১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কবরের জায়গা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

রাজু আলাউদ্দিন রাজু আলাউদ্দিন

Published : 23 Jul 2012, 10:49 PM

Updated : 25 Jul 2023, 03:34 PM

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দাফন মঙ্গলবার নির্ধারিত হলেও এখনও (রাত ১০ টা, ২৩/০৭/২০১২) পর্যন্ত তাঁকে সমাহিত করার স্থানটুকু নির্ধারিত হয়নি। ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী মরদেহ যত দ্রুত সম্ভব সমাহিত করার পক্ষপাতী বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ।

কিন্তু হুমায়ূনের অনুরাগী বন্ধুবান্ধব, পরিবারের অন্যান্য সদস্য এখনও পর্যন্ত সমাহিত করার স্থান নির্ধারণ বিষয়ে যে অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছেন তা হুমায়ূনের পাঠকদের কাছে তারই কোনো রহস্য উপন্যাসের মধ্যপর্বের মতোই রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে। যে হুমায়ূন আহমেদ জীবদ্দশায় নিপুণ শিল্পীর মতো কাহিনিতে রহস্যের জন্ম দিয়ে পাঠকদেরকে চুম্বকের মতো টেনে ধরে রাখতেন, এখন মৃত্যুর পরে বিনা চেষ্টায় আমাদেরকে আরেক রহস্যের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। এই লেখা লেখার মুহূর্ত পর্যন্ত জানা যাচ্ছে এখনও অবধি স্থান নির্ধারণ নিয়ে মিটিং চলছে।

মিটিংয়ের আগে পর্যন্ত লেখকের ছোট ভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল মীরপুর বুদ্ধিজীবীদের কবরস্থান বা বনানীতে সমাহিত করার পক্ষে বলেছিলেন। এক টিভি চ্যানেলে তিনি এ-ও বলেছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ইচ্ছা ও অনুমোদন সাপেক্ষে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশেও সমাহিত হতে পারেন। কিন্তু হুমায়ূনের স্ত্রী শাওন বরাবরই বলে আসছেন তাঁকে নূহাশপল্লীতেই কবরস্থ করা হোক।

হুমায়ূনকে সমাহিত করা নিয়ে এখন বলতে গেলে দুটি পক্ষ সক্রিয়। এক. লেখকের ছেলেমেয়ে এবং ভাইবোন, দুই. স্ত্রী শাওন। বনানী, মীরপুর কিংবা নূহাশপল্লী বা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, যেখানেই হোক না কেন, কী এমন পার্থক্য? যে লেখক গোটা বাংলা ভাষার তথা বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পাঠকদের হৃদয়ে দ্বিধাহীন জায়গা করে নিয়েছেন তাঁকে কবরস্থ করার জায়গা নির্ধারণ নিয়ে তার পরিবারের লোকজন দ্বিধা বিভক্ত হয়ে আছেন।

এমন যদি হত যে, এই দ্বিধা-বিভক্তি সমাধিক্ষেত্রে অগণিত পাঠক ও অনুরাগীদের সহজগম্যতার কথা মাথায় রেখে কিছু একটা ভাবা হচ্ছে তাহলে বলতেই হয় সেটা দেশের যে কোনো জায়গাতেই তো হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় সে রকম কিছু মাথায় রেখে ভাবা হচ্ছে না বিষয়টি। এ বিষয়ে সাম্প্রতিকতম সংবাদের ভিত্তিতে তাদের দ্বিধার মধ্যে টানাহেঁচড়ার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। টানাহেঁচড়ার পেছনে সাহিত্যিক কারণ যে নেই তা পরিস্কার। হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয়তার মাধ্যমে বিপুল বিত্তের অধিকারী না হলে এই কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের ব্যাপারটি আসত কি না সন্দেহ। বিত্তবান শিল্পীদের মৃত্যু-পরবর্তী অনেকের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটেছে। জায়গা নির্ধারণের পরিবর্তে যদি লেখক হিসেবে তাঁকে স্মরণ করা বা বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে হত তাহলে বলতে হয় বাংলাদেশের যে কোনো জায়গাতেই তো তাঁর সমাধি হতে পারে।

পৃথিবীর এমন অনেক লেখক আছেন যারা এমনকি নিজের দেশেও সমাহিত নন। বিখ্যাত আইরিশ লেখক অস্কার ওয়াইল্ডের কবর প্যারিসে। শুধু ওয়াইল্ডই নন, মার্কিন গায়ক জিম মরিসন, ইরানের প্রথম সারির লেখক সাদেক হেদায়াত, গুয়াতেমালার নোবেল বিজয়ী লেখক মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস, পেরুর কবি সেসার বাইয়েহো প্যারিসেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস জেনেভায় সমাহিত। আর একেবারে সদ্যপ্রয়াত মেক্সিকোর লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস– লেখকের নিজের ইচ্ছায়– প্যারিসেই সমাহিত হয়েছেন।

অনেকেই জানেন কি না জানি না, বাংলার রেনেসাঁ যুগের অন্যতম প্রাণপুরুষ বাঙালি লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামমোহন রায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন ব্রিস্টলের স্ট্যাপলটনে। তাঁকে সমাহিতও করা হয়েছিল ব্রিস্টলেই। কিন্তু প্রবাসে সমাহিত হওয়ার কারণে লেখক হিসেবে তারা ম্লান বা বিস্মৃত হয়ে গেছেন– এমনটা বোধহয় কেউ-ই বলবেন না।

কবরের জায়গা এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবার পেছনে কি মাজার-সংস্বৃতির প্রতি আমাদের স্বভাবিক প্রবণতারই একটি পরোক্ষ প্রকাশ?

বাংলা ভাষার এই লেখককে যদি সত্যি সত্যিই মৃত্যুর পরও বাঁচিয়ে রাখতে হয় তাহলে যে কোনো জায়গাতেই তাঁকে সমাহিত করা যেতে পারে। সমাহিত করা নিয়ে টানাহেঁচড়া না করে বরং যেটা বেশি জরুরি তা হল তাঁর সাহিত্যকৃতি নিয়ে একটি চর্চাকেন্দ্র তৈরি করা। তাঁর সাহিত্যকর্ম মূল্যায়নের পথ সুগম করতে পারলেই বরং তাঁকে পুনর্জীবিত অবস্থায় আমরা পাব। তাঁর স্বপ্নের নূহাশপল্লীকে বাঁচিয়ে রাখা এবং তাঁর কাঙ্ক্ষিত ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য যদি তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা এগিয়ে আসেন তাহলেই আমরা হুমায়ূন আহমেদের প্রতি মৃত্যুত্তোর সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারব।