১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

রোমাঞ্চের পথ ধরে অর্থনীতির গভীর মহাসমুদ্রে: রবিনসন ক্রুসোর ৩০০ বছর

ডিফোর ওই নাবিক আজও কোথাও হারিয়ে যাননি। তিনি আছেন আমাদেরই চিন্তার ভেতর, সিদ্ধান্তের ভেতর, দ্বিধার ভেতর। হয়তো আগামীকালও কোনো নতুন অর্থনীতিবিদ আবার ওই দ্বীপে ফিরবেন, নতুন প্রশ্ন নিয়ে, নতুন ব্যাখ্যার খোঁজে।

রোমাঞ্চের পথ ধরে অর্থনীতির গভীর মহাসমুদ্রে: রবিনসন ক্রুসোর ৩০০ বছর
রবিনসন ক্রুসো (১৭১৯, প্রথম সংস্করণ), ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বিকাশ চন্দ্র ঘোষ বিকাশ চন্দ্র ঘোষ

Published : 31 Jul 2026, 01:43 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

রোজ সকালে চোখ খোলার পর থেকেই আমাদের জীবনের চাকা ঘোরে অন্তহীন সিদ্ধান্তের এক জটিল ও সূক্ষ্ম ঘূর্ণিপাকে। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা নাকি কড়া কফি? গন্তব্যে পৌঁছাতে জ্যামের রিকশা নাকি লোকাল বাস? মাসের টানাপোড়েনের মধ্যবিত্ত বাজেটে কোন খাতে কতটা বরাদ্দ থাকবে আর কোনটাই বা চিরতরে কাটছাঁট করা হবে? আপাতদৃষ্টিতে আমাদের এই প্রাত্যহিক ও সাদামাটা সিদ্ধান্তগুলো এতটা স্বয়ংক্রিয় যে, এগুলোর পেছনের গভীর মনস্তত্ত্ব, সমাজচিন্তা ও সুদূরপ্রসারী দর্শন নিয়ে আলাদা করে ভাবার ফুরসত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মেলে না। অথচ, এই অতি চেনা ও প্রাত্যহিক আচরণের পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে বিগত তিনশ বছরের এক সুবিশাল বৌদ্ধিক, সামাজিক ও দার্শনিক ইতিহাস। আর ওই ইতিহাসের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে, সুবিশাল মহাসমুদ্রে একাকী ভেসে থাকা নির্জন দ্বীপে নোঙর ফেলে বসে আছেন এক কাল্পনিক নাবিক, যার নাম রবিনসন ক্রুসো।

১৭১৯ সালের এক শীতের সকালে লন্ডনের পাঠকরা যখন ড্যানিয়েল ডিফোর লেখা সেই বিখ্যাত উপন্যাসটি ‘The Life and Strange Surprising Adventures of Robinson Crusoe’ হাতে তুলেছিলেন, তখন কেউ কল্পনাও করেননি যে জাহাজডুবির পর একটি নির্জন দ্বীপে আটকে পড়া এই সাধারণ ইংরেজ নাবিকটি আগামী তিনশ বছরের অর্থনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপকে পরিণত হবে। মার্ক্সবাদী হোক বা উদারনৈতিক, অস্ট্রিয়ান হোক বা প্রাতিষ্ঠানিক—প্রায় প্রতিটি ধারার অর্থনীতিবিদ তার নিজস্ব তত্ত্বের আলোয় মানুষের অর্থনৈতিক আচরণের মূল রহস্য উন্মোচন করতে চেয়েছেন ডিফোর ওই দ্বীপে ফিরে গিয়ে।

কেন এই দ্বীপ এত বিশেষ? কারণ বাস্তব জগতের অর্থনীতি এত জটিল যে বাজারের অনিশ্চয়তা, সরকারের হস্তক্ষেপ, সামাজিক চাপ ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতির ভিড়ে মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক প্রবৃত্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। ক্রুসোর দ্বীপ ওইসব জটিলতা সরিয়ে দেয়। সেখানে একজনমাত্র মানুষ, সীমিত সম্পদ এবং বেঁচে থাকার অনিবার্য প্রয়োজন—এই তিনটি উপাদান নিয়ে প্রকৃতি নিজেই তৈরি করে দিয়েছে এক ‘চিন্তার পরীক্ষাগার’। তিনশ বছর ধরে চলে আসা এই বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রাটি কালানুক্রমিকভাবে অনুসরণ করলে পাওয়া যায় অর্থনৈতিক চিন্তার বিবর্তনের এক বৈচিত্র্যময় মানচিত্র; যেখানে একই চরিত্র বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন তাত্ত্বিকের হাতে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করেছে, কিন্তু সবসময় রয়ে গেছে অপরিহার্য।

এই যাত্রার শুরুটা কিন্তু অনেক আগে, উপন্যাস প্রকাশের মাত্র ১১৫ বছর পরেই। ১৮৩৪ সালে অক্সফোর্ডের দার্শনিক উইলিয়াম ফোর্স্টার লয়েড তার ‘বর্তমান সময়ের জনসংখ্যা সংক্রান্ত বক্তৃতা’ (Lectures on Population) গ্রন্থে ক্রুসোর ওই কালির বোতলের গল্পটি তুলে আনেন। জাহাজডুবির পর ক্রুসোর হাতে থাকা এক বোতল কালি যখন ফুরিয়ে আসে, তখন শেষ ফোঁটাটি তার কাছে অমূল্য হয়ে ওঠে। লয়েড দেখান, এই ছোট ঘটনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অর্থনীতির একটি বড় সত্য। কোনো পণ্যের মূল্য তার মোট উপযোগিতার ওপর নির্ভর না করে বরং শেষ এককটির উপযোগিতার ওপর নির্ভর করে। একে বলা হয় 'প্রান্তিক উপযোগিতা'। ডিফোর নাবিক কখনো অর্থনীতি পড়েননি, কিন্তু শেষ কালির ফোঁটাটি যত্নে রাখার মাধ্যমে তিনি স্বজ্ঞাতভাবে প্রমাণ করে দেন যে স্বল্পতাই মূল্য তৈরি করে।

এই চিন্তার ভেতর থেকেই পরবর্তী ধাপে ১৮৫০ সালে ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফ্রেদেরিক বাস্তিয়াত তার ‘অর্থনৈতিক সম্প্রীতি’ (Economic Harmonies) গ্রন্থে ক্রুসোকে ব্যবহার করেন আরেক যুদ্ধে। ওই সময় ফ্রান্সে সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতির জের ধরে প্রচণ্ড বিতর্ক চলছে। বাস্তিয়াতের প্রশ্ন ছিল, কেন রাষ্ট্র কৃত্রিমভাবে বিনিময় আটকাবে, যখন বিনিময় মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি? তিনি ফিরে যান উপন্যাসের ওই দৃশ্যে যেখানে ক্রুসো একা সবকিছু করতে বাধ্য—ঘর বানায়, মাছ ধরে, শিকার করে, পোশাক তৈরি করে। একাকী এই অবস্থায় সে প্রতিটি কাজে অদক্ষ এবং তার জীবনমান অত্যন্ত দরিদ্র। কিন্তু ফ্রাইডে আসার পর সব বদলে যায়। একজন শিকারে দক্ষ হয়, অন্যজন মাছ ধরায়; একজন নির্মাণ করে, অন্যজন রক্ষণাবেক্ষণ করে। দক্ষতা বাড়ে, উৎপাদন বাড়ে, দুজনের জীবনমান উন্নত হয়। বাস্তিয়াতের মজার যুক্তি হলো, যে রাজনীতিবিদ আমদানি শুল্ক দিয়ে দেশীয় শিল্প রক্ষার কথা বলেন, তিনি আসলে ক্রুসোকে বলছেন, ফ্রাইডের সাহায্য নিও না, একাই সব করো। যা ক্রুসোর জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি জাতির জন্যও ক্ষতিকর।

এভাবেই ক্রুসোর দ্বীপ ধীরে ধীরে অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী মানসিক পরীক্ষাগারে পরিণত হতে থাকে। এরপর আসে ১৮৭১ সাল, যখন অর্থনীতির চিন্তার জগতে এক বিপ্লব ঘটে যাকে বলা হয় ‘প্রান্তিক বিপ্লব’ (Marginal Revolution)। আর এই বিপ্লবের দুই পথিকৃৎ ব্রিটেনের উইলিয়াম স্ট্যানলি জেভন্স এবং অস্ট্রিয়ার কার্ল মেঙ্গার দুজনেই তাদের তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি করেন ক্রুসোর দ্বীপে। জেভন্স তার ‘রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্ব’ (The Theory of Political Economy) গ্রন্থে ক্রুসোকে চিহ্নিত করেন ‘যৌক্তিক অর্থনৈতিক মানুষ’ হিসেবে। তিনি দেখান, উপন্যাসের ক্রুসো যখন স্বজ্ঞাতভাবে কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে সময় ভাগ করে, তখন সে আসলে ওই বিন্দুটিই খুঁজছে যেখানে কাজের শেষ ঘণ্টার উপযোগিতা বিশ্রামের শেষ ঘণ্টার উপযোগিতার সমান হয়। ডিফোর নাবিক কখনো ক্যালকুলাস শেখেনি, কিন্তু জেভন্সের চোখে সে নিখুঁতভাবে প্রান্তিক সমীকরণ মেনে চলে। একই বছর ভিয়েনায় বসে মেঙ্গার তাঁর ‘অর্থনীতির নীতি’ (Principles of Economics) গ্রন্থে ভিন্ন পথে ক্রুসোকে বিশ্লেষণ করেন। তিনি কল্পনা করেন ওই ভোরের দৃশ্য, যখন ক্রুসো ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধান্ত নেয়—ক্ষুধা মেটাবে আগে, নাকি পিপাসা, নাকি নিরাপত্তা। মেঙ্গার বলেন, ক্রুসোর এই প্রয়োজনের ক্রমই নির্ধারণ করে প্রতিটি পণ্যের মূল্য।

তেরো বছর পর, ১৮৮৪ থেকে ১৮৮৯ সালের মধ্যে অস্ট্রিয়ান স্কুলের আরেক মহান তাত্ত্বিক ইউজেন ভন বম-বাওয়ার্ক তার যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘মূলধন ও সুদ’ (Capital and Interest) ও ‘মূলধনের ইতিবাচক তত্ত্ব’ (The Positive Theory of Capital)-এ ক্রুসোকে ব্যবহার করেন এমন এক উদাহরণ তৈরি করতে যা আজও অর্থনীতির ক্লাসরুমে পড়ানো হয়। তিনি বলেন, কল্পনা করো ক্রুসো খালি হাতে মাছ ধরে, প্রতিদিন কষ্ট করে পায় তিন/চারটি মাছ। কিন্তু সে যদি কয়েক দিন কম খেয়ে সময় বাঁচায় এবং ওই সময় ব্যয় করে একটি মাছ ধরার জাল তৈরিতে, তাহলে জাল তৈরি হয়ে গেলে সে একদিনেই আগের চেয়ে দশগুণ বেশি মাছ ধরতে পারে। বম-বাওয়ার্কের মতে, এই ছোট গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পুঁজিবাদের ভিত্তি: মূলধন হলো বর্তমান ভোগ ত্যাগের ফল, পরোক্ষ উৎপাদন পদ্ধতি সময় নিলেও বেশি ফলদায়ী, আর সুদ হলো সময়ের মূল্য—কারণ মানুষ স্বভাবতই বর্তমানকে ভবিষ্যতের চেয়ে বেশি মূল্য দেয়।

১৮৮১ সালে ফ্রান্সিস ওয়াই. এজওয়ার্থ তার অসাধারণ গ্রন্থ ‘গাণিতিক মানসিকতা’ (Mathematical Psychics)-এ ক্রুসোর একাকিত্ব ঘুচিয়ে দেন। তিনি উপন্যাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ফ্রাইডেকে নিয়ে আসেন এবং তাদের নিয়ে গড়ে তোলেন বিখ্যাত ‘এজওয়ার্থ বক্স’ চিত্র। তিনি দেখান, যদি ক্রুসোর কাছে অতিরিক্ত নারকেল থাকে এবং ফ্রাইডের কাছে অতিরিক্ত মাছ, তাহলে তারা স্বেচ্ছায় বিনিময় করলে উভয়েই লাভবান হবে। এই বিনিময় চলতে থাকবে যতক্ষণ না তারা ‘চুক্তি রেখায়’ পৌঁছায়। এজওয়ার্থ ডিফোর উপন্যাসের ওই সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ককে (যেখানে ক্রুসো ফ্রাইডেকে দাসের মতো ব্যবহার করত) চ্যালেঞ্জ করে দেখান যে প্রকৃত অর্থনৈতিক দক্ষতা আসে সমান মর্যাদায় স্বেচ্ছাবিনিময়ের মাধ্যমে।

দশ বছর পর, ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শাল তার ‘অর্থনীতির নীতি’ (Principles of Economics) গ্রন্থে ক্রুসোকে ব্যবহার করেন আরেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বোঝানোর জন্য। তিনি বেছে নেন উপন্যাসের সবচেয়ে আনন্দঘন দৃশ্যটি, যখন ক্রুসো অপ্রত্যাশিতভাবে একটি জাহাজের মালামাল উদ্ধার করে। মার্শাল এটাকে বলেন ‘ভোক্তা উদ্বৃত্ত’। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্রুসো যদি ওই মালামাল বাজারে কিনত, তাহলে তাকে অনেক মূল্য দিতে হতো; কিন্তু বিনামূল্যে পাওয়ায় যে অতিরিক্ত তৃপ্তি বা সঞ্চয় হয়, সেটাই উদ্বৃত্ত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পৃথিবী প্রবেশ করে মহামন্দার অন্ধকারে। বেকারত্ব, হতাশা, দারিদ্র্য গ্রাস করে সভ্যতাকে। তখন ইংরেজ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস ১৯৩৬ সালে তার বিপ্লবী গ্রন্থ ‘কর্মসংস্থান, সুদ ও মুদ্রার সাধারণ তত্ত্ব’ (The General Theory of Employment, Interest and Money)-তে ক্রুসোকে ব্যবহার করেন একেবারে উল্টো দিক থেকে। তিনি উপন্যাসের ওই পর্বটি মনে করিয়ে দেন যেখানে ক্রুসো ভবিষ্যতের ভয়ে অতিরিক্ত নারকেল সঞ্চয় করে—আজ খায় না, জমিয়ে রাখে। কেইনস প্রশ্ন তোলেন, এই সঞ্চয় কি দ্বীপের অর্থনীতিকে ধ্বংস করবে? তার উত্তর: না। কারণ ক্রুসো নিজেই উৎপাদক, নিজেই ভোক্তা। সে যা সঞ্চয় করে, তা আসলে নিজের ভোগ স্থগিত করে। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতিতে সঞ্চয়কারী ও বিনিয়োগকারী ভিন্ন মানুষ। যখন সবাই সঞ্চয় করতে শুরু করে, তখন সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়, উৎপাদন কমে যায়, বেকারত্ব বেড়ে যায়। কেইনস এই ঘটনার নাম দেন ‘সাশ্রয়ের বিবর্তন’ (Paradox of Thrift)। তিনি দেখান, ডিফোর উপন্যাসে এই বিবর্তনটি নেই বলেই ক্রুসোর দ্বীপ সবসময় পূর্ণ কর্মসংস্থানে থাকে; কিন্তু বাস্তব পৃথিবী ততটা সরল নয়।

আর এই জটিল বাস্তবতার বিপরীতে ১৯৪৯ সালে লুডভিগ ভন মিজেস তার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ ‘মানবীয় কর্ম’ (Human Action)-এ ক্রুসোকে দেখলেন মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতীক হিসেবে। মিজেসের যুক্তি হলো, অর্থনীতির মৌলিক একক কোনো বাজার বা দাম নয়, বরং ব্যক্তির উদ্দেশ্যমূলক কর্ম। ক্রুসোর প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেমন সকালে কী করবে, কোথায় যাবে, কতক্ষণ কাজ করবে একটি মূল্যমান ক্রমের ভিত্তিতে নেওয়া। মিজেসের মতে, এটি প্রমাণ করে যে সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কখনো কাজ করতে পারে না, কারণ একজন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাকারী কখনো কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যমান জানতে পারে না।

এর তেরো বছর পরে, ১৯৬২ সালে মিজেসের সবচেয়ে মেধাবী শিষ্য মারে রথবার্ড তার ‘মানুষ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র’ (Man, Economy, and State) গ্রন্থে ক্রুসোকে ব্যবহার করেন আরও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠায়। তিনি দেখান, ক্রুসো দ্বীপে পৌঁছে তার শ্রম ও উপস্থিতির মাধ্যমে দ্বীপের বিভিন্ন অংশ নিজের করে নেয়। যে জমিতে সে ঘর বানায়, চাষ করে, সরঞ্জাম রাখে সেগুলো তার সম্পত্তি। এই অধিকার কোনো আইন বা রাষ্ট্র দেয়নি; এটি শ্রম ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার স্বাভাবিক পরিণতি। এরপর ফ্রাইডে এলে দুজনের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিনিময় শুরু হয় কোনো চুক্তি, কোনো আইন, কোনো রাষ্ট্রীয় তদারকি ছাড়াই। রথবার্ডের মতে, এটাই প্রমাণ করে যে স্বাধীন বাজারের স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

এখন পর্যন্ত ক্রুসো যত তত্ত্বের জন্ম দিয়েছেন, তার সব কিছু ছিল মূলত গবেষণাগারের বিষয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালে এসে পল স্যামুয়েলসন ক্রুসোকে নিয়ে যান সাধারণ মানুষের কাছাকাছি। তার বিশ্ববিখ্যাত পাঠ্যপুস্তক ‘অর্থনীতি’ (Economics) পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়েছে, এবং ওই বইয়ের শুরুতেই ছিল ক্রুসোর দ্বীপ। স্যামুয়েলসন দেখান, অর্থনীতির তিনটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর-কী উৎপাদন করবে, কীভাবে উৎপাদন করবে এবং কার জন্য উৎপাদন করবে এটি সহজেই বোঝা যায় ক্রুসোর দ্বীপ কল্পনা করে। সীমিত সময় ও শক্তি নিয়ে ক্রুসো যদি সারাদিন মাছ ধরে, তাহলে ঘর মেরামত করতে পারবে না; আর যদি ঘর বানায়, তাহলে মাছ কম পাবে। এই সিদ্ধান্তটির নামই হলো ‘সুযোগ ব্যয়’ (Opportunity Cost) অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি।

একই বছর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তি অধ্যাপক মিল্টন ফ্রিডম্যান তার ‘মূল্য তত্ত্ব’ (Price Theory) লেকচার সিরিজে ক্রুসোকে শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি ছাত্রদের বলেন, ক্রুসো যখন সকালে হিসাব করে আজ দুই ঘণ্টা নারকেল সংগ্রহ করলে একটি পাব, চার ঘণ্টা করলে দুটো পাব এই সিদ্ধান্তটিই ঠিক বাজারের কোনো চাকরিজীবীর মজুরি ও অবসরের পছন্দর মতো। আর ১৯৯২ সালে আধুনিক মাইক্রোইকোনমিক্সের সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ ‘ইন্টারমিডিয়েট মাইক্রোইকোনমিক্স’ (Intermediate Microeconomics)-এর লেখক হ্যাল ভ্যারিয়ান প্রতিটি সংস্করণের প্রথম অধ্যায়ই ক্রুসো দিয়ে শুরু করেন। তিনি গণিতের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে, প্রতিটি বাড়তি নারকেলের উপযোগিতা ক্রমে কমতে থাকে, আর যতক্ষণ পর্যন্ত শেষ নারকেলটির উপযোগিতা বিশ্রামের ব্যয়ের সমান না হয়, ততক্ষণ ক্রুসো কাজ করে।

তবে ক্রুসোর দ্বীপ শুধু মুগ্ধতার জন্ম দিয়েছে তা নয়, অনেক সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। অনেক চিন্তকের কাছে এই নির্জন দ্বীপ ছিল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৌদ্ধিক সীমাবদ্ধতার প্রতীক। ১৮৬৭ সালে কার্ল মার্কস তার দাস ক্যাপিটাল (Das Kapital) গ্রন্থে ক্রুসোর উদাহরণকে ‘রবিনসোনাড’ বলে আখ্যা দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। মার্ক্সের কাছে ক্রুসো একই সঙ্গে দুটি বিপরীত সত্যের প্রতীক। একদিকে, ক্রুসোর দ্বীপে শ্রম ও উৎপাদনের সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সে নিজেই মাছ ধরে, ঘর বানায়, খাদ্য সংরক্ষণ করে এবং জানে কোন কাজে কত সময় ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে। সেখানে শ্রম, উৎপাদন ও ভোগের সম্পর্কের মধ্যে কোনো পর্দা নেই। কিন্তু বাস্তব পুঁজিবাদী সমাজে এই স্বচ্ছ সম্পর্কটি পণ্যের আড়ালে হারিয়ে যায়। বাজারে মানুষ কেবল একটি পণ্যের দাম দেখে, কিন্তু ওই দামের পেছনে থাকা শ্রমিকের ঘাম, সময়, কষ্ট কিংবা শোষণের ইতিহাস আর চোখে পড়ে না। পণ্য যেন নিজেই একটি স্বাধীন সত্তা হয়ে ওঠে, আর মানবিক শ্রম অদৃশ্য হয়ে যায়। মার্কস একে বলেন ‘পণ্য-বিভ্রম’ যেখানে বস্তু মানুষের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে।

কিন্তু মার্কসের সমালোচনা এখানেই থেমে থাকে না। তিনি আরও বলেন, বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবেই ক্রুসোর মতো একাকী মানুষকে ‘স্বাভাবিক মানুষ’ এর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন, যেন মানুষ স্বভাবতই বিচ্ছিন্ন, স্বার্থপর ও বিনিময়প্রবণ। অথচ বাস্তবে মানুষ মূলত সামাজিক সত্তা; সে পরিবার, সমাজ, ইতিহাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতরেই নিজেকে নির্মাণ করে। তাই ক্রুসোর নির্জনতা কোনো চিরন্তন মানবিক সত্য নয়, বরং একটি অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে থর্স্টেইন ভেবলেন তার ‘অবসরভোগী শ্রেণির তত্ত্ব’ (The Theory of the Leisure Class) গ্রন্থে এই পুরো চিন্তাপদ্ধতির বিরুদ্ধেই নতুন বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ভেবলেন সরাসরি ক্রুসো চরিত্রটিকে আক্রমণ করেননি; বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন ওই অর্থনৈতিক মডেলের বিরুদ্ধে, যেখানে মানুষকে একটি নিখুঁত যুক্তিবাদী যন্ত্র হিসেবে কল্পনা করা হয়। তার মতে, বাস্তব মানুষ কখনো ক্রুসোর মতো একা বা শুধু যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় না। মানুষ সবসময় অভ্যাস, সংস্কৃতি, সমাজে নিজের অবস্থান, অন্যকে অনুকরণ করা এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার ইচ্ছা এই সব কিছুর দ্বারা প্রভাবিত হয়। প্রতিবেশী নতুন গাড়ি কিনলে কিংবা বিলাসবহুল জীবনযাপন করলে অন্য মানুষও তা অনুসরণ করতে চায় এটি নিছক উপযোগ সর্বোচ্চকরণের সিদ্ধান্ত নয়, বরং সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ক্রুসোর দ্বীপে এই সামাজিক চাপ অনুপস্থিত, তাই ওই মডেল বাস্তব মানব আচরণের জটিলতাকে পুরোপুরি ধরতে পারে না। ভেবলেন মনে করতেন, নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতি মানুষকে অতিরিক্ত সরলীকৃত করেছে এবং তাকে রক্ত-মাংসের সামাজিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ‘যন্ত্রমানব’-এ পরিণত করেছে।

তার এই সমালোচনাই পরবর্তীকালে আচরণগত অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করে, যেখানে ড্যানিয়েল কানেম্যান ও রিচার্ড থ্যালার দেখান, মানুষ অধিকাংশ সময়ই বিশুদ্ধ যুক্তির দ্বারা নয়, বরং আবেগ, পক্ষপাত, ভয়, অভ্যাস ও সামাজিক প্রভাবের দ্বারা সিদ্ধান্ত নেয়।

তিনশ বছর আগে ড্যানিয়েল ডিফো যখন রবিনসন ক্রুসো লিখেছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি যে এটি একদিন অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী চিন্তার পরীক্ষাগার হয়ে উঠবে। সময়ের প্রবাহে এই একাকী নাবিক হয়ে উঠেছেন বহু অর্থনীতিবিদের ভিন্ন ভিন্ন ভাষার প্রতীক যেমন: ফ্রেদেরিক বাস্তিয়াতের কাছে মুক্ত বাণিজ্যের যুক্তি, কার্ল মার্কসের হাতে পুঁজিবাদী কাঠামোর সমালোচনা, ইউজেন ভন বম-বাওয়ার্কের কাছে মূলধনের গভীর উৎস, জন মেনার্ড কেইনসের চিন্তায় সঞ্চয় ও চাহিদার দ্বন্দ্ব, থর্স্টেইন ভেবলেনের চোখে একটি সীমাবদ্ধ মডেল, আর পল স্যামুয়েলসনের হাতে অর্থনীতির প্রথম পাঠশালা।

কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই থেমে যায় না। আমরা কি কখনো খেয়াল করি আমাদের সবচেয়ে সাধারণ সিদ্ধান্তগুলোর ভেতরেও এই ক্রুসো লুকিয়ে আছেন? চা না কফি, বাস না রিকশা, আজ খরচ করব নাকি ভবিষ্যতের জন্য জমাব এই ছোট ছোট দ্বিধাগুলোর ভেতরেই প্রতিদিন আমরা দাঁড়িয়ে থাকি সেই একই দ্বীপে, যেখানে সীমিত সম্পদ আর অসীম চাহিদার মাঝে মানুষকে বেছে নিতে হয়। ক্রুসো তাই কেবল একটি সাহিত্যিক চরিত্র নন; তিনি মানুষের ভেতরের সেই চিরন্তন সত্তা, যে সীমিত সময় আর সীমাহীন সম্ভাবনার মাঝে প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত নেয়। আর ওই সিদ্ধান্তগুলোর সমষ্টিই অর্থনীতি যা শুধু হিসাবের বিজ্ঞান নয়, বরং জীবনের গভীরতম পছন্দক্রমের শিল্প। ডিফোর ওই নাবিক আজও কোথাও হারিয়ে যাননি। তিনি আছেন আমাদেরই চিন্তার ভেতর, সিদ্ধান্তের ভেতর, দ্বিধার ভেতর। হয়তো আগামীকালও কোনো নতুন অর্থনীতিবিদ আবার ওই দ্বীপে ফিরবেন, নতুন প্রশ্ন নিয়ে, নতুন ব্যাখ্যার খোঁজে। কারণ এই দ্বীপের কোনো শেষ নেই এর বিস্তার ঠিক ততটাই, যতটা গভীর মানুষের মন। তাই পরের বার যখন আপনি কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়াবেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে ক্রুসো হলে কী করতেন? আর অনেক সময় দেখা যাবে, উত্তরটা আসলে আপনার ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে ছিলো।

বিকাশ চন্দ্র ঘোষ সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: bikasheco@pust.ac.bd