অনুঘটক আবিষ্কার পেল রসায়নের নোবেল 

শুভংকর বিশ্বাস
Published : 7 Oct 2021, 12:27 PM
Updated : 7 Oct 2021, 12:27 PM

দুই দশক আগে ২০০০ সালে অপ্রতিসম জৈবঅনুঘটক (asymmetric organocatalytic) আবিষ্কারের জন্য ২০২১ সালে রসায়নে যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন জার্মান বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন লিস্ট মার্কিন বিজ্ঞানী ডেভিড ম্যাকমিলান। তাদের এই অসামান্য আবিষ্কার বিজ্ঞানের নানাবিধ দিকে সাহায্য করছে। সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চের ক্ষেত্রে, সাথে এই অনুঘটকটি গাড়ির নির্গত ধোঁয়াকেও পরিচ্ছন্ন করতে সাহায্য করে। তাদের এই আবিষ্কারের আগে বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, কার্যপ্রণালী অনুযায়ী সর্বমোট মাত্র দুই প্রকার প্রভাবক বা অনুঘটক আছেএনজাইম ও মেটালিক। বিজ্ঞানী লিস্ট ম্যাকমিলান আলাদা আলাদা গবেষণায় প্রমাণ করেন, এই দুই প্রকার অনুঘটকের বাইরেও এক প্রকার অনুঘক তৈরি করা সম্ভব, আর তা হলো অপ্রতিসম জৈবঅনুঘটক যা তাদেরকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছে। 

প্রফেসর বেঞ্জামিন লিস্ট জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইন্সটিটিউট ফর কোল রিসার্চের পরিচালক। আর প্রফেসর ডেভিড ম্যাকমিলান আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রসায়ন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান। 

রসায়নসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে প্রতিবছর অনেকজন নোবেল পেলেও এই পুরস্কারটি আমার কাছে একটু অন্যরকম। এজন্য না যে, আমি রসায়নে স্নাতক স্নাতকোত্তর করেছি। আবার এজন্যও না যে, ম্যাক্স প্লাংক ইন্সটিটিউট থেকে দুইবার একটুর জন্য পিএইচডির স্কলারশিপটি বাগাতে পারিনি। বরং এই ক্যাটালাইসিস বা প্রভাবক নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পাওয়ার জন্যই আমাকে লেখার জন্য এত আগ্রহী করে তুলেছে। 

আমি এখন বন্ধুর সংখ্যা কাটছাঁট করে অনেক সীমিত করেছি, অথবা বন্ধুরাই আমাকে কাটছাঁট করে আমাকে সীমিত করেছে। যাই হোক না কেন, এই পরিশিষ্ট বন্ধুরা আমার সাথে ঘরোয়া আড্ডায় বা ফোনে প্রায়ই একটা কথা শুনতে পায়, তা হলো অস্ট্রেলিয়া কেন কয়লার পরিবেশবান্ধব ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছে না? আমার ফেইসবুকের বেশ কয়েকটি লেখায়ও এই বিষয়টি আমি তীব্র ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছি। দাওয়াতে আড্ডার সময় অনেকে এটা খাওয়ার পর পরদেশের নিন্দার অংশ হিসেবে ধরে নেয়, আবার অনেকের অ্যান্টেনারপর দিয়ে চলে যায়। ভাগ্য ভালো, আমার স্ত্রীর সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করে বেশ কিছুদূর এগোতে পারি। জানিনা সে আমাকে খুশি করার জন্য আমার সাথে এই আলোচনায় সঙ্গ দেয় কিনা! তবে ভালো লাগে এই ভেবে যে, সে বিষয়গুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। যদিও তার অনুযোগ, এই খটমট বিষয় নিয়ে আমি কেন আলোচনা বা লেখালিখি করি

