ভারতকে দেখেও কি আমরা সাবধান হবো না?

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 3 May 2021, 06:01 PM
Updated : 3 May 2021, 06:01 PM

মাঝে মাঝে উল্টাপাল্টা ঘটনার ঢেউ এসে বাস্তবতা ঢেকে দেয়। এটাই যেন আমদের দেশের মানুষের নিয়তি। যখন করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ- আমি বলবো দ্বিতীয় ফণা গোপনে দংশনের জন্য তৈরি হচ্ছিল, তখন আমরা উদযাপনে ব্যস্ত। দেশে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে এসেছিলেন একের পর এক রাজকীয় অতিথি। তারা যাওয়ার পর দেশে যখন করোনাভাইরাস আঘাত হানতে শুরু করলো, আমাদের সামনে হাজির হলেন মামুনুল হক। 

হেফাজতের কাহিনী না নতুন, না এর কোনও সমাধান আছে। দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, কিছু মিডিয়া আছে, কিছু মানুষ আছেন- যারা সরকারকে তোয়াক্কা করেন না এবং সেটা তারা পরিষ্কার করে বলেনও। হেফাজতের  আদেশে তাদের পাঠক্রম চলে। তাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় কী আছে, কী নাই- তার সাথে দেশের স্বাভাবিক ধারার মিল আছে কি নাই, সরকার ভালো জানে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সরকার কিছু বলে না। যদিও হেফাজতের নেতা মামুনুল হকসহ বাকিরা এখন ঘোর বিপদে। তাদেরকে একের পর এক মামলায় কাহিল হতে দেখছি। যদি এবারের মতো তাদেরকে দমন করা যায়ও, তবু সেটা সাময়িক। আবার অন্য নামে, অন্য পরিচয়ে হয়তো সামনে তারা মাঠে নামবে।

যদিও মামুনুল হকের বেলায় সরব বুদ্ধিজীবীদের এবারের চেহারাটা কিন্তু ভিন্ন। এবার বলতে নতুন যে ঘটনা তার কথা বোঝাতে চাইছি। মামুনুল হকের বেলায় সরবেরা বসুন্ধরার এমডির বেলায় কেন নীরব? এটা জানতে চললেও বিপদ। সামাজিক মিডিয়ায় রাজাকার ট্যাগ খাওয়ার পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে প্রশ্ন করে, আমি কি মামুনুল হকের সমর্থক? কি বিপদরে বাবা! সত্যিকথা কি একেবারেই নিষিদ্ধ হয়ে গেল আমাদের সমাজে? 

'চরিত্র' বিষয়ক লেখা আজ আমার উদ্দেশ্য না। জাতির চারিত্রিক অধোপতন না নতুন, না কোনও বিস্ময়ের ঘটনা। এমন মুনিয়া, এমন আনবীর- ঘরে ঘরে। তার সমাধান ঘটাতে প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ ও আইনের সঠিক ব্যবহার। সেটা কবে হবে বা হবে কিনা- কেউ জানে না। তাই সেদিকে নজর না দিয়ে আমি বলবো আমাদের জাতির সামনে সমূহ বিপদ করোনাভাইরাস নিয়ে।  বিশেষত ভারতের বেহাল দশা আর সামনে যে ঈদ উৎসব তার আলোকে এখন সাবধানতার বিকল্প নাই। কঠোর সাবধানতা ছাড়া প্রতিবেশী ভারতের মতো অবস্থা কিন্তু আমাদের দেশে এড়ানো যাবে না। ভারত নিয়ে কিছু লেখা বা বলাটাও অনিরাপদ। সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন সমস্যাসহ নানা কারণে নাজুক সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা ও সংখ্যালঘু বিরোধিতা এখন একাকার।

জন্মগত পরিচয় 'হিন্দু' হওয়ার কারণে লেখালেখি করতে এসে যত গালি শুনেছি তার সিংহভাগ ভারতকে জড়িয়ে। দেশবিভাগের দাঙ্গার পর পিতৃকূল ও মাতৃকূলের প্রায় সবাই চলে গেলেও আমার মা-বাবা জন্মভূমি ছেড়ে যাননি। তারা দুইজন ঘুমিয়ে আছেন চট্টগ্রামে। তারপরও আমরা নাকি ভারতের দালাল!

একাত্তরে শরণার্থী হয়ে প্রথম ভারত যাই। বাংলাদেশ তখন রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে লড়ছে। আসাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা হয়ে কলকাতা পৌঁছানো আমরা কোথাও শরণার্থী বলে অপমানিত হইনি। পুরো নয় মাস জুড়ে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের মানুষ দিয়েছিল প্রাণখোলা অকুণ্ঠ সমর্থন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী না থাকলে বাংলাদেশ কতোদিনে স্বাধীন হতো বা আদৌ মুক্ত হতে পারতো কিনা, এ সংশয় থেকেই যায়। এক কোটি শরণার্থীকে খাইয়ে-পড়িয়ে, যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শিল্প সংস্কৃতি, বাণিজ্য, খেলাধুলা সব মিলিয়ে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে। কয়েক বছর পরপর কলকাতা যাওয়া তখন নেশা। সিডনি চলে আসার পর বহুদেশ, বহুজাতি ভ্রমণে অভ্যস্ত হওয়ার পরও মনে হয় ভারত না গেলে যাত্রা পূর্ণতা পায় নি। কারণ ইতিহাস, কারণ অতীত ঐতিহ্য ও সংযোগ।

ভারত মানেই তো  আজমীর শরীফ, অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দির দেখতে গিয়ে জালিওয়ানাওয়ালাবাগে না গেলে হয়! ভারতবর্ষের স্বাধীনতার নান্দীপাঠ রক্তমাখা সে ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ ছেড়ে দিয়েছিলেন তার 'নাইট' উপাধি। দক্ষিণ ভারতে গেলেই মনে পড়ে বিবেকানন্দের কন্যা কুমারিকা। বাঙালি মণীষী, দার্শনিক ঋষি অরবিন্দের পন্ডিচেরী না ঘুরে এলে কি তীর্থ হয়!

বাংলার মানুষ প্রেম পড়লেই যে জিনিসটা গড়ে তোলে তার নাম তাজমহল। মনে তার যমুনার ঢেউ। দিল্লী যাবেন জামে মসজিদ দেখবেন না? কুতুব মিনার না দেখে উপায়  আছে? ভারত শুধু মোদী-মমতার দেশ না। ভারত জাকির হোসেন, অমিতাভ বচ্চন, দীলিপ কুমার, নার্গিস, উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেনের দেশ। আম্বেদকার, এ পি জে আবদুল কালাম, অমর্ত্য সেনের দেশ।

বাঙালির রোজ দরকার পড়ে জয়তীর রবীন্দ্র সঙ্গীত, সুমন, নচিকেতা হয়ে রূপংকরের গান। ভারত মানেই তো রবীন্দ্রনাথ, চুরুলিয়ার নজরুল, গান্ধী, বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, সত্যজিৎ রায়, বিভুতিভূষণ, মানিক, সুনীল, শঙ্খ ঘোষ। 

আজ ভারত মহামারীর যুদ্ধে পরাস্ত হওয়ার পথে। প্রতিদিন চিতার আগুন কবরের মাটিতে কাঁদছে ভবিষ্যৎ। যত সমস্যা, যত অভিমান, যত রাগ অভিযোগ থাকুক সে হিসেব পরে। এখন একটাই প্রার্থনা,  উঠে দাঁড়াক ভারত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিতঃ।

মনে রাখা ভালো নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। এতো নিকটতম প্রতিবেশী, যার সাথে চারদিকে সীমান্ত তার সুস্থতা ব্যাহত হলে আমরাও ভুগবো। ভারত নির্ভরতা আছে একথা মানার পরও, এখন তার সাথে সব ধরনের মানুষ বিষয়ক যোগাযোগ বন্ধ রাখতে হবে। ঈদের সময় কলকাতা ও ভারতের বেশ কিছু জায়গা হয়ে উঠে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। দলে দলে বাংলাদেশী ভিড় জমান সেখানে। এবার যাবেন না বা যেতে পারবেন না। সেটা ঠিক আছে, কিন্তু এক-দুইজনও যদি যান, আর ফিরে আসেন- সেটাই আগুন জ্বালানোর  জন্য যথেষ্ট। তাছাড়া ভারত যেভাবে আজ বিপদের মুখে সে বিপদ যেন আমরা ডেকে না আনি। এই যে ঈদ আর ঈদ নিয়ে আমাদের আনন্দ-উৎসাহ তার সবটাই কি কেবল কেনাকাটা? যে হারে কেনাকাটার ধুম চলছে  তাতে মনে হতে পারে এটাই যেন জীবনের একমাত্র ও শেষ ঈদ। এই যে মা-বাবা-ভাই-বোন-বাচ্চাদের জন্য কেনাকাটা, তারা ভালো না থাকলে কী হবে বাজার দিয়ে? আমরা নিশ্চয়ই চাই না আমাদের শেষ বাজার হোক অক্সিজেন কেনা ? 

ভারতের ঘটনা চোখে আঙুল দেখিয়ে দিচ্ছে করোনাভাইরাস কতোটা ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হতে পারে। ভারতের জন্য আমরা এবং সে দেশের বিবেক কাঁদলেও ভারতের মোদী সরকার নির্বাচন করিয়ে ছেড়েছে। সরকারের কারণে ভারতে করোনাভাইরাস নতুন বল এবং শক্তি পেয়েছে। আমরা যেন আর সে ভুল না করি। ঈদ আবারো আসবে। আবারো আমরা উৎসব করবো। স্বয়ং  ঈশ্বরও বলেন- বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে। পবিত্র কোরানে বারবার যে সংযমের কথা বলা হয়েছে, সেটাই প্রমাণের সময় এখন। 

সিডনি

৩০.০৪.২১

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক