আমার ক্যান্সার কাউন্সিলর হয়ে ওঠার গল্প

ছয় বছর আগে রোগের কথা ভেবে ভেঙে পড়া আমি এবং এখনকার ‘আমি’ এক নই। মননে এসেছে বিস্তর পরিবর্তন।

রোকশানা আফরোজ
Published : 4 Feb 2024, 07:53 AM
Updated : 4 Feb 2024, 07:53 AM

দিনটি ছিল ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। জানতে পারলাম, আমি ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত। অর্ধযুগেরও বেশি সময় পার করে ক্যান্সার নিয়ে আমার বসবাসের দিনগুলো নিয়ে লিখতে বসেছি। পেছন ফিরে দেখি কখনো রোলার কোস্টার, তো কখনো সাপ-লুডু খেলা। ক্যান্সার সঙ্গী করে এভাবেই চলছে যাপিত জীবন। তবে ছয় বছর আগে রোগের কথা ভেবে ভেঙে পড়া আমি এবং এখনকার ‘আমি’ এক নই। মননে এসেছে বিস্তর পরিবর্তন। ওই পরিবর্তনের গল্পটাই লিখব কেবল।

২৩ ফেব্রুয়ারির ২০১৭ আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে সিএমএইচে গেলাম। এর কিছুদিন আগ থেকেই ভীষণ কাশি ছিল, কথাই বলতে পারতাম না কাশির জন্য। আমার বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুন ভাবির জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই সিএমএইচ যাওয়া। যে ডাক্তার আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে ছিলেন তিনি প্রশ্ন করলেন, কী সমস্যা আপনার? আমি বললাম, বেশ কিছুদিন থেকে কাশি, ওজন বেড়ে গেছে অনেক আর পেটটা বড় হয়ে যাচ্ছে। তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন— এখনই গাইনি ডাক্তারের কাছে যান। আমি পিছলে যেতে চাইলাম, পারলাম না।

আমার জীবনসঙ্গী সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ওই সময় তার পোস্টিং যশোরে ছিল। আমরাও যশোরে থাকতাম। ঢাকায় তার অফিসের এক অনুষ্ঠানে এসেছিলাম দু-দিনের জন্য। সে অনুষ্ঠানেই আমি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লাম। কিন্তু ফিরে যাবার কথা যশোরে, তাই তাড়াহুড়ো করছিলাম। রিপোর্ট নিয়ে গেলাম সাইফুন ভাবীর কাছে। অনেকদিন পর দেখা। প্রথমে খুব খুশি হলেন আমাকে দেখে। কিন্তু রিপোর্ট দেখে ভাবি দাঁড়ানো থেকে বসে পড়লেন। প্রচণ্ড হতাশা থেকে রীতিমতো রেগে গেলেন। বললেন, ‘আপনি আগে আসেননি কেন? পেট ভর্তি পানি, বড় বড় দুটো টিউমার। এখনই ভর্তি হন। অশিক্ষিত নাকি?’ আমি গাঁইগুঁই করার সুযোগই পেলাম না। যশোর ফেরা হলো না, ভর্তি হয়ে গেলাম ঢাকা সিএমএইচ-এর অফিসার্স ওয়ার্ডের টিয়া কেবিনে।

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। ভেবেছিলাম ছুটির দুদিন চিকিৎসার কিছুই হবে না। কিন্তু ভীষণ দ্রুততায় আমার চিকিৎসা শুরু হলো। এর পেছনে আমার বন্ধু সাইফুন ভাবীর ভূমিকা অনেকটুকু। একদল ডাক্তার তখনই এসে হাজির। আমি ৩ বাচ্চার মা, তাই বিভিন্ন সময় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে যেতে হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত মানুষ থাকে সেটা রোগীর জন্য ভীষণ বিব্রতকর। আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী সামিনা হক শাম্মীর কাছ থেকে কিছুদিন আগে জেনেছি ‘রোগীর আত্মমর্যাদা’র বিষয়টি। যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হই, তখন এ ব্যাপারটি নিয়ে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তবে সিএমএইচেও আমি এ ব্যাপারটি তখন অনুভব করতাম। বিব্রত লাগত।

এখনো আমাদের দেশেই শুধু নয় বিদেশেও রোগীর আত্মমর্যাদাসহ রোগীর স্পর্শকাতর বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।

শুরু হলো আমার চিকিৎসা। ভীষণ হাসি-খুশি ডাক্তার আজিজ, তখন (ব্রিগেডিয়ার ছিলেন, এখন তিনি মেজর জেনারেল) আমাকে দেখতে এলেন। তিনি একজন অনকোলজিস্ট। সত্যিকার অর্থে অনকোলজিস্ট অর্থ যে ক্যান্সারের ডাক্তার সেটাও আমি তখন জানতাম না। প্রথমেই পেট থেকে প্রায় আড়াই লিটার পানি বের করা হলো। ভীষণ আরাম পেলাম, কাশি কমে গেল। আমি ভাবলাম— বাহ! সুস্থ হয়ে গেলাম।

সন্ধ্যায় আমার ডাক্তার ভাই, ভাবী, আম্মাসহ হাসপাতালে চলে আসলেন। গম্ভীর মুখে সবাই কাগজপত্র দেখছে আর আমি মহানন্দে সবার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। পরবর্তী দু-দিন আমাকে অনেক জটিল ও কষ্টকর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে যেতে হলো।

২৬ ফেব্রুয়ারি কোন ভূমিকা ছাড়াই আমাকে জানানো হলো, আমার ক্যান্সার চতুর্থ পর্যায়ে। ওভারিতে প্রথমে কেমো দেওয়া হবে, পরে সার্জারি করা হবে। আমি সুবোধ মেয়ের মতো মাথা নাড়লাম। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে দেখি ভয়াবহ অবস্থা! আমার মাথার কাছে বসা ছিলেন আম্মা, মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে গেলেন। মাথায় পানি দেওয়া, ডাক্তার ডাকা, দৌড়াদৌড়ি। আমার জীবনসাথী যাকে সবাই রোবট বলে, চোখের পানি ঢাকতে ছুটে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।

কিছুদিন আগে দু-দিনের প্রশিক্ষণ সেশন করেছিলাম প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ওপর। সেখানে— Breaking the bad news বা দুঃসংবাদ দেওয়ার রীতি সম্পর্কে জানতে পেরেছিলাম। অর্থাৎ দুঃসংবাদ দেওয়ারও কিছু রীতি রয়েছে। আমরা কি এটা নিয়ে সচেতন? সম্ভবত না।

বাকি সব ক্যান্সারযোদ্ধার মতো আমারও গল্পের পরের ধাপটা প্রায় একই রকম। দেশে-বিদেশে চিকিৎসা চলতে থাকে। কেমো, সার্জারি, ওষুধ। ভীষণ ব্যয়বহুল চিকিৎসা। প্রতিমুহূর্তের অনিশ্চয়তা, আয়নায় বদলে যাওয়া নিজের প্রতিবিম্ব। বদলে যাওয়া জীবন। চেষ্টা করলাম খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে নিজেকে ঠেকিয়ে রাখতে যাতে মন্দ চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। তবুও ঠিক দেড় বছর পর মাথাচাড়া দিয়ে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে ক্যান্সার ফিরে এল। এবার লিভারে। আবার সেই চিকিৎসা। আমার পাশে আমার পরিবার ছিল ছায়ার মতো। বন্ধুরা ঘিরে রেখেছিল দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো। ভেঙ্গে যেতে যেতে, ক্ষয়ে যেতে যেতে বারবার আমি উঠে দাঁড়িয়েছি।

কোভিড মহামারীর সময়ে গৃহবন্দি। তখনই মনে হলো, নিজের জন্য তো বটেই বাকি সব ক্যান্সার রোগীর জন্য কী করতে পারি! তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ঘরে বসেই অনলাইনে ক্লিনিকাল মেন্টাল হেলথের ওপর একটি কোর্স করে ফেললাম। এরপর অনলাইনে ক্যান্সার কাউন্সিলিংয়ের ওপর বেশ ক’টা কোর্স করলাম।

আমার পাশে সব সাহসী মানুষ দেখে ভাবি আরও আগে কেন পরিচয় হলো না এদের সঙ্গে! সুমী আপার ‘প্রশান্তি’ সত্যিই প্রশান্তি, ছোট্ট ছেলে আয়মানকে হারিয়ে শোককে শক্তিতে পরিণত করা এক মা তিনি।

শাপলা, মিষ্টি মেয়েটা একজন সরকারি কর্মকর্তা। ও নিজেও লড়ছে ওভারির ক্যান্সারের সঙ্গে। ওর তথ্যসমৃদ্ধ লেখাগুলো সমৃদ্ধ করে আমার মতো অনেককে।

ড. রুবিনা হোসেন ক্যান্সারকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে জীবনযুদ্ধে সফল এক যোদ্ধা। সফল উদ্যোক্তা, সমাজের উন্নয়নে ‍ভূমিকা রাখছেন প্রতিনিয়ত। প্রতি মুহূর্তে আমি উদ্বুদ্ধ হই এইসব মানুষদের দেখে।

বারবার বাধা আসে। থেমে যাই। আবার ঘুরে দাঁড়াই। কখনো হতাশা চেপে রাখি, বুঝতে পারে না পাশে থাকা মানুষগুলোও। কষ্ট, হতাশা, অনিশ্চয়তার বেদনা বালিশে চেপে, কান্না মুছে আবার উঠে দাঁড়াই। সাহিত্যের ছাত্রী আমি। কিন্তু এই কয় বছরে ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছি মনোবিজ্ঞানের দিকে।

প্রবল আগ্রহ থেকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান পড়তে শুরু করেছি। আমার উদ্দেশ্য যেন আরও ভালোভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষদের এবং তাদের স্বজনদের সেবা দিতে পারি। ক্যান্সারাক্রান্তদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সিলিং সেবা যেন প্রতিটি হাসপাতালে থাকে সে দাবি জানাচ্ছি আমরা সিসিসিএফ থেকে। কারণ ক্যান্সারের মতো একটি রোগের সঙ্গে লড়াই করবার জন্য প্রবল মনের জোর থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সমাজকেও অত্যন্ত মানবিক আচরণ করতে হবে।

এক সময় আমি শিক্ষকতা করেছি। ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার পর সেটা ছাড়তে হয়েছে। খুব কষ্ট পেয়েছি। ক্লাসরুম, পড়ানো খুব মিস করতাম। কিন্তু যেদিন থেকে আমার সহযোদ্ধা বা তাদের পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম, তারা আমাকে বিশ্বাস আর ভরসা করে ভালবেসে নিজেদের কষ্ট, অসুবিধাগুলো বলতে শুরু করলেন সেদিন যেন আমি আবারও নতুনভাবে জেগে উঠলাম। সেশন নেবার পর যখন সহযোদ্ধাদের মুখে আত্মপ্রত্যয়ের আভা দেখতে পাই তখন অপার শান্তি পাই। আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কখনো তাদের বুকের জমাট বাঁধা কান্না বেরিয়ে আসে। যে কথাটা হয়তো সে কাউকে বলতে পারে না— আমাকে বলে হালকা হয়। এটাই আমার পরম প্রাপ্তি। ক্যান্সার কাউন্সিলিং নিয়ে আমার এই পথচলাকে আমি আরও বিস্তৃত করতে চাই। সেজন্য আমরা সিসিসিএফ আপনাদের সবাইকে আমাদের পাশে চাই। 

লেখক: ক্যান্সার কাউন্সিলর ও সভাপতি সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)

(সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘এখানে থেমো না’ বইয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে)