Published : 26 Apr 2026, 06:19 PM
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের অন্যতম আলোচ্য বিষয় অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংহতি। বৈদেশিক ঋণের বোঝা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, উন্নয়ন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তৃতি; সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এই বাস্তবতায় ২০৩৪-৩৫ অর্থবছর নাগাদ দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও কম, যা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই লক্ষ্য পূরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়াতে চায়। বিশেষ করে বিদ্যমান সম্পদ সারচার্জের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ বা সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর ‘ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স’ বা উত্তরাধিকার কর চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার জন্য এনবিআর একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, যারা ইতোমধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের মতে, দেশে ধনসম্পদের কেন্দ্রীভবন কমাতে, উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করতে এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায়সংগততা আনতে এই কর ব্যবস্থাগুলো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
তাত্ত্বিকভাবে এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি। ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ করে বৈষম্য কমানো এবং রাষ্ট্রের সামাজিক ব্যয় বাড়ানো আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনৈতিক কাঠামো, বিশেষ করে কৃষিনির্ভর গ্রামীণ সমাজে এই কর ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে? যে দেশে অধিকাংশ সম্পদ নগদ অর্থ নয়, বরং জমি ও স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে আটকে আছে, সেখানে সম্পদের বাজারমূল্যের ওপর কর আরোপ কি প্রান্তিক কৃষকের জন্য নতুন বিপর্যয় ডেকে আনবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কৃষি অর্থনীতির বাস্তব চিত্রটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
২০১৯ সালের কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কৃষি পরিবারের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। মোট কৃষি পরিবারের ৯১.৭ শতাংশই ক্ষুদ্র পরিবার, যাদের জমির পরিমাণ ৫ থেকে ২৪৯ শতক। মাঝারি পরিবার ৭.৭ শতাংশ (২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক) এবং বড় পরিবার মাত্র ০.৬০ শতাংশ (৭৫০ শতকের বেশি)। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে ৯৯ শতাংশেরও বেশি কৃষকই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণির।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো, জমির পরিমাণ বেশি মানেই আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়া নয়। একে বলা যায় ‘পেপার ওয়েলথ বনাম রিয়েল ক্যাশ ফ্লো’ সমস্যা। একজন কৃষকের নামে কয়েক বিঘা জমি থাকতে পারে, কিন্তু ওই জমি থেকে তার হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ আসে না। কৃষিজ উৎপাদন খরচ, বাজারের অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং শ্রমিকের উচ্চ মজুরির কারণে কৃষকের প্রকৃত আয় প্রায়ই কাগজে দেখা সম্পদের মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। কাগজে হয়তো তিনি কোটিপতি, কিন্তু বাস্তবে নগদ টাকার জন্য ধারদেনায় জর্জরিত।
ধরা যাক, একজন মাঝারি কৃষক উত্তরাধিকার সূত্রে তার বাবার কাছ থেকে ৭৪৯ শতক জমি পেলেন। প্রতি শতক জমির গড় মূল্য যদি ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়, তবে মোট সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কাগজে-কলমে তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক হলেও এই জমি বিক্রি না করলে তার হাতে কোনো নগদ অর্থ নেই। এখন যদি এই সম্পদের ওপর মাত্র ২.৫ শতাংশ হারে উত্তরাধিকার কর ধার্য করা হয়, তবে তাকে প্রায় ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা কর দিতে হবে। প্রশ্ন হলো, এই বিশাল অঙ্কের টাকা একজন কৃষক কোথায় পাবেন?
বাংলাদেশের কৃষকের বাস্তবতা হলো, ফসল বিক্রির আয় দিয়ে তার কোনোমতে সংসার চলে, আগের ঋণের কিস্তি শোধ হয় এবং পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদের খরচ জোগাতে হয়। ফলে বড় অঙ্কের কর পরিশোধ করতে হলে তাকে শেষ পর্যন্ত পৈতৃক জমি বিক্রি করতে হবে। এটি শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় কৃষি উৎপাদনের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি আঘাত।
রাজশাহী বা রংপুর অঞ্চলের আলু চাষিদের সাম্প্রতিক দুরবস্থা দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে বর্তমানে বীজ, সার, সেচ ও পরিবহন মিলিয়ে প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। উচ্চমূল্যের বীজ এবং জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে। অথচ ফলন ভালো হওয়ার পরও বাজারের পাইকারি দরে অনেক সময় কৃষকের লোকসান হয় বিঘা প্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা। এমন বাস্তবতায় যদি ওই কৃষকের ওপর সম্পদ করের বোঝা চাপানো হয়, তবে তা নিছক রাজস্ব নীতি নয়, বরং কৃষকের ওপর একটি ‘আর্থিক শাস্তি’ হিসেবে গণ্য হবে।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, কৃষক কি সত্যিই করমুক্ত?
অনেকে মনে করেন কৃষকরা আয়কর দেন না বলে তারা রাষ্ট্রে কম অবদান রাখছেন। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের কৃষকরা তাদের আয়ের প্রায় পুরো অংশই জীবনযাত্রার ব্যয়ে খরচ করেন। সার, ডিজেল, কীটনাশক বা নিত্যপণ্য কেনার সময় তারা পরোক্ষভাবে ভ্যাট ও শুল্ক প্রদান করেন। ভ্যাট একটি ‘রিগ্রেসিভ ট্যাক্স’, অর্থাৎ গরিব ও ধনী উভয়কেই একই হারে কর দিতে হয়, যা দরিদ্রের ওপর বেশি বোঝা তৈরি করে।
একজন কৃষক তার আয়ের ৯০-১০০ শতাংশ খরচ করেন, ফলে তার করভার কার্যত অনেক বেশি। অন্যদিকে, উচ্চবিত্তরা তাদের আয়ের বড় অংশ সঞ্চয়, শেয়ারবাজার, বিলাসবহুল সম্পদ বা কর-সুবিধাপ্রাপ্ত বিনিয়োগে স্থানান্তর করতে পারেন। ফলে প্রকৃত করভার অনেক ক্ষেত্রে নিম্নবিত্তের কাঁধেই বেশি পড়ে। এই বাস্তবতায় নতুন করে সম্পদ কর আরোপের আগে রাষ্ট্রের উচিত পরোক্ষ কর ব্যবস্থার বৈষম্য দূর করার উপায় খুজে বের করা।
উন্নত দেশের উদাহরণ টেনে অনেকেই উত্তরাধিকার করের পক্ষে বলেন। কিন্তু যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে করের বিনিময়ে নাগরিকরা যে সামাজিক নিরাপত্তা (স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি সহায়তা) পান, বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। যুক্তরাজ্যে কৃষি জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘এগ্রিকালচারাল প্রোপার্টি রিলিফ’ (এপিআর) সুবিধা আছে, যেখানে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কর মওকুফ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট জিডিপির তুলনায় খুবই সীমিত। তার বড় অংশ ব্যয় হয় সরকারি কর্মচারীদের পেনশন এবং প্রশাসনিক ব্যয়ে। কৃষকের জন্য কার্যকর ফসল বিমা নেই, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার শক্তিশালী বাজার কাঠামো নেই, স্বাস্থ্য ব্যয় এখনো বড় অংশে ব্যক্তিগত পকেট থেকে দিতে হয়। অর্থাৎ কর আছে, কিন্তু সামাজিক প্রতিদান দুর্বল। এই অবস্থায় কৃষকের কাছে উত্তরাধিকার করের যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাই একটি যুক্তিসঙ্গত কর কাঠামোর জন্য প্রথম শর্ত হওয়া উচিত কৃষি জমির জন্য উচ্চ করমুক্ত সীমা নির্ধারণ। শহরের বাণিজ্যিক জমি এবং গ্রামের কৃষি জমির মধ্যে অর্থনৈতিক চরিত্রের বিশাল পার্থক্য রয়েছে। শহরের জমি তাৎক্ষণিকভাবে নগদায়নযোগ্য এবং উচ্চ আয় উৎপাদনকারী। কিন্তু গ্রামের কৃষি জমি মূলত উৎপাদনমুখী এবং পরিবারভিত্তিক জীবিকার ভিত্তি।
একটি যুক্তিসঙ্গত কর কাঠামোর জন্য আমাদের কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে:
১. কৃষি জমির জন্য উত্তরাধিকার করের সীমা অন্তত ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাখা উচিত, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা এর আওতামুক্ত থাকেন।
২. জমির বাজারমূল্যের বদলে ওই জমি থেকে বার্ষিক সম্ভাব্য কৃষি আয়ের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা উচিত।
৩. যদি উত্তরাধিকারী ওই জমিতে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখেন, তবে তাকে সম্পূর্ণ কর অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে।
৪. কৃষি উপকরণের ওপর থাকা পরোক্ষ করের বোঝা কমানো জরুরি। সার, বীজ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, পরিবহন—সবখানে লুকানো করভার কমাতে না পারলে সম্পদ কর নিয়ে আলোচনা বাস্তবসম্মত হবে না।
রাজস্ব সংগ্রহ রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু রাজস্ব নীতি কখনোই এমন হওয়া উচিত নয় যাতে উৎপাদক শ্রেণি নিজের অস্তিত্ব হারায়। কৃষক খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। যদি লক্ষ্য হয় বৈষম্য কমানো, তবে করের নিশানা হতে হবে বিলাসবহুল সম্পদ ও অনুপার্জিত আয়; উৎপাদনশীল কৃষি জমি নয়। অন্যথায় রাজস্ব সংস্কারের এই গোলকধাঁধা কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে, যার মাশুল দিতে হবে পুরো জাতিকে।