স্বাস্থ্যখাত: ‘যেদিকে তাকাই, সেদিকেই দেখি শুধু চাটার দল’

চিররঞ্জন সরকারচিররঞ্জন সরকার
Published : 2 June 2021, 04:03 PM
Updated : 2 June 2021, 04:03 PM

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'যেদিকে তাকাই, সেদিকেই দেখি শুধু চাটার দল'। এ 'চাটার দল' গত পঞ্চাশ বছরে আরও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। সবখানে তাদের দৌরাত্ম্য। এ 'চাটার দলে'র কারণে আমাদের দেশে সরকারি কেনাকাটা মানেই হচ্ছে দুর্নীতির মহোৎসব। দশ টাকার জিনিস হাজার টাকা দিয়ে কেনা। আগে এ ধরনের চুরিকে বলা হতো 'পুকুরচুরি'। এখন 'সাগরচুরি' বলা হচ্ছে। সরকারি কেনাকাটায় 'সাগরচুরি' কিছুতেই থামছে না। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরের কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বল্গাহীনভাবে দুর্নীতি করছেন পণ্য কেনাকাটায়। কোনো রকম নিয়ম না মেনে কিংবা নিয়মের ফাঁকফোকর গলিয়ে তারা নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে বাজার মূল্যের চেয়ে উচ্চ মূল্যে কেনাকাটা করে নিজেদের পকেট ভারী করছেন। 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি বালিশ কেনায় হাজার টাকা খরচ কাগজেকলমে দেখানো, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি পর্দা কিনতে ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানোর ঘটনাগুলো উদঘাটনের পর ধারণা করা হয়েছিল, এ ধরনের ঘটনা হয়তো কমবে। কিন্তু আমাদের এই 'সব সম্ভবের দেশে' মহামারীকালেও যাবতীয় সরকারি কেনাকাাটকে মহোৎসবে পরিণত করা হয়েছে। 

দুর্নীতি আগেও ছিল, কিন্তু এখন তা সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। লুটপাটের মানসিকতা কতটা বেপরোয়া হলে কেউ ২৫০ টাকার জিনিস ২৫ হাজার টাকায় কিনতে পারে? ভাইরাস ছত্রাকের আক্রমণ শনাক্তে রোগীর মস্তিষ্কের রস সংগ্রহে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের এক সুঁই যার প্রতিটির মূল্য ২৫০ টাকা, অথচ  সুঁই প্রতিটি ২৫ হাজার টাকায় কিনেছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিষ্ঠান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অস্ত্রোপচারের সময় চামড়া আটকে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয় একধরনের বিশেষ যন্ত্র, যার নাম টিস্যু ফরসেপস, ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দামের ওই টিস্যু ফরসেপস কেনা হয়েছে প্রতিটি ২০ হাজার টাকায়। রোগীর প্রস্রাব ধরে রাখার ইউরিনারি ব্যাগের প্রতিটির বাজারমূল্য ৬০ টাকা, কিন্তু  ব্যাগই প্রতিটি কেনা হয়েছে হাজার ৩০০ টাকায়। 

অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো চলমান করোনাভাইরাস মহামারীর জাতীয় দুর্যোগেও স্বাস্থ্য খাতে দেখা গেছে সরকারি কেনাকাটায় হরিলুটের এই একই ধারাবাহিকতা। মাস্কপিপিই কেনাকাটায় দুর্নীতি থেকে শুরু করে দেশের ৬৪ জেলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রকল্পে নানারকম দুর্নীতি অনিয়মের নানা প্রতিবেদনও ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত। কি সাধারণ সময়ে, কি মহামারীর মতো জাতীয় দুর্যোগে, কি ছোট প্রকল্পের কেনাকাটায়, কি মেগা প্রকল্পের কেনাকাটায় কিংবা নির্মাণ খরচে জনপ্রশাসনের এই সব দুর্নীতি থামানোর কোনো উদ্যোগই লক্ষ করা যাচ্ছে না।

এমনিতেই জনপ্রশাসনে যত বড় দুর্নীতি হয়, সেগুলোর সামান্যই গণমাধ্যমে আসে। আর যেগুলো আসে, সেগুলোরও তেমন কোনো বিহিত হয় না। এসবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জনপ্রশাসন দুর্নীতির মধ্যে তলিয়ে গেলেও শাসকরা এর কোনো তোয়াক্কা করছেন না। 

এর আগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সব ধরনের সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং টেন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। জনগণকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, ব্যবস্থার ফলে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সরকারি কেনাকাটায় অবনতিশীল পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সরকারি কেনাকাটায় বরং সাগরচুরির ঘটনাই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হতে চলেছে। নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং তা নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব রক্ষাকবচ রয়েছে, সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনস্ত বিভিন্ন কার্যালয়ে কিছু দুর্নীতিবাজ, স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তাকর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে, যারা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ, সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট গঠন করে স্বাস্থ্য খাতে জনসাধারণের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাজেটের ৭০৮০ ভাগই হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের দুর্নীতির কারণে প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্য খাতের অরাজকতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কিছু কম হয়নি। কিন্তু ফলাফল শূন্য। 

গত দুই বছরে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির যেসব তথ্য উদঘাটিত হয়েছে, তা এক কথায় ভয়াবহ। দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর অন্যতম হল স্বাস্থ্য খাতএমন কথা সর্বসাধারণ্যে প্রচলিত রয়েছে। বলা চলে, তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সর্বত্রই চলছে অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিযোগিতা। স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার, কেনাকাটা,ওষুধ সরবরাহসহ ১১টি খাতে দুর্নীতি বেশি হয় বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তাকর্মচারী ঠিকাদারদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য খাত ঘিরে অপ্রতিরোধ্য যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, সর্বত্র তাদের সরব পদচারণা লক্ষ করা যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিএমএসডি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট এবং নার্সিং অধিদপ্তর ছাড়াও প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্বাস্থ্য বিভাগীয় অফিস, সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ সব স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে সিন্ডিকেটের লোকজন। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে আলোচনায় আসা স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মচারী আবজাল সিন্ডিকেটেরই একজন ছিল।

স্বাস্থ্য উন্নয়ন একসূত্রে গাঁথা। সরকার স্বাস্থ্য খাতকে প্রাধান্য দিয়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা, শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, শিশুমৃত্যু হ্রাস পরিবার পরিকল্পনাসহ অন্যান্য কর্মসূচি পরিচালনা করলেও দেখা যাচ্ছেসরকার যেভাবে চিন্তা করছে; বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। এর বড় কারণ স্বাস্থ্য খাতে বিরাজমান দুর্নীতি। 

সরকারি হাসপাতালে কেনাকাটায় লুটপাট দুর্নীতির যে রাজত্ব কায়েম হয়েছে, তার মূলোৎপাটন করতে ছোটবড় সব পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু এই কাজটা মোটেও হচ্ছে না। 

যেখানে সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত, সেখানে দুর্নীতি বা অনিয়মের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এরকম ক্ষেত্রে খুব কমই পদক্ষেপ নেয়া হয়। বড় জোর বদলি হয়, যা আসলে কোনো পদক্ষেপ না। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও খুব কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। গত দুবছরে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মদুর্নীতির দুই শতাধিক অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শেষে ৫০টি মামলা হয়েছে। বাকী অভিযোগগুলো অনুসন্ধান এগুলেও করোনার কারণে এখনও মামলা হয়নি।

কখনো কখনো চুনোপুঁটি বা ছোটখাটো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাদের রাজনৈতিক যোগসাজশ দুর্বল। করোনা টেস্ট নিয়ে প্রতারণার কারণে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ এবং জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল চৌধুরী চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফসহ অনেককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে। সেই সময় নানা অনিয়মের ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম পদত্যাগ করলেও জড়িত অন্যরা রয়েছেন বহাল তবিয়তে। 

স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মদুর্নীতির টাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়ি চালক মো. মালেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়ে তারা এখন জেলে। তবে বছরের পর বছর ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের মাফিয়ারা।

কয়েকটি হাসপাতালে এমআরআই মেশিনসহ বিভিন্ন মেশিনারিজ ক্রয়ের নামে প্রায় কয়েকশ কোটি টাকা লুটপাটকারী স্বাস্থ্য খাতের মাফিয়া হিসেবে পরিচিত মোতাজজেরুল ইসলাম ওরফে মিঠু বর্তমানে আমেরিকায় রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলাও হয়নি। 

করোনাকালে সিএমএসডির ৯০০ কোটি টাকার কেনাকাটায় অনিয়মের সঙ্গে উঠে আসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবিরের নাম। তদন্ত কমিটি ঘটনার তার সম্পূক্তকতা পেয়ে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে এই কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হলেও দুর্নীতির মামলা হয়নি।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) গত বছর প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম সুরক্ষাসামগ্রী কিনেছিল। ওই কেনাকাটায় গুরুতর অনিয়ম হওয়ার কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর গত ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়েছেন সিএমএসডির পরিচালক। কিন্তু সেখানেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। 

এভাবেই গত দশ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বড় একাধিক অনিয়মদুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও দু'একজন কর্মকর্তাকে বদলি ওএসডি করা ছাড়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। এই কারণে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েই চলেছে। আর এই মহামারীকে দুর্নীতির একটি মহোৎসবে পরিণত করা হয়েছে। 

সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে প্রথমত রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘুষদুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরোটলারেন্স নীতি, সমাজ রাষ্ট্রের বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং ঘুষদুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের মধ্যে কী সেই রাজনৈতিক অঙ্গীকার আছে? 

পুনশ্চ: আমার এক বন্ধু লিখেছেন, সরকারি কেনাকাটায় 'সমুদ্রচুরি' ঠেকানোর একটা পথ হতে পারে: টিস্যু পেপার থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, যেকোনো সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কার্যাদেশ অনুমোদনের সাথে সাথে সেটি (কোন জিনিসটা কত দামে কেনা হচ্ছে-সেই তালিকা) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নোটিশবোর্ড ওয়েবসাইটে ঝুলিয়ে দেয়া, যাতে সকলের নজরে পড়ে। এই আইন ইউনিয়নের তহসিল অফিস থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে।

কাগজটি ফটোকপি করে নোটিশ বোর্ডে ঝুলানো কিংবা ওয়েভে আপলোড করা কোনো বিরাট ঘামঝরানো কিংবা পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর অপারেট করার মতো জটিল কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন কাজ নাক্লাস সিক্সসেভেনের শিক্ষার্থীরাও পারে।

'চাটার দলে'র প্রভাব কমাতে উল্লিখিত প্রস্তাবটি ভেবে দেখা পারে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক