ক্যান্সার ছাড়িয়ে নতুন জীবনের পথে

আমার কাছে ক্যান্সার জার্নি কেবল নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নয়। বরং ক্যান্সার আমার জীবনকে ‘আমার থেকে আমাদের করে’ গ্রহণ করবার অবকাশও দিয়েছে। নিজের কষ্ট-যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে সমষ্টির দুর্ভোগ অনুভবের তাগিদ দিয়েছে।

জাহান-ই-গুলশান শাপলা
Published : 4 Feb 2024, 09:16 AM
Updated : 4 Feb 2024, 09:16 AM

ক্যান্সার শব্দটি জনমনে ভয়, আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তাসহ নানা নেতিবাচকতা প্রতিধ্বনিত করে। এর বাস্তব কারণও রয়েছে। তবে আমার কাছে ক্যান্সার জার্নি কেবল নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নয়। বরং ক্যান্সার আমার জীবনকে ‘আমার থেকে আমাদের করে’ গ্রহণ করবার অবকাশও দিয়েছে। নিজের কষ্ট-যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে সমষ্টির দুর্ভোগ অনুভবের তাগিদ দিয়েছে।

নিজের ক্যান্সার জার্নির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ক্যান্সার নিয়ে মানুষের কষ্টই কেবল দেখিনি। আক্রান্তের প্রতি পরিবার-স্বজন বা একেবারে অপরিচিতদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখেছি। আমি নিজেও অপার ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছি। সেজন্য নিজেকে বলি, ক্যান্সার জার্নি কেবল আমাকে নতুন জীবনই দেয়নি, দিয়েছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও। দিয়েছে সমাজের সম্মিলিতের শক্তির ওপর ভরসা করবার সাহস।

ক্যান্সারের সঙ্গে প্রথম পরিচয় আমার ভীষণ মানবিক মাতামহী খাদিজা খাতুনের সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার পর। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে। চরম ধাক্কা খেলাম যখন চিকিৎসকরা জানালেন, কিছুই করবার নেই। বলা চলে, কিছু না করতে পারার অক্ষমতা নিয়ে আমাদেরকে চেয়ে চেয়ে আমার নানীমার চলে যাওয়া দেখতে হয়।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল দিনে সমচিন্তার অগ্রজ ও বন্ধু সংবাদকর্মী কর্মমুখর নাহিদ জাহান লিনা যখন ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন, আমি হতবাক হলাম। তবে ক্যান্সারকে পরোয়া না করে নানা উদ্যোগে লিনা আপার যুক্ততা দেখে ক্যান্সারের প্রতি ভয়টা কেটেই গেল বলা চলে। যদিও লিনা আপার চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহকালে আমার ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি আমিও একদিন আক্রান্ত হতে পারি! অথচ ২০২০-এর নভেম্বরে হিস্টেরেক্টমি করার পর বায়োপসি রিপোর্টে আমার ওভারিতে ক্যান্সার সেলের অস্তিত্বের খবর জানা গেল।

সার্জারির আগে আমার চিকিৎসকের কাছে টানা সাত বছর চিকিৎসা নিয়েছি। এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা নিতে গিয়ে বহুবারই আমার ডাক্তারের কাছে ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে কিনা জানতে চাইতাম। তিনি সবসময়ই বলতেন এ থেকে ক্যান্সার হয় না। কিন্তু আমার ‘এন্ডোমেট্রোয়েড কার্সিনোমা’ শনাক্ত হয় যা এন্ড্রামেট্রাসিস বলে ধারণা করা হয়! যদিও প্রথমে ঢাকার দুটি স্বনামধন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার আমার বায়োপসি রিপোর্ট ও তার রিভিউতে ক্যান্সারটিকে অতি ভয়ঙ্কর মিউসিনাস টাইপ হিসাবে শনাক্ত করেছিল, যা ছিল ভুল। যেহেতু সার্জারির আগে আমার ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়নি তাই ক্যান্সার প্রটোকল ছাড়াই আমার সার্জারি হয়। যার কারণে আমি গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে যাই।

সার্জারির পর আমি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার ক্ষুদ্রান্ত্র কাজ করছিল না (ইনটেস্টাইন অবসট্রাকশন)। সার্জারির থার্ড ডে-তে আমি একটুখানি স্যুপ মুখে দিতে না দিতেই পেটে প্রচণ্ড ব্যথায় কুঁকড়ে যাই। কোনোমতেই সেই ব্যথা কমে না। পরে পেইন কিলার দিয়ে ব্যথা কমানো হয়। সে সময় এনজি মানে আমার নাকে নল লাগিয়ে বুক পর্যন্ত দিয়ে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল পাকস্থলিতে কিছু জমে থাকলে তা যেন বেরিয়ে আসতে পারে। কোনোরকম অ্যানেসথেশিয়া ছাড়া যে এনজি করা হয় তা আমার জানা ছিল না। আমাকে কোনোরকম কাউন্সিলিং না করে চিকিৎসক আমার এনজি করেন। ফলে এটি গ্রহণ করতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। এনজি করার পর আমার প্রথমবার নিজেকে ভীষণ অসহায় এবং গুরুতর অসুস্থ মনে হতে লাগল। কথা বলতে পারছিলাম না। পাশ ফিরতে কষ্ট হতো। সবচেয়ে বড় বিষয় আমার মন ভেঙ্গে যায়।

এটুকুতেই কষ্ট থেমে থাকল না। সার্জারির পর আমি ক্রমাগত ডান পায়ে অসহনীয় ব্যথা টের পাচ্ছিলাম। ডাক্তারকে দেখাই। তিনি জানালেন পায়ে ক্যানোলা করার জন্য একটু ব্যথা হয়েছে, তা দু-দিনেই সেরে যাবে। কিন্তু দিন দিন সে ব্যথা চরমে উঠল। পা লাল হয়ে ফুলে গেল। এবার অন্য এক ডাক্তার ভিজিটে এলে তাকে পা-টা দেখালাম। তিনি প্রায় আঁতকে উঠে বলেই ফেললেন, এত সেলুলাইটিস। কতদিন ধরে সমস্যাটা তাও জেনে নিলেন। কেন অন্য ডাক্তার বিষয়টি আমলে নেননি সেজন্য খানিক খেদ প্রকাশও করলেন। শুরু হলো আমার সেলুলাইটিসের সঙ্গে লড়াই। সেইসঙ্গে হাতের ক্যানোলা দু-দিন পর পর বদলাতে হতো। শিরা দুর্বল হয়ে পড়ায় একবারে ক্যানোলা করা যেত না। বারবার চেষ্টা করতে হতো। দু-হাত ফুলে গেল। পা, হাত সব যেন বন্দি হয়ে পড়ল। আর ক্যানোলা করার জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। খেতে না পারায় প্রোটিনের অভাবে মাংসপেশী ভেঙ্গে ১০ কেজি ওজন হারাই। অথচ কেমোথেরাপির জন্য এই স্বাস্থ্যটুকু ভীষণ প্রয়োজন। 

হাসপাতালে এ রকম নানা জটিলতা-ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে টানা বিশদিন পর আমি বাসায় ফিরি। তখনো জানি না সামনে আরও লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে। আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম ৩-৫ দিন থাকব বলে। আমাকে ডাক্তার এমনটিই বলেছিলেন। হাসপাতালে থাকাকালে প্রায়ই মেডিকেল স্টুডেন্টদের নিয়ে অধ্যাপকরা আসতেন, নানা বিষয় হাতে-কলমে শেখাতেন। আমাদের হবু চিকিৎসকরা আমাদের কেইস স্টাডি করুন, শিখুন তাতে কোনোই আপত্তি নেই। বরং আনন্দিত হই, তাদের কাজে আসতে পারছি বলে। তবে কোনোরকম সভ্যতা-ভব্যতা না দেখিয়ে, না জানিয়ে, অনুমতি ছাড়াই আমার বেডের পাশে এমন ক্লাস নেয়া একদমই ভালো লাগেনি। আমার নিজেকে এতে কেমন গিনিপিগ গিনিপিগ লেগেছিল। আমি জোর দাবি করছি, যে কোনো রোগীকে কেইস হিসেবে নেবার আগে যেন তার অনুমতি নেয়া হয়। এতে ডাক্তার রোগীর সম্পর্কও অধিকতর আন্তরিক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাসায় ফেরার পর লক্ষ্য করি যে, পরিবারের লোকেরা নিচুস্বরে কথা বলছে। কখনো দরজা ভিড়িয়ে পরামর্শ করছে। আমি তখনো স্বাভাবিক খাবার খেতে পারি না। জাউ ভাত, স্যুপ, জুসই প্রধান খাবার আমার। তাও আবার ২/৩ চামচ। কারণ খাবার দাবারে একটু হেরফের হলেই প্রচণ্ড পেট ব্যথা শুরু হতো। তখনো আসলে আমার ইনটেস্টাইন ঠিকঠাক কাজ করছিল না। আরও কয়েকমাস আমি ঠিকমতো খেতে পারিনি।

একদিন ডাক্তার বন্ধু হেমন্ত রায় হিম বাসায় এল আমাকে দেখতে। সরাসরি ওর কাছে জানতে চাইলাম আমার অসুখটা আসলে কী? এতদিনেও ব্যথা সারছে না কেন? ক্ষুদ্রান্ত্র ঠিকঠাক হতে কতদিন লাগবে?