যাকগে, আলোচনার কান ধরে টেনে লম্বা না করে সংক্ষেপে আমার মুল বক্তব্য তুলে ধরি। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পিএইচডি শেষের দিকে থিসিস জমা দেওয়ার আগে হন্যে হয়ে চাকরিবাকরি খুঁজছি। গবেষণার চাকরি না, মাইনিং ইন্ডাস্ট্রির চাকরি। গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ায় খুব একটা ভবিষ্যত নেই। সরকার হোমিওপ্যাথি ওষুধের মতো দু-চার ফোঁটা গবেষণায় বরাদ্দ দেয় বটে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি নগণ্য। ফান্ডের জন্য অনেক গবেষক জিহ্বা বের করে রাখলেও কার জিহ্বায় যে ফোটা পড়ে, বোঝা বড় দায়। এখানে কারিগরি শিক্ষার দাম পিএইচডির চেয়ে ঢের বেশি। তাছাড়া আমার গবেষণার যে বিষয়, তার ফল সবটুকুই অস্ট্রেলিয়ার খনি মালিকেরা চেটেপুটে খাবে, জ্ঞানবিজ্ঞানের পাতে তাতে কিছু পড়তো বলে মনে হয় না। অবশ্য ভাগ্য সহায় ছিল। আমার পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক একটা কলয়ার খনি কোম্পানির কাছ থেকে গবেষনা কাম পরামর্শের জন্য কিছু ফান্ড পেলে আমাকে সহকারী পরামর্শক হিসেবে ওই প্রজেক্টে নিয়োগ দেয় কিছু সময়ের জন্য। ওই খনি কোম্পানি ড্রাম ড্রাম ধরে অনেক কয়লা পাঠাতে লাগলো আমাদের রিসার্চ সেন্টারে। এর একটা অংশ আমাকে পাশের ল্যাবে আরেকজন জার্মান গবেষকের কাছে পাঠাতে হতো। তিনি আমাদের সেন্টারে কিছুদিন পোস্টডক করে এখন আরেক প্রফেসরের সাথে কাজ করেন। কয়লা নিয়ে তার এই গবেষণাটি আমাকে খুব আগ্রহী করে তুলেছিল। প্রায়ই আমি তার সাথে তার এই গবেষণার খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করতাম। তিনি কয়লা পোড়ানোর পর যে ধোঁয়া হয়, তা থেকে কার্বনসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বস্তুকণা পৃথক করে আলাদা করার জন্য এক প্রকার হেটারোজিনিয়াস ক্যাটালাইসিস বা প্রভাবক তৈরি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, যাতে কয়লার দহনে সৃষ্ট ধোঁয়া পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে না পারে। 

আমাকে বিষয়টি তখন এত বেশি আগ্রহী করে তুলেছিল যে, আমি পেটেভাতে খাওয়ার টাকা পেলেই ওই প্রজেক্টের গবেষণায় লেগে যাবএই প্রতিশ্রুতি দিয়েও প্রজেক্ট ডিরেক্টরের কাছ থেকে কাজের অনুমতি পাইনি। তখন আমি কিন্তু প্রফেসর বেঞ্জামিন লিস্ট বা ম্যাকমিলানদের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানি না। মাথায় শুধু এটুকু ঘুরপাক খেতো যে, যদি সত্যিই এমন একটা ডিভাইস (প্রভাবক বা অনুঘটক) আবিষ্কার করতে পারি, যা কয়লা দহনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর বস্তুকণা পৃথক করে পরিবেশকে দূষনমুক্ত রাখবে, তাহলে একজন ক্ষুদ্র গবেষক হিসেবে এটা হতো আমার চরম সফলতা। তার পরবর্তী ধাপে এটাও চেষ্টা করতাম, যাতে কয়লার মতো ফসিল ফুয়েল দহনের ফলে যে কার্বনডাইঅক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়, নির্গমন নলে এটাতেও কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে অক্সিজেনে রূপান্তরিত করবো। এতে করে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে নিজেকে উৎসর্গ করার সুযোগ পেতাম। 

তাছাড়া পৃথিবীর চারিদিকে যেভাবে পরিবেশ রক্ষায় ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে, কিছুদিন পর এমনিতেই অস্ট্রেলিয়ার কয়লা রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে যা দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের একটা অন্যতম প্রধান উৎস, যার বাৎসরিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থনৈতিক বিষয়টিতে ও অস্ট্রেলিয়াকে সাহায্য করতে পারতাম। আমার মনে হয় না, একজন গবেষকের এর থেকে বেশি কিছু চাওয়ার থাকে। 

পরিশেষে, প্রফেসর বেঞ্জামিন লিস্ট প্রফেসর ডেভিড ম্যাকমিলানকে অভিনন্দন জানিয়ে পাঠক বন্ধুদের কাছে উপরে বর্ণিত দুইটি গবেষণা প্রশ্ন রেখে শেষ করছি। আমি বিশ্বাস করি কেউ না কেউ একদিন এই আপাত অসম্ভব বিষয়টিকে সম্ভবে পরিণত করবে, যা পৃথিবীকে করবে আরও সবুজ, পরবর্তি বংশধরদের জন্য গড়ে তুলবে আবাসযোগ্য ভূমি। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক