Published : 22 Apr 2026, 12:03 PM
নির্বাচনের কথা উঠতেই প্রথমে প্রবলভাবে উচ্চারিত হলো—এবারে বামেরা শূন্য থেকে মহাশূন্যে যাত্রা করবে। অর্থাৎ ২০২১ সালে তারা যেমন কোনো আসন পায়নি, ২০২৬-এও কোনো আসন পাবে না।
কয়েক দিন পরে একটু ফিসফাস—কয়েকটি আসনে বাম প্রার্থীরা একটু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে মনে হচ্ছে।
তার কয়েক দিন পরে—নাহ, বামেদের এবারে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তারপরে—দুই-তিনটি সিট বামেরা পেতে পারে। তারপরে—নাহ, সারা প্রদেশেই বামেরা জোর ফাইট দেবে মনে হচ্ছে।
সর্বশেষ—হয়তো সরকার গঠনে তৃণমূলকে বামেদের সমর্থন চাইতে হতে পারে।
২০১৫ সালে আমি শুধু কলকাতা নয়, পশ্চিমবঙ্গের অন্তত সাতটি শহর এবং গ্রামাঞ্চলে গিয়েছিলাম। কোথাও বামফ্রন্ট বা সিপিআইএম-এর একটি অফিসও দেখতে পাইনি। পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে তৃণমূলের অফিস। আসলে সিপিআইএম-এর সব অফিস দখল করে নিয়েছিল তৃণমূলিরা। কোথাও কোনো দেয়াললিখন নেই বামেদের। কাউকে রাস্তায় বা রেস্টুরেন্টে ‘বামফ্রন্ট’ শব্দটি উচ্চারণ করতে শুনিনি। ২০১১ সালের ভোটের পরে হাজার হাজার বাম কর্মী এলাকাছাড়া। নিচের সারির কর্মীরা বেধড়ক পিটুনি খেয়ে তৃণমূলে নাম লিখিয়ে দিনাতিপাত করছে।
২০২১ সালের নির্বাচনের সময় দেখেছি মীনাক্ষী, শতরূপ, সুজন, মহম্মদ সেলিম, তন্ময় ভট্টাচার্যরা নির্বাচনি প্রচার করছেন গুটিকয়েক সঙ্গীসাথী নিয়ে। জনসভা হয় না; হয় উঠান সভা বা পথসভা। মীনাক্ষী নন্দীগ্রামে সিপিআইএম-এর একটি বন্ধ অফিস খুলতে পেরেছিলেন। কিছু বড় জনসভা হয়েছিল আব্বাস সিদ্দিকীকে নিয়ে। সেবার আব্বাস সিদ্দিকীর আইএসএফ-এর সাথে ঐক্য গড়েছিল বামফ্রন্ট। ফলাফল সবারই জানা। বামফ্রন্ট সব আসনে হেরেছিল। অর্থাৎ শূন্য। আইএসএফ-এর নওশাদ সিদ্দিকী জিতেছিলেন।
২০২১ সালে শূন্য পেলেও ধারণা করা হচ্ছিল বামফ্রন্ট সশক্তিতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঢেলে সাজানো হচ্ছিল কেন্দ্র এবং মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্ব। তাছাড়া ২০২০ সালে করোনার সময় থেকে ‘রেড ভলান্টিয়ার’ গঠন করে সিপিআইএম যে অসাধারণ করোনা-যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার ধারেকাছে ছিল না পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল বা কেন্দ্রশাসক বিজেপি। মাঝরাতে কার বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দিতে হবে, কাকে হাসপাতালে ভর্তির জন্য নিয়ে যেতে হবে, কার বাড়িতে চাল-ডাল-সবজির বাজার করে পৌঁছে দিতে হবে, কার জন্য ওষুধ কিনে এনে দিতে হবে—ডাক দেওয়ামাত্র হাজির রেড ভলান্টিয়ার্স। কোনো দল, গোত্র, ধর্ম বা উপদল নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবেনি রেড ভলান্টিয়ার্স। আর্ত ও বিপদে পড়া মানুষ ছিল তাদের একমাত্র বিবেচ্য। এই কাজে নিজেরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছে অনেক ভলান্টিয়ার। কোনো পরিবারে চারজন পর্যন্ত সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু করোনা-যুদ্ধে এক মুহূর্তের জন্য ক্ষান্তি দেয়নি তারা। কারণ হিসেবে যে কথাটি তারা বলত তা বাঁধিয়ে রাখার মতো— “ভোট তো পাঁচ বছর পর পর একদিনের ঘটনা। কিন্তু সমাজের জন্য কাজ করা বামপন্থীদের জন্য প্রতিদিনের, সারা বছরের, আজীবনের।”
সেই সাথে ছিল কর্মজীবীদের জন্য ক্যান্টিন চালু। প্রতিদিনের শ্রমিক, যাদের আমরা ‘ডে-লেবার’ বলে চিনি, তারা কাজ পাচ্ছিলেন না করোনার সময়। তাদের জন্য যাদবপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাম কর্মীরা চালু করেছিলেন সস্তায় ‘শ্রমজীবী ক্যান্টিন’। করোনার চার বছর চালিয়েছেন একটানা। মানুষ এসব পুরোপুরি ভোলে না। কখনো কখনো সাময়িকভাবে ভুলে যেতে বাধ্য করা হয় লোভ দেখিয়ে কিংবা ভয় দেখিয়ে। কিন্তু সবাই ভোলে না। আসলে কেউই ভোলে না; সময়ের অপেক্ষা করে প্রতিদান দেওয়ার।
মানুষের সাথে থেকে সংগ্রাম করেই নেতৃত্বের আসনে উঠে আসে মাঠ পর্যায়ের কর্মী। এই যে কলতান দাশগুপ্ত—আর জি কর হাসপাতালের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ শুধু নয়, সমগ্র ভারতে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। অভয়ার হত্যা ঘটনা চাপা দেওয়ার জন্য সরকার রাতের আঁধারে লাশ চিতায় পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিল। কলতানের নেতৃত্বে মানুষ রাস্তা আটকে বসে থেকেছে সারারাত, সারাদিন। অভয়ার লাশ পোস্টমর্টেমে বাধ্য হয়েছে সরকার। এই আন্দোলন দিয়েই জনতার মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে কলতান দাশগুপ্ত। দুঃখের বিষয় যে বিজেপি সরকার এই ঘটনার বিচার ঠেকিয়ে রেখেছে, সেই বিজেপির মনোনয়ন নিয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছেন অভয়ার মা। লড়ছেন সেই কলতানেরই বিরুদ্ধে।
এই বছর যে সারা পশ্চিমবঙ্গে লাল ঝান্ডার বিশাল বিশাল জমায়েত, মিছিল ও প্রচার দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে বামপন্থীরা ভয়কে জয় করে লড়াই করতে বেরিয়ে পড়ছেন মাঠে; লড়ছেন সর্বস্ব বাজি রেখে। এই পর্যায়ে দলকে নিয়ে আসার কাজ শুরু হয়েছে কিন্তু ২০১১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই। শুধু যে পুরোনো কর্মী-সদস্যরা ফিরে এসেছেন বা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তাই নয়, লক্ষ লক্ষ তরুণ-যুবক যোগ দিচ্ছেন সংগঠনে। তারা চোখের সামনে আইডল হিসেবে দেখতে পাচ্ছেন শতরূপ, মীনাক্ষী, দীপ্সিতা, সৃজন, মোস্তাফিজুর রহমান রানা, কলতান দাশগুপ্ত, আফরিন বেগম শিল্পী, আফরিন খানম, নবনীতা, দেবজ্যোতি ও ধ্রুবজ্যোতি সাহার মতো দীপ্র যৌবনের অধিকারীদের। হয়তো এই তরুণদের হাত ধরে আজ বাদে কাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে বামপন্থীদের শূন্যের গেরো কাটাবার ইনিংস শুরু হতে যাচ্ছে।
এবার পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হচ্ছে। প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোসহ মোট ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে কলকাতা, ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি ও নদীয়াসহ মোট ১৪২টি আসনে। ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কিছুদিন ধরে এমন অবস্থা দেখা গেছে যে, সরকারি টাকায় যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, বিজেপি বা তৃণমূলের কোনো মিছিলই লাল ঝান্ডার সমান বা কাছাকাছি হতে পারেনি। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত মূলধারার মিডিয়া দুই দলের ‘বাইনারি’ নিয়েই আছে। দালাল মিডিয়াগুলোতে বামেদের খবর আসে না। কখনো মিছিলের ছবি দেখালে সামনে হয়তো দায়সারাভাবে মোবাইল ক্যামেরা ধরে যাতে দেখে মনে হয় মিছিলের সামনের সারির ওই কয়েকজন মানুষই পুরো মিছিল। ভোটারদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সরাসরি সেই বাইনারি প্রশ্ন— “আপনি কাকে ভোট দেবেন? বিজেপিকে নাকি তৃণমূলকে?” একটি ক্লিপে দেখলাম প্রশ্ন শুনে দুইজন ভদ্রলোক উষ্মা প্রকাশ করলেন— “নির্বাচনে কি শুধু এই দুই দলেরই প্রার্থী আছে? অন্যদের কথা জিজ্ঞেস করছেন না কেন?” প্রশ্নকারী যুবতী কোনো উত্তর না দিয়ে নির্লজ্জ হাসি হেসে সরে গেলেন। হয়তো তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এর বাইরে যাওয়ার অধিকার তাকে দেয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উপেক্ষিত একটি প্রসঙ্গ দিয়ে শেষ করি। এই যে তরুণ প্রজন্মের কমরেডরা, এরা এত মনের জোর পেলেন কোথা থেকে? নিশ্চয়ই একাধিক উত্তর হবে। তবে একটি উত্তর সবাই দেবেন—তারা তাদের সিনিয়র কমরেডদের জীবন থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণার কথা বলবেন। কী সেই অনুপ্রেরণা? সততার অনুপ্রেরণা। ৩৪ বছর বামফ্রন্টের শাসন ছিল পশ্চিমবঙ্গে। অনেক ভুল আছে, অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিথিলতার অপবাদও আছে। কিন্তু ৩৪ বছরে বামফ্রন্টের যত মন্ত্রী, এমপি, এমএলএ, জেলা নেতা বা রাজ্য নেতা ছিলেন—গত ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ প্রমাণ তো দূরের কথা, দাঁড় করাতেই পারেনি। বিপরীত দিকে তৃণমূলের একাধিক বড় নেতার নিজেদের দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই দুর্নীতির অভিযোগে জেল খাটা হয়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সবকিছু খতিয়ে দেখছেন এখন। এখন প্রশ্ন—এবারেও যদি বামেরা বিধানসভায় শূন্য আসন পায় তাহলে তারা কী করবে? উত্তর একই—মানুষের পাশে থেকে মানুষের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে