Published : 16 Feb 2026, 08:09 AM
দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, বিশ্বাসের ঘাটতি, সংঘাত এবং নির্বাচনি বিতর্কের পর জনগণ তাদের ভোটে স্পষ্ট ও শক্তিশালী রায় দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের শুধুমাত্র প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয়নি, সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে। সংসদে আইন পাস করা সহজ, কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো এই শক্তি কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা হবে। জনগণ ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, দায়িত্বশীলতা ও ফলপ্রদ নীতিনির্ধারণের প্রমাণ চায়।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিস্থিতি সবসময়ই জটিল। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজনীতিতে যে ধারা গড়ে উঠেছে, তাতে সংঘাত ও পাল্টা সংঘাত নিয়মিত দেখা গেছে। সহিংসতা, অবরোধ, অগ্নিসংযোগ, গ্রেপ্তার ও মামলার সংস্কৃতি মানুষকে ক্লান্ত করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা অনুভব করেছে, সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছে, আর তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় আছে। তাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা প্রথম থেকেই একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, স্থিতিশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রই তাদের অগ্রাধিকার।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যে কোনো সংসদীয় ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই শক্তি দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করা, রাষ্ট্র কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় আনা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে স্থাপন করা সম্ভব। তবে সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়, এটি জাতির মৌলিক চুক্তি। অতীতে সংবিধান সংশোধনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন গভীর হয়েছে। এবার সরকার যদি এসব বিষয়ে সর্বদলীয় আলোচনার মাধ্যমে কাজ করে এবং নাগরিক সমাজ, আইনজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করে, তবে পরিবর্তনগুলো দীর্ঘস্থায়ী এবং গ্রহণযোগ্য হবে। জনগণ দেখতে চায়, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কমানো হয়েছে কিনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী হয়েছে কিনা এবং নির্বাচন কমিশন সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে কিনা।
নির্বাচনের সময় আলোচিত একটি বড় বিষয় ছিল জুলাই সনদ, যা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। এই সনদকে কেন্দ্র করে জনগণের মধ্যে সংস্কারের আশা তৈরি হয়েছে। বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে সাংবিধানিক ভারসাম্য জোরদার করা হবে, সংসদীয় কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে নতুন বিধান যুক্ত হবে, মানবাধিকার সুরক্ষায় স্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকবে এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। এখন মূল প্রশ্ন বাস্তবায়ন। গণভোটের প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবে রূপ না পায়, তবে হতাশা জন্ম নিতে পারে। তাই নতুন সরকারের প্রথম দিকের কাজগুলোর একটি হওয়া উচিত স্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা এবং কবে ও কীভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন হবে তা জনগণকে জানানো।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে কিছুটা প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন সরকারের জন্য জরুরি একটি বাস্তবসম্মত এবং বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। উন্নয়ন যেন কেবল নতুন অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয় বৈষম্য হ্রাসে বাস্তব প্রভাব ফেলে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও এখন জনগণের জন্য বড় প্রত্যাশার বিষয়। দরিদ্র, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী এবং প্রান্তিক জনগণ সরকারের কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে আছে। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা এবং নগদ ভর্তুকির মতো কর্মসূচি আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরিবার প্রতি মাসে ২০০০–২৫০০ টাকা আর্থিক বা খাদ্য সহায়তা দেওয়ার জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ঋণ ও বাজার সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন এবং যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হবে। কারণ দেশের জনসংখ্যার সুবিধা সঠিকভাবে কাজে লাগানো না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।
নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের অভিযোগ ও বিতর্কের ছায়া কাটিয়ে ওঠা। সংবাদপত্রে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। বাজার, পরিবহন খাত, নির্মাণ প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল বা জমি সংক্রান্ত বিরোধে অর্থ দাবি করার মতো অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। দলটি বহু ক্ষেত্রে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। কিন্তু এখন সরকারে এসে দলটির সামনে সুযোগ রয়েছে একটি উদাহরণ স্থাপন করার। যদি সরকার ঘোষণা করে এবং কার্যকরভাবে দেখাতে পারে যে আইন সবার জন্য সমান, দলীয় পরিচয় বিবেচ্য নয় এবং অপরাধ করলে বিচার হবে, তাহলে জনআস্থা দ্রুত পুনর্গঠিত হতে পারে। অন্যথায় বিরোধীরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি। ক্ষমতার পরিবর্তনের সময় স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, দখল বা প্রতিশোধের প্রবণতা দেখা যায়। নতুন সরকার যদি শুরুতেই কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়, তবে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরবে। পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে তারা রাষ্ট্রের সেবক, কোনো দলের নয়। এতে করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা অনুভব করবে।
বিদেশনীতি ক্ষেত্রেও সরকারের দক্ষতা পরীক্ষা হবে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রবাসী শ্রমিকদের বাজার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ দৃঢ়তার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নতুন সরকারের পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংস্কার দৃশ্যমান হলে আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়বে।
তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। তারা চায় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে স্টার্টআপ সহায়তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, কারিগরি শিক্ষায় আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ তাদের আশাবাদী করতে পারে। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা একটি শক্তিশালী ও সুস্থ গণতন্ত্রের ভিত্তি হবে। সমালোচনাকে দমন না করে গ্রহণ করার মানসিকতা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া উন্নয়নের ভিত শক্ত হয় না। সরকারি হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন, চিকিৎসা ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র শক্তিশালী করা জরুরি। শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আনতে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নই একটি উন্নত রাষ্ট্রের চাবিকাঠি।
জনগণের প্রত্যাশা বাস্তববাদী হলেও গভীর। তারা জানে সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়, কিন্তু তারা দেখতে চায় সৎ উদ্যোগ, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিকতা। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের জন্য সুযোগও, পরীক্ষাও বটে। এই শক্তি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণে ব্যবহৃত হয়, তবে বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথে এগোতে পারে। আর যদি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও সমালোচনাকে উপেক্ষা করার প্রবণতা দেখা যায়, তবে সেই ম্যান্ডেট দ্রুত প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এখন সেই পরিবর্তনের বাস্তব রূপ দেখতে চায় দেশ। স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং মানবিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠাই হতে পারে নতুন সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি। প্রথম একশ দিনের পদক্ষেপই অনেকটা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পথ। জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট, শক্তিশালী ম্যান্ডেটকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, গণভোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে এবং উন্নয়নকে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান করতে হবে। সেই পথচলাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিগন্ত।