ও খুব শান্ত স্থিরভাবে জানাল যে, বায়োপসিতে ওভারিয়ান ক্যান্সার এসেছে। তবে সেটা ভুলও হতে পারে। তাই দেশের বাইরে গিয়ে আবারও চেকআপ করা হবে। আমি যেন ততোধিক শান্তভাবে সব শুনলাম। তারপর বাসার সবাইকে বললাম, ক্যান্সার তো মানুষেরই হয়। আমাকে আগে বলো নাই কেন? সেদিন থেকে সবার সঙ্গে আলোচনায় আমিও যোগ দিতে শুরু করলাম। কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কী কী তথ্য দরকার এসব। আমি নানাজনকে ফোন করে তথ্য খুঁজতে থাকি। ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন আমার রোকেয়া হলের এক সিনিয়র আপার ওভারিয়ান ক্যান্সার ছিল জানতে পারি। তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই আপুর সঙ্গে কথা হতো। আপুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে জানতে এবং বুঝতে পারলাম আমার সার্জারিটা ঠিকঠাক হয়নি। তবে আপুর সক্রিয় জীবনযাপন দেখে আমি প্রবল আশাবাদী হলাম যে, ক্যান্সার মানেই সব শেষ নয়। আমিও ভালো থাকব। 

এসময় সবচেয়ে বেশি যে চিন্তাটা ভর করল তা হলো ক্যান্সারের চিকিৎসা কতদিন লাগবে? কত টাকা খরচ হবে? এসব ভেবে দেশের বাইরে যেতে আমি অনাগ্রহী হলাম। তবে পরিবারের লোকেরা ‘আর যেন কোনো ভুল না হয়’ সেজন্য দেশের বাইরে যেতে সিদ্ধান্ত নিলেন। শুরু হলো ভারতের মুম্বাইয়ে টাটা মেমোরিয়াল ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাবার প্রস্তুতি। দেশে আরও নানা ভুলের শিকার হবার পর আমিও যেতে সম্মত হই। ২০২০-এর ডিসেম্বরের এক সকালে মুম্বাই পৌঁছি। সেখানে পরিবার-বন্ধু-স্বজনদের আর্থিক সহযোগিতায় ছয় সার্কেল কেমো নিই। ওখানে ক্যান্সার চিকিৎসা আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ নিয়ে করা হয়। আমি যাবার পর আমার নানারকম টেস্ট চলতে থাকে। ম্যামোগ্রামে আমার ব্রেস্টে একটি অতিছোট্ট লিশন ধরা পড়ে। সেই ছোট্ট লিশনটা সার্জারি করা হয়। ডাক্তাররা নিশ্চিত হন যে এটি বেনাইন। তারপর তারা আমার কেমোথেরাপি শুরু করেন। টানা পাঁচ মাস পর দেশে ফিরে আসি।

দেশে ফিরে আসাটা ছিল আরেক মহাদুর্ভোগ। তখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসেছে। ভারতের অবস্থা খুবই শোচনীয়। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হলো। অগত্যা আমরা মুম্বাই থেকে আগরতলা যাই। সেখানে একরাত থেকে আখাউড়া পা রাখি। কিন্তু তখনো আমরা জানি না নতুন বিপাক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আখাউড়া চেকপোস্টের হেলথ বুথ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য মুগদা হাসপাতালে নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভারত ফেরত সবাইকে পুলিশ কর্ডন দিয়ে নিয়ে আসা হয় আখাউড়া উপজেলার রজনীগন্ধা হোটেলে। লো ইমুউনিটির আমার জন্য পুরো পরিবেশটাই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাত্র দিন ১৫ আগে আমার শেষ কেমো দেয়া হয়েছে। খাওয়া-দাওয়াসহ নানা কিছুতেই অনেকরকম বিধি-নিষেধ। সেইসঙ্গে নিজের করোনাক্রান্ত হবার মস্ত ঝুঁকি। কেমো চলাকালে আমার হাড় খুব নাজুক হয়ে গিয়েছিল, হাঁটতে গিয়ে পড়ে গিয়ে বাঁ পা গুরুতর ফ্রাকচার হয়। হোটেলে রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে পরদিন মুগদা হাসপাতালের কোয়ারেন্টিনের জন্য রওনা দিই। মুগদা হাসপাতালে টানা চৌদ্দদিন আমরা মানে আমি আর আমার পরিচর্যাকারী দুজনই থাকি।

কিন্তু সেখানে ভারত থেকে আগত আমাদের আর দুটো পরিবারকে একেবারে না জানিয়ে রুমের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। আমরা যেন রুমের বাইরে না যেতে পারি সেজন্য। তাদের কে বোঝাবে যে, নিজের বিপদ ডেকে আনতে আমরা কেন করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ঘোরাফেরা করব! আমাদের প্রবল আপত্তির মুখে সেই তালা খুলতে বাধ্য হন। হাসপাতালে প্রতিদিন সকালে আমাদের বন্ধু প্রিয় অগ্রজ মাসুদ খান যেত খাবার নিয়ে। দুপুরে আমার ভাই জাওয়াদ। নানা সুরক্ষা নীতি মেনে ওরা খাবার দিয়ে আসত হাসপাতালের স্টাফদের কাছে। মাসুদ ভাই আমাদের সঙ্গে মুম্বাইয়ে গিয়ে টানা একমাস ছিল। এটি যে আমার জন্য কত বড় সাপোর্ট ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। অবশেষে মুগদা হাসপাতাল থেকে চৌদ্দদিন পার হলে এবং ৩ দফায় করোনা নেগেটিভ হওয়ায় আমরা ছাড়া পাই।

মুম্বাইয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেখেছি, বাংলদেশের রোগীদের বেশিরভাগই দেশে ভুল হবার পর বাইরে চিকিৎসা করতে যান। তারা কেউই দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে চান না। আক্ষেপ হতো যে, দেশ থেকে কেবল চিকিৎসার জন্য বছরে কত কোটি টাকা অন্য দেশে চলে যাচ্ছে! আর স্বজনহীন বিভুঁইয়ে রোগীদের পদেপদে কষ্টের তো কোনো সীমা থাকে না।

আরও লক্ষ্য করি যে, ক্যান্সারাক্রান্তের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও দরকারি তথ্যের প্রচণ্ড অভাব। বলে রাখি, আমি দেশে ফেরার পর থেরাপিস্ট শাহমিকা আগুনের কাছে কাউন্সিলিং সেবা নিই। আমাদের অগ্রজ বন্ধু রুমানা হাশেমের সহযোগিতায় আমি আগুনের কাছে সেশন নিয়ে খুব উপকৃত হই। আমার নিজের বেলাতেও ওভারিয়ান ক্যান্সার নিয়ে আমার যা যা প্রশ্ন মনে আসত সেসবের উত্তর খুঁজে পেতাম না। তেমন কাউকে পেতেও লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়। কারণ ক্যান্সার নিয়ে নানা ট্যাবু ও হয়রানির আশঙ্কায় আক্রান্তরা রোগের কথা প্রকাশ করতে চান না। এসব দেখেশুনে নানা কিছু করবার ভাবনা পেয়ে বসত। আবার নিজের সুবিধাপ্রাপ্ত অবস্থান থেকে যারা বিদেশে তো দূরের কথা দেশেই ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারেন না তাদের কথা ভেবে খুব কষ্ট হতো।

এসব কিছু ভাবতে ভাবতে কেমন বিষণ্নবোধ করতাম। দেশে ফিরে বিষাদ কাটাতে “Beyond Cancer: My Journey Towards A New Life নামে পেইজ করে লিখতে শুরু করি। আমার ক্যান্সার জার্নির অভিজ্ঞতা, ভুল, শিক্ষা এসব শেয়ার করি। লেখার সুবাদে পরিচয় হয় সমমনা সার্ভাইভার, কেয়ারগিভার এবং স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। সাহসী, উদ্যমী সার্ভাইভারদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় চলতে থাকে। তখন আমরা লক্ষ্য করি যে, আমরা পরস্পকে খুব সহজে বুঝতে পারি। আমাদের অভিজ্ঞতা আমাদের শক্তি যোগায়। আমরা প্রায় সবাই যার যার মতো করে পরিচিত, অপরিচিত নানাজনকে তথ্য সহযোগিতাও দিতে থাকি। আর নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে আক্রান্তদের মনোবল বাড়াতে সহযোগিতা করি। ক্যান্সার চিকিৎসায় মনের জোর ধরে রাখা খুব জরুরি। একসময় আমরা আমাদের ব্যক্তিগত সেবাগুলো সম্মিলিতভাবে দেবার ব্যাপারে ভাবতে শুরু করলাম। সেই সঙ্গে ‘কিছু একটা করা’র প্রবল তাড়না আমাদের কথায় প্রকাশ পেত। আমরা চাইতে শুরু করলাম আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন আর কোনো ক্যান্সারাক্রান্তের ক্ষেত্রে না ঘটে।

সেই আন্তরিক সদিচ্ছাকে পাথেয় করে নিজেদের অভিজ্ঞতা সবার সামনে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে আমরা ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উদযাপন করি। সেখানে ক্যান্সার চিকিৎসা ও প্রতিরোধে কিছু দাবিও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তুলে ধরি। অনুষ্ঠানের উপস্থিতি আমাদের ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। আমাদের ‘কিছু করবার’ ঐকান্তিক ইচ্ছার সঙ্গে সবার অনুপ্রেরণা আমাদেরকে সংঘবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করে। আমরা উপলব্ধি করতে পারি, আমাদের অভিজ্ঞতা, সদিচ্ছা আমাদের মতো আরও অনেকেরই রয়েছে। আমরা একটি ফোরামে সংযুক্ত হয়ে এ দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারি। ভূমিকা রাখতে পারি ক্যান্সার সচেতনতা ও প্রতিরোধে। এসব ভাবনার আনুষ্ঠানিক রূপ হিসেবে ক্যান্সার কেয়ার কমিউনিটি, বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। পরে নামটা খানিক বদলে হয়, সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)। আমাদের সঙ্গে ক্যান্সারে স্বজন হারানো পরিবারের সদস্য, ক্যান্সার সচেতনতা ও প্রতিরোধে কাজ করতে আগ্রহী অনেকেই যুক্ত হন।

৩ জুন ২০২৩, আমরা ক্যান্সার সার্ভাইভার দিবসে প্রথমবারের মতো ক্যান্সার নিয়েও যারা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন, তাদের সম্মাননা জানাই। এভাবে গুটি গুটি পায়ে অনেক বিশাল স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগুচ্ছি আমরা। আমরা এখন সচেতনতার জন্য প্রতিমাসে অনলাইনে ‘জানি এবং জানাই’ নামে একটি অনুষ্ঠান করছি। যেখানে ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞ এবং সার্ভাইভাররা। নিজেরা ব্রেস্ট সেল্ফ এক্সামিন করা শিখেছি। অন্যদেরও শেখাচ্ছি। আমাদের টিমমেটদের দুজন ক্যান্সার কাউন্সিলর হিসেবে ভূমিকা রাখছেন।

আমাদের সামর্থ্য কম। কিন্তু আকাশসম সদিচ্ছা নিয়ে এসেছি। আমরা চাই দেশের সব মানুষ যেন সুলভে-সহজে দেশেই বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসা করাতে পারে। তার জন্য অবিলম্বে নীতিমালা প্রণীত হোক; তার বাস্তবায়ন হোক। আমরা চাই জাতীয় ক্যান্সার তহবিল গঠন হোক। আক্রান্তরা চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য দুর্ভাবনায় না পড়ুক। বিষময় খাদ্য ও পবিবেশ দুষণমুক্ত হোক। আমরা যা চাই তা একা আমাদের পক্ষে কোনোমতেই করা সম্ভব নয়। আমাদের এসব চাওয়া আসলে সমাজেরই চাওয়া। এগুলো পূরণ হতে পারে সমাজের সবাই এগিয়ে এলে। আমরা প্রত্যাশা করি, নিশ্চয়ই সবাই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। 

এখন আমার কোনো ডিপ্রেশন নেই। আমার পেইজে লেখার প্রয়োজনও অনেকখানি ফুরিয়েছে। এখন আর আমি একা নই। দেশের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ক্যান্সার লড়াকুরা আছেন সঙ্গে। লিখেছেন নিজেদের উপাখ্যান। সেসব পড়ি, আগামী দিনের কাজ ঠিক করি। মগজে এখন কেবল ইতিবাচক ভাবনা খেলে যায়। আর মন বলে, আমার মুক্তি এই বিপুল লড়াকু জনারণ্যে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)

(সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘এখানে থেমো না’ বইয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে)