Published : 06 Apr 2026, 09:18 PM
একের পর এক সামনে আসছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-প্রধানদের দুর্নীতির রকমারি সব চিত্র। বাসসের এমডি ও পিআইবির ডিজি—একেকজন নাকি সাদা থেকে (মানে নিষ্পাপ ভাবমূর্তি থেকে) লাল হয়েছেন এবং দুর্নীতির বিষে নীলও হয়েছেন। মাত্র দেড় বছরেই এই অবস্থা? আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কিছু কিছু ফাঁস হয়েছে তাদের আগেকার ১৫ বছরের দুর্নীতির খতিয়ান। সেসব অবশ্য হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি। আমার মতো অধম গরিবের পক্ষে অত টাকার ধারণাই মাথার মধ্যে নেওয়া সম্ভব নয়। আর সেই আওয়ামী আমলে নিজের পিয়নের চারশ কোটি টাকার দুর্নীতির খবর তো স্বয়ং সাবেক প্রধানমন্ত্রীই হাসতে হাসতে ফাঁস করেছিলেন; যেন এটা খুবই হাসির খবর। তারা তো সাধারণ দুর্নীতিবাজ ছিলেন না; তারা ছিলেন বেশরম ও বেসম্ভব (এখানে ‘অসম্ভব’ শব্দটিও ম্লান হয়ে যায় দুর্নীতির পরিমাণ দেখে) রকমের দুর্নীতিবাজ। তা এইসব হাজার, লাখ, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির খবরে মোটা দাগে যেটা বোঝা যাচ্ছে, সেটা হলো বাংলাদেশ আর কিছু পারুক না পারুক, দেশের সর্বস্তরে দুর্নীতিকে মহিমান্বিত করতে পেরেছে। সাধু, সাধু! অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে ‘চোর’ ও ‘সাধু’ শব্দ প্রয়োগ করতে হলেও বহুক্ষণ ভাবতে হবে। সেই যে একটা গান ছিল— ‘ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়... মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায় মানুষকে কী দিয়ে চিনবে বলো?’ এখন কে সাধু আর কে চোর তা জানতে হলে তাকে বড় কোনো পদে বসিয়ে দাও; দেখবে তার সাধুগিরির মুখোশ খুলে গিয়ে চৌর্যবৃত্তির আসল চেহারা ফুটে উঠেছে। ‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’—বাংলাদেশে এটাই সত্য।
এখন নতুন সরকারের কাছে প্রশ্ন—দুর্নীতি দমনের জন্য আপনারা কী করছেন বা করবেন, সেটা স্পষ্ট করে দেশবাসীকে জানাবেন কি?
আমি চীনের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত, সেখানকার ক্যান্টিনে কিছুদিন আগে আলাপ হলো আফ্রিকার এক দেশের একজন শিক্ষকের সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘বাংলাদেশ বা আফ্রিকার কোনো দেশ—সমস্যা সম্পদের অভাব নয়; মূল সমস্যা হলো দুর্নীতি।’ তিনি বললেন, ‘আমাদের দেশগুলোয় জনগণ পরিশ্রমী, সূর্যালোকের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে এসব সম্পদ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।’ অতি সত্য কথা।
বাংলাদেশের সম্পদের অভাব নেই। আমাদের জনগণ পরিশ্রমী। পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর জমির অধিকারী আমরা। রয়েছে সূর্যালোক, রয়েছে পানিসম্পদ। মাটির নিচে গ্যাস আছে, কয়লা আছে; বঙ্গোপসাগরের নিচে রয়েছে তেল। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে প্রচুর পরিমাণে পলি জমে যে বিশেষ ভূতাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তাকে বিজ্ঞানীরা ‘বেঙ্গল ফ্যান’ বলেন। এই অঞ্চলটি হাইড্রোকার্বন বা তেল-গ্যাস পাওয়ার জন্য বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমায় বিশাল গ্যাস ও তেলের মজুদ আবিষ্কার করার পর বাংলাদেশের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে পর্যটন থেকেই প্রচুর অর্থ সমাগম হতে পারে।
কিন্তু ‘সকলই গরলে ভেল’। বাংলাদেশের সমস্যা হলো দুর্নীতি। সমস্যা হলো বেকারত্ব। সমস্যা হলো ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল স্বাস্থ্যখাত, দুর্নীতিময় ব্যাংকিং খাত ও নিম্নমানের শিক্ষাব্যবস্থা। বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তাহীনতা ও সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটে দুর্নীতির কারণে—ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন চালক। সম্প্রতি ফেরিতে যে বাস দুর্ঘটনায় এত মানুষের মৃত্যু হলো, সেই বাসটিও নাকি চালাচ্ছিল হেল্পার; আসল চালক নেশাগ্রস্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিল।
বাংলাদেশের মানুষের এখন সর্বস্তরে দুর্নীতি করার অভ্যাস। গৃহকর্মী ফ্রিজ থেকে ডিম চুরি করে, আর বড় বড় রাঘব বোয়ালরা পুরো ব্যাংক চুরি করে ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা হ্যাক হয়ে বিদেশে চলে গেছে, যার রহস্য আজও জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়নি।
আমি নবগঠিত সরকারকে বলতে চাই, আপনারা কীভাবে দুর্নীতি দমন করবেন এবং কীভাবে দেশের সমস্যার সমাধান করবেন, তার পুরো কার্যকাঠামো প্রকাশ করুন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, কীভাবে সর্বস্তরে চুরি, ঘুষ ও দুর্নীতি রোধ করবেন, সে বিষয়ে বলেন না কেন? আওয়ামী আমলে হয়েছে এমন হাজার কোটি টাকা চুরির ঘটনা আমরা শুনেছি। এখন বলুন, কীভাবে এইসব চুরি রোধ করবেন। নির্বাচিত হয়ে যারা মন্ত্রী হলেন, তাদের দুর্নীতি কীভাবে বন্ধ করবেন, সেগুলো বলুন। দুর্নীতি করে যেসব টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, সেগুলো কীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনবেন—সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করুন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
দেশের স্বাস্থ্যখাতকে উন্নত করুন। আমাদের যেন চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে না যেতে হয়, সে ব্যবস্থা করুন। মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা কীভাবে দেশে আনা যায়, সেটা ঠিক করুন। এক গার্মেন্টস খাতই ভরসা; নতুন রপ্তানি খাতগুলো উন্নত করুন। নতুন নতুন রপ্তানি পণ্যের আইডিয়া ও পরিকল্পনা স্থির করুন। এগুলো জনগণকে বোঝান। কীভাবে আমাদের পাটের সোনালি দিন ফেরানো যায়, সে বিষয়ে নিজেদের কী চিন্তা—সেটা বলুন।
দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছে জানতে চাই, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানসম্মত করার জন্য আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানেই বা কীভাবে ভূমিকা রাখবেন? কেন বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মরতে হবে? দেশে কেন আমাদের কর্মসংস্থান নেই? দেশে কাজের ব্যবস্থা থাকলে তো এভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে আমাদের মরতে হতো না। বৈধ শ্রমবাজারের সন্ধান করুন। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের নারী শ্রমিকদের নির্যাতিত হওয়া বন্ধ করতে কী উদ্যোগ নেবেন, সেটা জানান।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড খুব ভালো বিষয়। কিন্তু এসব কাজে যেন আবার দুর্নীতি না হয়, সেদিকে আপনাদের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ পদ্ধতি আছে কি?
দেশে নারীর নিরাপদ কর্মসংস্থান করুন। নতুন নতুন শ্রমবাজারের খোঁজ বের করুন। অনেক দেশেই গৃহশ্রমিকের পূর্ণ মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে; সেসব দেশে কীভাবে প্রশিক্ষিত শ্রমিক পাঠানো যায়, সেদিকে মন দিন।
সড়ক দুর্ঘটনা দেশের বড় সমস্যা। কারণ পরিবহন খাত মূলত মাফিয়াদের দখলে। কীভাবে দেশের পরিবহন খাতকে মাফিয়ামুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে নতুন সরকার কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে?
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—চমৎকার একটি স্লোগান। কিন্তু বাংলাদেশকে উন্নত করতে হলে দুর্নীতির রাহু থেকে মুক্ত করতে হবে। সাবেক আওয়ামী সরকারের ওপর জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছিল তাদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে। আশা করি, নতুন সরকার এই দুর্নীতি রোধ করতে পারবে।
আমরা চাই আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ। দেশের মানুষ শান্তি চায়, সমৃদ্ধি চায়। সেই শান্তি ও সমৃদ্ধি কীভাবে অর্জন করা যায়, সেটা নিয়ে দ্রুত কাজ করুন।
বাংলাদেশের মেজরিটি মুসলিম—ঠিক আছে। কিন্তু এ দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্য ধর্মানুসারীরাও রয়েছে। এমনকি কোনো ধর্ম অনুসরণ না করা মানুষও আছে। সকলেই বাংলাদেশি। প্রত্যেকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষায়, নিরাপত্তা বিধানে ও আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ দেখতে চাই।
ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। তখন প্লাস্টিক বালতি ছিল না; ব্যবহার হতো টিনের বা লোহার বালতি। সেই বালতিতে ছিদ্র হলে অনেক সময় সাবান দিয়ে সেই ছিদ্র বন্ধ করা হতো। এতে অল্প সময়ের জন্য সমস্যার সমাধান হয়েছে মনে হলেও, বালতিতে পানি ভরামাত্র সাবান গলে গিয়ে আবার ‘যেই কে সেই’ অবস্থা হতো। স্থায়ী সমাধান ছিল ঝালাই করা।
বাংলাদেশের দুর্নীতির ছিদ্র দিয়ে দেশের সব সম্পদ ও অর্জন বেরিয়ে যাচ্ছে। সাবান দিয়ে সেই ছিদ্র বন্ধ করা যাবে না; দরকার মজবুত ঝালাই। বর্তমান সরকার কি সেই মজবুত ঝালাই দিতে পারবে?
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ুন, যেন ‘সবার আগে দুর্নীতি সত্য’ না হয়। সবার আগে বিবেচিত হোক বাংলাদেশের স্বার্থ, সবার আগে নিশ্চিত হোক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা।