Published : 20 Feb 2026, 08:28 AM
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক কিছুরই নতুন সংজ্ঞা হয়। বিগত সরকারের আমলে আমরা গণতন্ত্রের, উন্নয়নের, এমনকি নির্বাচনেরও নতুন নতুন সংজ্ঞা দেখেছি। এবার এল ‘চাঁদা’র পালা।
সড়কে বিভিন্ন যানবাহন থেকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ যে টাকা নেওয়া হয়, সেটিকে চাঁদা বলতে চান না সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তবে ‘বাধ্য’ করে যে টাকা নেওয়া হয় সেটিকে চাঁদা আখ্যায়িত করে ‘এরকম চাঁদাবাজির কোন সুযোগ নেই’ বলেছেন তিনি।
১৯ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে চাঁদার যে নতুন সংজ্ঞা দিলেন, সেই সংবাদ জনপরিসরে বিস্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মন্ত্রী এমন শব্দতাত্ত্বিক আবিষ্কার দিয়ে শুরুতেই নতুন সরকারের পথচলায় বিতর্কের জন্ম দিলেন। শেখ রবিউলে বক্তব্য ছিল, যেহেতু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে এই অর্থ তোলা হয় এবং জোরপূর্বক আদায়ের অভিযোগ নেই, তাই একে চাঁদা বা চাঁদাবাজি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যাখ্যা নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। কারণ দেশের সাধারণ মানুষ বহু বছর ধরে সড়ক পরিবহন খাতে বিভিন্ন নামে অর্থ আদায়কে চাঁদাবাজির সঙ্গেই যুক্ত করে দেখে এসেছে।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতি নিজেদের কল্যাণের জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ তোলে। এটি এক ধরনের অলিখিত বিধির মতো চালু আছে। তার যুক্তি অনুযায়ী, চাঁদা সেই অর্থ যা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য হয়ে দেয়। কিন্তু পরিবহন খাতে সংগঠনগুলোর তোলা অর্থ নাকি সমঝোতার ভিত্তিতে সংগৃহীত হয়। প্রশ্ন হলো, বাস্তবে সেই সমঝোতা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত এবং কতটা ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। কারণ বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর শক্ত অবস্থান বহু পুরোনো এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও অস্বীকার করার উপায় নেই।
নতুন সরকার হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের জন্য সংবাদ সম্মেলনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্ত। জনগণ আশা করেছিল, পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টার্মিনালভিত্তিক চাঁদা ও নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা দূরীকরণে দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করা হবে। কিন্তু তার বদলে যখন মন্ত্রী চাঁদা শব্দটির সংজ্ঞাই বদলে দিলেন, ফলে যে বিতর্কের জন্ম হলো, তা নিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করছেন।
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের বিষয়টি নতুন নয়। বিভিন্ন রুটে বাস চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সংগঠনের নামে দৈনিক বা সাপ্তাহিক হারে অর্থ দিতে হয় বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন মালিকরা বলেন, এই অর্থ সংগঠনের কল্যাণ তহবিলে যায়, শ্রমিকদের সহায়তা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ বা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ আদায়ের পদ্ধতি কতটা স্বচ্ছ এবং কতটা জবাবদিহিমূলক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে মালিক বা চালক সংগঠনের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে চান, তাদের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি হয়। রুট পারমিট, গাড়ি চলাচল, স্ট্যান্ড ব্যবহারের মতো বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় মন্ত্রীর বক্তব্যকে অনেকেই বাস্তবতা অস্বীকার হিসেবে দেখছেন।
মন্ত্রী বলেছেন, যখন যার প্রভাব থাকে, তখন তার দলের শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য দেখা যায়। এই স্বীকারোক্তিই আসলে সমস্যার গভীরতা প্রকাশ করে। যদি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবেই সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয়, তবে সেটি কতটা স্বতন্ত্র ও সমঝোতাভিত্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি পরিবহন খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও অলিখিত বিধির মাধ্যমে অর্থ আদায়কে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে তা জনগণের আস্থায় চিড় ধরাতে পারে।
নবগঠিত বিএনপি সরকার এমনিতেই জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার মুখোমুখি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি নিয়ে জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রথম সারির একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। সাধারণ মানুষ যুক্তির চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা জানে, পরিবহন ভাড়া বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি তাদের দৈনন্দিন জীবনে পড়ে। যদি পরিবহন মালিকরা সংগঠনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে, সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরই বর্তায়। ফলে সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা অর্থ হলেও, তার অর্থনৈতিক প্রভাব সাধারণ জনগণের ওপরই পড়ে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষার ব্যবহার। একজন মন্ত্রী যখন বলেন, এটি চাঁদা নয় কারণ জোর করে আদায় করা হচ্ছে না, তখন তিনি মূলত শব্দের সংজ্ঞাগত বিতর্কে প্রবেশ করেন। কিন্তু জনগণের কাছে চাঁদাবাজি মানে শুধু শারীরিক জোর নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগত চাপও। যদি কেউ জানেন যে সংগঠনের অর্থ না দিলে তার গাড়ি রাস্তায় নামতে পারবে না, বা স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে পারবে না, তবে সেটি কতটা স্বেচ্ছায় প্রদান, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য উপেক্ষা করে বিষয়টিকে সরলীকরণ করা রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় নয়।
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন ও ধরে রাখা। ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক মাসের কর্মকাণ্ডই সাধারণত সরকারের ভাবমূর্তি নির্ধারণ করে। এমন সময়ে যদি সরকার বিতর্কিত বা অযৌক্তিক মন্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখে পড়ে, তবে বিরোধীরা সুযোগ পাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়, বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও ব্যঙ্গের উপাদান হয়ে ওঠে। ফলে একটি অসতর্ক মন্তব্য পুরো সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিএনপি সরকার যদি সত্যিই সংস্কারমুখী প্রশাসন গড়তে চায়, তবে পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনি কাঠামো জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। বাংলাদেশে পরিবহন খাত বহুদিন ধরে ক্ষমতাসীন রাজনীতিক, মালিক-শ্রমিক নেতা এবং পুলিশের ‘যৌথ সিন্ডিকেটে’ পরিণত হয়েছে। যানবাহনের ফিটনেস বা আইনি ত্রুটিকে পুঁজি করে পুলিশ মাসিক ভিত্তিতে টাকা আদায় করে থাকে, যাকে মালিক-শ্রমিকরা ‘মান্তি’ বলে থাকে। বাস-ট্রাকের বডি নির্মাণে আইনের সব শর্ত পূরণ না হওয়া, ওভারলোডিং-স্পিডিং বা হর্নের মতো নানা অজুহাতে মামলা দেওয়ার সুযোগ থাকে পুলিশের। উভয় পক্ষই এই ফাঁক জানে। তাই মাসিক এই বন্দোবস্ত। সরকারের যথাযথ অনুমতি থাকলেও স্থানীয় মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের অনুমোদন ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চালানো অসম্ভব। এর জন্য এককালীন বড় অঙ্কের টাকা এবং ট্রিপ প্রতি নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর অর্থ সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া যদি বৈধ হয়, তবে সেটিকে আইনগত কাঠামোর মধ্যে এনে নিরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। কত অর্থ তোলা হচ্ছে, কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তার হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। এতে বিতর্ক কমবে এবং জনগণের আস্থা বাড়বে। কিন্তু বিষয়টিকে সরলভাবে অস্বীকার করা বা চাঁদা শব্দটি ব্যবহার করতে অনীহা দেখানো সমস্যার সমাধান নয়।
রাজনীতিতে শব্দের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি শব্দ কখনও কখনও একটি নীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। চাঁদাবাজি শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেতিবাচক অর্থ বহন করে। তাই একজন মন্ত্রী যখন বলেন তিনি এটিকে চাঁদা হিসেবে দেখেন না, তখন জনগণ ধরে নিতে পারে যে সরকার বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। এটি সরকারের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
সড়ক পরিবহন খাত শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। পণ্য পরিবহনের অতিরিক্ত ব্যয়ও সাধারণের পকেট থেকে যায়। তাই এই খাতে যেকোনো অনিয়ম বা অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই বর্তায়। সরকার যদি শুরুতেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
মোটকথা, মন্ত্রীর সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা আদায় সংজ্ঞাগত দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যাযোগ্য হয় না। নবগঠিত বিএনপি সরকারের উচিত হবে দ্রুত এই বিতর্কের ইতিবাচক সমাধান খোঁজা এবং পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করা। অন্যথায় একটি ছোট বক্তব্যও বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে, যা সরকারের জনপ্রিয়তা ও স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
'সমঝোতার ভিত্তিতে' নেওয়া টাকা চাঁদা নয়: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী