মী। বাবার ভেতরের সেই বিদ্রোহের আগুন কুমুদিনীর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল।

সালেক খোকনসালেক খোকন
Published : 23 March 2024, 06:42 PM
Updated : 23 March 2024, 06:42 PM

তার চোখ দুটি বারবার দেখছিলাম। বিপ্লবী বলেই হয়তো আগ্রহটা ছিল। শতবর্ষী নারী তখন তিনি। মুখমণ্ডলের চামড়া ভাঁজখাওয়া। চামড়ার পরতে পরতে যেন ইতিহাস লুকানো। সে ইতিহাস প্রতিবাদ, বিপ্লব আর কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের। কুমুদিনী হাজং নামটাই জানতাম। কিন্তু নানা কথা বলে সেদিন জেনেছিলাম তার আরেক নাম ‘সরস্বতী’।

কয়েক বছর আগে পুরো একটি দিন কাটে তার বাড়িতে, নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় সোমেশ্বরী নদীর পশ্চিম তীরে বহেরাতলী গ্রামে। ‘বিদ্রোহ-সংগ্রামে আদিবাসী’ নামক বইয়ের কাজের তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনেই তার কাছে ছুটে যাওয়া।

আলাপচারিতার শুরুটা হয় তার পরিবার নিয়ে।

বহেরাতলী গ্রামের এক কৃষক হাজং পরিবারে কুমুদিনী হাজংয়ের জন্ম। তার বাবা অতিথ চন্দ্র ছিলেন হাতিখেদা বিদ্রোহের কর্মী। বাবার ভেতরের সেই বিদ্রোহের আগুন কুমুদিনীর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। জন্মের দুই বছরের মধ্যেই বাবা অতিথ চন্দ্র ও মা জনুমণি হাজং মারা যান। চিরকুমার এক মামার আদর-যত্নেই বড় হন কুমুদিনী। পরে তার মামা মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে মাইঝপাড়া গ্রামের দুর্গাদাস হাজংয়ের ছোট ছেলে লংকেশ্বর হাজংয়ের সঙ্গে কুমুদিনীকে বিয়ে দেন। বিয়ের পরে কুমুদিনীর বাবার রেখে যাওয়া চার আড়া জমি ও বাড়ি বুঝিয়ে দিয়ে লংকেশ্বর হাজংকে ঘরজামাই করে নেওয়া হয়। ফলে লংকেশ্বর তখন তার পুরো পরিবার নিয়ে কুমুদিনীদের বাড়িতেই চলে আসেন। টংক আন্দোলন শুরু হলে অন্যান্য হাজং পরিবারের মতো কুমুদিনীদের পরিবারও টংক প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তার স্বামী ও চার ভাই নিয়মিত আন্দোলনের সাংগঠনিক কাজে অংশ নিতেন। কমরেড মণি সিংহের সঙ্গেও তাদের ছিল নিবিড় যোগাযোগ। এ সব কারণেই জমিদার ও ব্রিটিশ বাহিনীর রোষানল ছিল পরিবারটির প্রতি।

টংক আন্দোলনটা আসলে কি?

জানা যায়, ‘টংক’ মানে ধান কড়ারি খাজনা। জমিতে ফসল হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান খাজনা হিসেবে দিতেই হবে। ‘টংক’ স্থানীয় নাম। এই প্রথা চুক্তিবর্গা, ফুরন প্রভৃতি নামে ওই সময় বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত ছিল। সেই সময়কার ময়মনসিংহ জেলার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী, শ্রীবর্দী থানায় বিশেষ করে সুসং জমিদারি এলাকায় এর প্রচলন ছিল ব্যাপক।

টংকব্যবস্থায় সোয়া একর জমির জন্য বছরে ধান দিতে হতো সাত থেকে পনেরো মণ। ধানের দর হিসেবে প্রতি সোয়া একরে বাড়তি খাজনা দিতে হতো এগারো থেকে সতেরো টাকা, যা ছিল এক জঘন্যতম সামন্ততান্ত্রিক শোষণ। এ ছাড়া টংক জমির ওপরও কৃষকদের কোনো মালিকানা ছিল না। ফলে এই শোষণের বিরুদ্ধেই ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে কৃষকরা। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সুসং-দুর্গাপুরের জমিদার সন্তান কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ।

টংক আন্দোলন তখন পুরোদমে চলছে । আন্দোলনকারীদের দমাতে ময়মনসিংহ থেকে সশস্ত্র পুলিশ দল আসে দুর্গাপুরে। বিরিশিরিতে তারা একটি সশস্ত্র ঘাঁটি গড়ে। গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে সঙ্গে থাকে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও। এরপরই ঘটে কুমুদিনীকে ঘিরে রক্তাক্ত একটি ঘটনা।

কী ঘটেছিল ওই দিনটিতে?

সুসং-দুর্গাপুরের অপর পাড়ে বহেরাতলী গ্রাম। ওই গ্রামেই মান্দি (গারো) ও হাজংদের বাস। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি। দুপুর বেলা। পঁচিশজনের পুলিশ দল ওই গ্রামে প্রবেশ করে। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে মা-বোনদের ওপর নির্যাতন চালায়। এ সময় পুলিশ কৃষক-বধূ কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে যায়। লাঞ্ছিত কুমুদিনীর চিৎকার তখন চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয়। বহেরাতলীর পাশের গ্রাম হাজং মাতা খ্যাত রাশিমণির সশস্ত্র প্রচার দল বিশ্রাম নিচ্ছিল। কুমুদিনীর চিৎকারে তারা সচকিত হয়ে ওঠে। রাশিমণির অন্তরে তখন জ্বলে উঠে প্রতিহিংসার আগুন। তিনি নিঃশব্দে তুলে নেন তার রক্তপতাকা আর চিরসঙ্গী হাতিয়ার বড় দা-খানি। ৩৫ জন বীর নিয়ে রাশিমণি হাজংকন্যা কুমুদিনীকে পুলিশের অত্যাচার থেকে বাঁচানোর জন্য ছুটে আসেন। সবার সামনে থেকে পুলিশের ওপর প্রাণপণে দা চালাচ্ছিলেন রাশিমণি আর পাশে দাঁড়িয়ে বর্শা চালান তারই সাথী সুরেন্দ্র হাজং।

যে পুলিশটি হাজংকন্যা কুমুদিনীর ওপর অত্যাচার করেছিল, রাশিমণি তাকে খুঁজে পেয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে দায়ের এক কোপ বসিয়ে দেন। ফলে তার মুণ্ডু দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আরেক পুলিশ এগিয়ে এলে সেও দায়ের আঘাতে ধরাশায়ী হয়। হাজং মায়ের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে পুলিশ দল ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে উন্মত্তের মতো গুলিবর্ষণ করতে থাকে। ফলে দশটি বুলেটে রাশিমণির দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়। যুদ্ধ করতে করতেই তার প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। যুদ্ধরত সুরেন্দ্র তার বর্শা দিয়ে রাশিমণির হত্যাকারী পুলিশটির বুকে বর্শা নিক্ষেপ করেন। কিন্তু তার আগেই পুলিশের ছোঁড়া একটি বুলেট সুরেন্দ্রের বুকে বিদ্ধ হয়। ফলে তার দেহও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা চলে যুদ্ধ। খবর পেয়ে কয়েক গ্রামের যুবকরা তাদের অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে দৌড়ে আসে। তারা পুলিশের দিকে বল্লম ছুঁড়তে থাকে। সশস্ত্র পুলিশ তখন নদীর দিকে সরে এলেও দুজন আলাদাভাবে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হয়। সেখানে কিছু ঝোপঝাড় থাকায় বরাক বাঁশের বেড়ায় আটকে পড়ে তারা। ফলে হাজংদের বল্লমের আঘাতে ওখানেই মারা পড়ে তারা।

ওইদিন হাজংচাষি ও পুলিশের রক্তে সোমেশ্বরী নদীর বালুকাময় তীরভূমি রক্তে রঞ্জিত হয়। পুলিশদের মধ্যে দুজন নিহতসহ ১৫ জন আহত হয়। আর বিদ্রোহীদের মধ্যে হাজং মাতা রাশিমণি ও হাজংদের বীর সন্তান সুরেন্দ্র প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শহীদ হন। এই আন্দোলন যাকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র হয়ে উঠেছিল, তিনিই কুমুদিনী হাজং। টংক আন্দোলনে যুক্ত হতে তার কোনো প্রস্তুতি বা আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন পড়েনি। ঘটনার পরম্পরা তাকে আন্দোলনে শরিক করেছে। ইতিহাসের অনিবার্যতা তাকে জুগিয়েছে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। আর আন্দোলনে রাশিমণি ও সুরেন্দ্রের মতো শ্রেষ্ঠ হাজং বীরদের আদর্শ এবং আত্ম-বলিদানের ফলেই পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টংকবিরোধী হাজং বিদ্রোহ আরও ব্যাপক আকারে, আরও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল।

এ ঘটনায় বাংলা তথা ভারতের কৃষক-সংগ্রামে নতুন প্রাণসঞ্চার করে। তারই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পরে টংক প্রথার উচ্ছেদের জন্য শহীদ হন হাজংচাষিদের বীরকন্যা রেবতী, শঙ্খমণিসহ প্রায় দেড়শ হাজং বীর সন্তান। যার ফলে এক সময় পূর্ববাংলার গ্রামাঞ্চল থেকে টংক প্রথার অবসান ঘটে।

হাজংদের বীর মাতা রাশিমণির ওইদিনের বীরত্বের কাহিনী ও টংক আন্দোলনের ইতিহাস জানাতে বহেরাতলীতে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে হাজংমাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। যার সঙ্গে মিশে আছে কুমুদিনী হাজংয়ের নামটিও।

কুমুদিনী হাজং বারবার বলছিলেন নতুন প্রজন্মের কাছে টংক আন্দোলনটির কথা তুলে ধরার জন্য। কেননা এ প্রজন্মের অনেকেই জানে না সে ইতিহাসটি। সরকারিভাবে এ আন্দোলনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ ও প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার কোনো চেষ্টাই হয়নি কখনো। তবুও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে কুমুদিনী হাজং ছিলেন বিপ্লবের প্রতীক হয়েই।

২৩ মার্চ দুপুরেই শুনলাম বিপ্লবী কুমুদিনী হাজংয়ের প্রস্থানের খবরটি। নেত্রকোণার দুর্গাপুরের বহেরাতলীতে নিজ বাড়িতেই তিনি পরলোকগমণ করেন। কিন্তু কুমুদিনী হাজংয়ের মতো বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। সকল অন্যায়, প্রতিবাদ ও সংগ্রামের প্রেরণা হয়েই থাকবেন তিনি। ইতিহাসই বাঁচিয়ে রাখবে কুমুদিনী হাজংকে।

এই বিপ্লবীর প্রতি রইল শ্রদ্ধা।